কথা না বলা মেয়েটির বিশ্বজয়

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৫, ১৫:০৯
 
গত ২ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে অষ্টম বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রতিবন্ধীদের প্রতি সবাইকে আরও সহানুভূতিশীল হয়ে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি আরও বলেন, আমাদের সাধারণ ক্রীড়াবিদরা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে না পারলেও প্রতিবন্ধীরাই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের শির উন্নত করেছে এবার। প্রধানমন্ত্রীর এই কথাটিই যেন সত্য প্রমাণ করলেন ঢাকার ডেমরার বাক-প্রতিবন্ধী মেয়ে পারুল। কথা বলতে না পারা পারুলের ডেমরা এলাকায় সাধারণ অলিম্পিকে পদকের কোনো ছিটে ফোঁটা নেই, সেখানে তার এ সাফল্য বাংলাদেশিদের আনন্দিত ও গর্বিত করেছে। রৌপ্য জেতা দক্ষিণ কোরিয়ার লি জি অংয়ের চেয়ে দশমিক দুই এক সেকেন্ড কম সময়ে সাঁতার শেষ করেন পারুল। দশমিক দুই এক সেকেন্ড—এই পারুল গোটা বিশ্বকে জানান দেয়, ‘আমিও পারি’। পারুলের এই জয়ের পরই লস অ্যাঞ্জেলসে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো হয় এবং জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।

 

লস অ্যাঞ্জেলসে প্রতিবন্ধীদের জন্য আয়োজিত স্পেশাল সামার অলিম্পিকে বাংলাদেশের মেয়ে ‘পারুল আক্তার’ প্রথম সোনা জিতে। মেয়েদের ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতারে সোনা জিতেছে বাংলাদেশি এই প্রতিবন্ধী সাঁতারু। লস অ্যাঞ্জেলসে চলতি এ গেমসে পারুল মাত্র ১ মিনিট ৩১.০৬ সেকেন্ড সময় নিয়ে এই ইভেন্টে প্রথম হন। তার সাথে সাথে বাংলাদেশে প্রতিযোগীরা মোট সাতটি ইভেন্টে অংশ নেন। লস অ্যাঞ্জেলসে বাংলাদেশি কমিউনিটি তাদের সাফল্যের জন্য যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশি কমিউনিটির ফাহিম রাইয়ান ও আবির হোসাইন লস অ্যাঞ্জেলসে অলিম্পিক কমিটির হয়ে কাজ করেছেন। তারা বাংলাদেশি অ্যাথলেটদের সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। এদিকে লস অ্যাঞ্জেলসে বাংলাদেশি অভিবাসী সাবেক ফুটবলার শফিকউল আলম বাবু গ্যালারিতে সার্বক্ষণিক বাংলাদেশের পতাকা প্রদর্শন করেছেন। পারুলের পর পঞ্চম দিনে বাংলাদেশ আরও তিনটি স্বর্ণপদক পেয়েছে। স্বর্ণ বিজয়ী বিশেষ অ্যাথলেটরা হলেন রিজওয়ানুল হক, সুমন খান ও মোহাম্মদ রহমান। ছেলেদের ব্যাডমিন্টন এককে স্বর্ণপদক পেয়েছেন রিজওয়ানুল হক। অন্যদিকে ছেলেদের ৪ কেজি শটপুট শাখায় সুমন খানও স্বর্ণ জিতেছেন। আর টেবিল টেনিস এককে দেশের হয়ে চতুর্থ স্বর্ণপদক জয় করেছেন মোহাম্মদ রহমান। উল্লেখ্য, লস অ্যাঞ্জেলসে গত ২৫ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে স্পেশাল অলিম্পিক ওয়ার্ল্ড সামার গেমসের ১৪তম সংস্করণ। যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা বর্ণাঢ্য এই অলিম্পিকের উদ্বোধনী ঘোষণা করেন। মাঠে তখন ৬৩ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। ১৬৫টি দেশ থেকে সাড়ে ৬ হাজার খেলোয়ার তাদের ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করেন। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধীদের নিয়ে আয়োজিত এই ক্রীড়া আসরে এবার অংশ নিয়েছে ১৭৭টি দেশের প্রায় ৭ হাজার প্রতিযোগী। বাংলাদেশের দলটিতে রয়েছে ৫৭ জন খেলোয়াড় ও ২০ জন কোচ। আসরে মোট ২৫টি ডিসিপ্লিনের মধ্যে বাংলাদেশ অংশ নেয় ৬টিতে—অ্যাকুয়াটিকস, অ্যাথলেটিকস, ব্যাডমিন্টন, বচ্চি, ফুটবল ও টেবিল টেনিস। আসরটি শেষ হয়েছে গত ২ আগস্ট। এর আগে ২২ জুলাই বাংলাদেশ টিম লস অ্যাঞ্জেলসে পৌঁছায়। গত স্পেশাল অলিম্পিকে এ দলই অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে ৩৫টি স্বর্ণ পদক অর্জন করেছিল। প্রতিবন্ধীদের প্রতি আমাদের একটু সহানুভূতির হাত তাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে সাফল্যের পথে, তাহলে আমাদের কেন এই কার্পণ্য, তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ালে, তারাও আমাদের সম্পদ পরিণত হবে, বিখ্যাত পর্দাথ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস অটিস্টিক হয়েও তার প্রতিভায় বিচরণ করছেন বিশ্বপরিমণ্ডলে, তাহলে আমাদের শিশু প্রতিবন্ধীরা নয় কেন। আগে অটিজম নিয়ে মানুষের তেমন জানা ছিল না। অটিস্টিক শিশুদের বাবা-মা সমাজের সবার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখত। তাদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা ছিল না। সামাজিক ও পারিবারিকভাবে মায়েদেরও নানা বঞ্চনার শিকার হতে হতো। এখন সময় হয়েছে সচেতনতার। প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল দেশে ও দেশের বাইরে অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। মূলত তার বিভিন্ন উদ্যোগ ও সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে অটিজম বিষয়ে সাধারণ মানুষের প্রচলিত ধারণায় আমূল পরিবর্তন এসেছে। এ বিষয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি হয়েছে। অটিজম বিষয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে ‘অ্যাকসিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওর্য়াড’সহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে তিনি পুরস্কার পেয়েছেন। প্রতিবন্ধীদের অবহেলা না করে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ করে দিতে হবে। তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। প্রতিবন্ধীদের মা-বাবারা অনেক সময় হতাশা প্রকাশ করেন, হতাশার কোনো কারণ নেই। এদের প্রতিবন্ধী নয়, জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কেননা এখান থেকে উঠে আসবে পারুলের মতো বিশ্বজয়ী একজন।