প্রকৃতিপ্রেমী মহিদুল

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৫, ১৬:২১

 

মানুষের জীবনে বৃক্ষের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু তা আমরা কখনো ভেবে দেখি না। ডাঙায় তোলা মাছের যেমন প্রাণহীন ছটফট অবস্থা হয়, সে তুলনায় বৃক্ষহীন পৃথিবীতে মানুষের অবস্থা হবে আরও ভয়াবহ। সবুজ বৃক্ষ আমাদের অক্সিজেন দিয়ে প্রাণ রক্ষা করে। পৃথিবীর পরিবেশকে সুস্থ ও শীতল রাখে। শুধু তাই নয়, বৃক্ষ আমাদের ফল দেয়, শীতল ছায়া দেয়। গৃহ নির্মাণ, আসবাবপত্র—সবকিছুর জন্য আমরা প্রকৃতির অকৃপণ দান বৃক্ষের ওপরই নির্ভরশীল। তাই সবুজ বনভূমিকে বলা হয় পৃথিবীর ফুসফুস। আমাদের দেশে প্রয়োজনের তুলনায় বৃক্ষ ও বনভূমির পরিমাণ খুবই কম। যেকোনো দেশের মোট ভূখণ্ডের পঁচিশ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। অথচ আমাদের দেশে আছে মাত্র সতেরো শতাংশ। তারপরও প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গাছ কেটে ফেলে আমরা সবুজ বনভূমি উজাড় করে চলেছি। এ রকম অবস্থা চলতে থাকলে যেকোনো সময় আমরা ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে পারি। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও কিছু প্রকৃতিপ্রেমী ও দেশপ্রেমী তরুণ কাজ করছেন প্রকৃতির কল্যাণে। নওগাঁর তরুণ মহিদুর রহমান সেরকমই একজন। তার প্রতিষ্ঠিত সংগঠন ‘নিশান-নওগাঁ ইনিশিয়েটিভস ফর সোসাইটি হেরিটেজ অ্যান্ড নেচার’ নিভৃতে কাজ করছে প্রকৃতি ও তার সন্তান বন্যপ্রাণীদের জন্য। মহিদুর রহমান ছোটবেলা থেকে প্রেমে পড়েছিলেন পাখি ও গাছদের। বাড়ির পাশের শিমুল গাছের কোটরে ঝাঁক ধরে বাসা বাঁধা টিয়া পাখির দলের সবুজ সৌন্দর্যে তিনি বিস্মিত হতেন। কিন্তু পাশাপাশি মানুষের নিষ্ঠুরতায় শিউরে উঠতেও সময় নেননি তিনি। বুঝতে পারেন লোভের কারণে মানুষ কতটা কদর্য হতে পারে। সেই থেকে প্রকৃতির জন্য, তার সৃষ্টিদের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন। সমমনা কয়েকজন তরুণকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘নেচার ক্লাব’। তাদের নিয়ে এলাকায় পাখি শিকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। তাদের উদ্যোগে স্থানীয় স্কুলগুলোতে পাখি শিকার না করার শপথ নিতে থাকে শিক্ষার্থীরা। মহিদুররাও বিপুল উদ্যমে সহস্র গাছ লাগান স্কুল, রাস্তা ও পতিত জমিতে। এরমধ্যে তাদের রোপন করা গাছের সংখ্যা ছাড়িয়েছে কুড়ি হাজার।

 

IMG0

 

২০১১ সালে ‘নেচার ক্লাব’ আরও বড় পরিসরে আবির্ভূত হয় ‘নিশান-নওগাঁ ইনিশিয়েটিভস ফর সোসাইটি হেরিটেজ অ্যান্ড নেচার’ নামে। পরিবেশ ও প্রাণীকুলের পাশাপাশি তারা কাজের ক্ষেত্র বিস্তৃত করেন ঐতিহ্যের সংরক্ষণেও। ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন পাসের সাথে সাথে গঠিত হয় সরকারি দপ্তর বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ রাজশাহীর সৃষ্টি হয়। নিশান ও এই দপ্তরের উদ্যোগে পরিবেশ সংক্রান্ত কর্মযজ্ঞ বিপুল উদ্যমে চলতে থাকে। উত্তরবাংলার বিভিন্ন স্থানে পাখিদের কলোনি চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণে নেতৃত্ব দিয়ে আসছে নিশান। এছাড়াও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পলিথিন পরিহারে সামাজিক আন্দোলন, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে কর্মকাণ্ড ও পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতি অনুসরণে পরামর্শ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করে নিশান একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলনের জন্ম দিয়েছে। তিনি ও তার সংগঠন এখন পর্যন্ত প্রায় ৭৫০টি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কাজ করেছে, ১৫০০ কিশোর ও যুবকদের প্রশিক্ষণ ও সহায়তা করেছে। পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে তাদের কাজ দেখে অন্য তরুণরাও এগিয়ে আসছেন এই মহান প্রচেষ্টায় শামিল হতে। জীববৈচিত্র্য, ইতিহাস-ঐতিহ্য ও পরিবেশ সংরক্ষণে যুব নেতৃত্ব সৃজনের মাধ্যমে কমিউনিটিভিত্তিক সামাজিক উন্নয়নের প্রত্যয়ে তাদের এই পথচলায় প্রতিনিয়ত যোগ দিচ্ছেন তরুণরা। তার নিজের কাজের স্বীকৃতি স্বরূপ বাংলদেশ স্কাউট থেকে ২০১০ সালে শ্রেষ্ঠ রোভারের অ্যাওয়ার্ড পান মহিদুর। বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে তাকে ‘ইনোভেটিভ অ্যাওয়ার্ড’ দেয়। বাংলাদেশ স্কাউট থেকে ২০১৪ সালে ন্যাশন্যাল সার্টিফিকেট পান পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ অবদানের জন্য। সর্বশেষ তার প্রাপ্তির খাতায় যোগ হয় ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। সামাজিক উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের স্বীকৃতিস্বরূপ তার সংগঠন পায় ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’। নিজের সংগঠনের লক্ষ্যের কথা জানাতে গিয়ে মহিদুর জানান, ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতিকে জানা, প্রকৃতিকে রক্ষা করা—এই স্লোগানকে সামনে রেখে উপযুক্ত শিক্ষাই সকল উন্নয়নের মূল। এই বিশ্বাসকে সামনে রেখেই কাজ করে যাবে নিশান।