সফল উদ্যোক্তা হতে চাইলে

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৮, ১৭:৫১

সোহেল আশরাফ

 

চাকরি কিংবা ব্যবসা করে প্রতিষ্ঠিত হতে প্রায় সকলেই স্বপ্ন দেখেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ সাফল্যের সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে পারলেও আবার কেউ কেউ সাফল্যের সিড়িটি খুঁজে পেতে পথভ্রষ্টও হচ্ছেন। যারা সফল উদ্যোক্তা হতে চান তাদের উদ্দেশ্যেই আমাদের এবারের আয়োজন।

অনেকেই সফল উদ্যোক্তা হওয়া বলতে অর্থ উপার্যনকেই বুঝে থাকেন। মূলত: নেত্রীত্বের গুণ, তার কর্মফল, তার ধৈর্য্য ও দীর্ঘ সময় তার কার্যক্রম পরিচালনার যোগ্যতার মধ্যে দিয়ে যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তিনিই হলেন সফল উদ্যোক্তা। তারা নিজের জীবন, কর্মচারীদের জীবন, গ্রাহকদের জীবন, এমনকি দেশ ও পরিবেশের জন্যও অনেক বড় ভূমিকা রাখেন। ব্যবসা কারো কাছে সহজ আবার কারো কাছে কঠিন। ব্যবসায় সফল হতে হলে একজন ব্যবসায়ীকে অবশ্যই সৃজনশীল হতে হবে। আর পরিশ্রমি হতে হবে সেটা তো বলাই বাহুল্য। একজন সফল ব্যবসায়ী হতে চাইলে একজন উদ্যোক্তার যেসব গুণ থাকা প্রয়োজন সেগুলো হল-

আত্মনিয়ন্ত্রণ: সফল উদ্যোক্তাদের মধ্যে পরিলক্ষিত হওয়া সর্বপ্রথম বৈশিষ্ট্যটি হচ্ছে আত্ন-নিয়ন্ত্রণ। ব্যক্তিগত জীবনে এবং ব্যবসায়িক জীবনে সফল হওয়ার জন্য এটি সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। উচিত-অনুচিত, পছন্দ-অপছন্দগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। সফল ও ব্যর্থ উদ্যোক্তাদের মধ্যে পার্থক্য হলো- সফলরা ঠিক সেইসব কাজের অভ্যাস গড়ে তোলেন যেগুলো ব্যর্থরা করতে পছন্দ করেন না। ব্যর্থ উদ্যোক্তারা যে কাজগুলো করতে পছন্দ করেন না, সফল উদ্যোক্তারাও ঠিক সেই কাজগুলোই করতে পছন্দ করেন না। কিন্তু পার্থক্যটা হচ্ছে, সফল ব্যক্তিরা পছন্দ না করলেও সেই কাজগুলো মন দিয়ে করেন। কারণ তারা জানে, সফল হতে গেলে সেই কষ্টগুলো তাদেরকে স্বীকার করতেই হবে।

সততা: সফল হতে গেলে সবচেয়ে মূল্যবান যে অভ্যাসটির চর্চা করা উচিত্ সেটি হলো সততা। ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে হোক অথবা ব্যবসায়িক সম্পর্ক, সকল ক্ষেত্রেই পুরোপুরি সত্ থাকতে হবে। সততার সাথে কখনোই আপস করা চলবেনা। সবসময় কথা দিয়ে কথা রাখার চেষ্টা করবেন। সব সফল ব্যবসার মূল ভিত্তি হচ্ছে বিশ্বাস। একজন উদ্যোক্তা হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার সাফল্য শুধুমাত্র আপনার উপর ভরসা করে না।  অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য ব্যক্তিদের দ্বারা নির্ধারিত হবে। যেমন- যারা আপনার জন্য কাজ করতে ইচ্ছুক, আপনাকে ঋণ দেবে, আপনার প্রয়োজনে অর্থ-সহায়তা করবে, আপনার পণ্যগুলো কিনবে এবং কঠিন সময়ে আপনাকে সহায়তা করবে। তাই আপনার ব্যবসায়ে আপনার চরিত্রই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সম্পদ, এবং সততা হচ্ছে আপনার চরিত্রের ভিত্তি।

অধ্যবসায়: সফল হতে গেলে আপনাকে অবশ্যই কঠোর অধ্যবসায়ী হতে হবে। সফল হওয়ার জন্য মনে জিদ রাখতে হবে। লোহা যেমন ইস্পাতের উপাদান তেমনি জিদ ও মানব চরিত্রের উপাদান। নিজের মনে সবসময় এই জিদটা ধরে রাখুন যে, যা কিছুই ঘটুক না কেনো, কখনোই হাল ছেড়ে যাবেন না। অন্য সবার চেয়ে বেশী পরিশ্রমী হওয়ার জন্য ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে।

দূরদর্শিতা :একজন সফল উদ্যোক্তার মাঝে দূরদর্শিতা বিদ্যমান থাকতে হবে। কোনো ব্যবসা শুরু করতে হলে আগে থেকে সেটার ভবিষ্যত্ সম্পর্কে পরিষড়ার ধারণা রাখতে হবে। বর্তমান বাজার ব্যবস্থার অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে বেশিরভাগ উদ্যোক্তাই সুদূরপ্রসারী চিন্তা করে আগাতে পারেন না। আপনাকে সফল হতে হলে ভবিষ্যতের জন্য পরিষড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

দৃঢ়সংকল্প: একজন সফল উদ্যোক্তাকে অবশ্যই দৃঢ়সংকল্প হতে হয়। একজন উদ্যোক্তাকে স্বভাবতই দ্রুত ভাবতে ও দ্রুত সিদ্ধান্তে আসতে হয়। এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া শেষে দ্রুত কাজে নেমে পড়তে হয়। বিন্দুমাত্র সময় অপচয় করার অবকাশ থাকেনা। কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে আবার দ্রুত সেটা শোধরাতেও হয়। সফল ব্যক্তিরা নিরপেক্ষ এবং তারা অন্য লোকেদের চেয়ে অনেক বেশি চেষ্টা করেন। আপনি যদি সফল হতে আরও বেশি উপায়ে চেষ্টা করেন, তাহলে আপনি সঠিক সময়ে সঠিক উপায়টি খুঁজে পাবেন। সময়ের মূল্যায়ন:একজন সফল উদ্যোক্তা/ব্যবসায়ীকে সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তটি না নিলে পিছিয়ে পরার সম্ভাবনা থাকে। এজন্য নন-ট্রেডিশনাল বা নতুন ধরনের ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজে বের করে সময়োপয়ী তা বাস্তবায়ন করার সামর্থ থাকতে হবে। যেকোন ধরনের সাহায্য পাওয়ার জন্য বিকল্প পথ খুঁজে বের করার ক্ষমতা থাকতে হবে। যেকোন বাঁধা দূর করার জন্য সময়মত যেকোন পদক্ষেপ নিতে হবে। আর সময়মত যেকোন চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করতে হবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলা :একজন সফল উদ্যোক্তা/ব্যবসায়ীকে সুযোগ সন্ানী হতে হবে। যেকোনো মুহূর্তে যে কোনো পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলতে হবে। নতুন ধরনের ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজে বের করে তা বাস্তবায়ন করার সামর্থ থাকতে হবে। যেকোন ধরনের সাহায্য পাওয়ার জন্য বিকল্প পথ খুঁজে বের করার ক্ষমতা থাকতে হবে। বাঁধা দূর করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। ঝুঁকি নেওয়ার মনোভাব থাকতে হবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারতে হবে। লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরী করা এবং তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত সঠিক বিনিয়োগ কৌশলের মাধ্যমে আপনি আপনার কোম্পানির জন্য একটি ভালো আর্থিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারবেন এবং আপনার ব্যবসাটির প্রসারও ঘটবে অনেক। যদিও ব্যবসার শুরুতে আপনার কিছু বাড়তি খরচ হবে কিন্তু পরবর্তীতে এটি থেকেই আপনার অনেক লাভ হবে।

পর্যাবেক্ষণ করা : যেকোনো সফল কোম্পানি একা একা সফল হতে পারে না। সাফল্য ধরে রাখতে হলে নিজের প্রতিযোগিদের দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি রাখতে হয়। তাদের শক্তি, তাদের দুর্বলতা, তাদের সুবিধা এবং অসুবিধা সবকিছুর প্রতিই খেয়াল রাখতে হয়। তাছাড়াও বিভিন্ন পর্যালোচনা থেকে নিজের কোম্পানির প্রয়োজনীয় পরিবর্তন অথবা ভালো ব্যাপারগুলো খুঁজে বের করা যায়। অর্থাত্ নিজের প্রতিযোগিদের বুঝার মাধ্যমে আসলে নিজের কোম্পানির অবস্থান বুঝা যায়। একটি তুলনামূলক পর্যালোচনা থেকে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন আপনার কোম্পানির বর্তমান অবস্থান কোন জায়গায়, আপনার বর্তমান উদ্দেশ্য কি এবং ভবিষ্যতে আপনি কোন দিকে গেলে আরও উন্নতি করতে পারবেন। তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে করতে আপনি আরও বুঝতে পারবেন আপনার গ্রাহকদের প্রয়োজনিয়তা সম্পর্কে এবং আপনার ব্যবসায়ের অন্যান্য দিক গুছিয়ে নতুন নতুন লক্ষ্য বের করে সেদিকে এগিয়ে যেতে আপনার কি কি করণীয় ধাপ অনুসরণ করতে হবে সেগুলো সম্পর্কে।