স্বাধীনতার পথে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০১৯, ২১:৩০

আজ ঐতিহাসিক সাতই মার্চ। বাঙালি জাতির জীবনে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের উত্তাল সময়ে রমনার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) স্বাধীনতার মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। তিনি স্বাধীনতাকামী লক্ষ লক্ষ জনতার সামনে বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন— ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। সেই দিনের অগ্নিঝরা ভাষণে ছিল আমাদের মহান স্বাধীনতা ও মুক্তির সার্বিক দিক-নির্দেশনা। বাঙালির আদর্শ ও চেতনার কেন্দ্রবিন্দু এই ভাষণই একমাত্র ভাষণ যাহা একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করে। ইহা কেবল বাঙালি জাতি নহে, পৃথিবীর স্বাধীনতাকামী, নিপীড়িত, বঞ্চিত ও শোষিত জনগণের জন্য দিক-নির্দেশকও। সমপ্রতি ইউনেস্কো এই ভাষণটিকে ‘ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ বা বিশ্ব ঐতিহ্য দলিল হিসাবে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারে’ যুক্ত করিয়াছে। তবে এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির বহু আগে হইতেই ভাষণটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসাবে বিবেচিত হইয়া আসিতেছিল।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘পোয়েট অব পলিটিক্স’ তথা ‘রাজনীতির কবি’ অভিধা পাইয়াছিলেন। আর তাঁহার সাতই মার্চের ভাষণকে বলা হয় তাহার রচিত একটি অমর কবিতা। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক জাতীয় নির্বাচনে বাংলার মানুষের ভোটে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অন্যায়ভাবে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করিয়া আলোচনার আড়ালে সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরে ও সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া নিতে ৬ মার্চ পর্যন্ত ঘোষিত হরতাল ও অসহযোগ আন্দোলন চলে। ইহার পর সাতই মার্চের ভাষণে পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঐদিন রেসকোর্স ময়দানের পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী কামান তাক করিয়া রাখিয়াছিল। আকাশে উড়িতেছিল গানবাহী সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার। একদিকে স্বাধীনতাকামী মানুষের প্রবল আকাঙ্ক্ষা ও অন্যদিকে শাসকশ্রেণির অপ্রত্যাশিত চাপ। এই দুই পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের যে রূপ ও প্রকৃতি দাঁড়াইল তাহা অত্যন্ত কৌশলী, বহুমাত্রিক ও স্বভাবসুলভ। এই ভাষণের অনন্য শব্দচয়ন, অনুপম বাকশৈলী, ঋজু উপস্থাপনা ও আবহমান বাংলার লোকজ শব্দসম্ভার মুক্তিপাগল মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকর্ষণ করে। অতঃপর দীর্ঘ নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়া এবং ৩০ লক্ষ প্রাণ আর দুই লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে আসে বহুকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের।

অতএব, বাঙালির হাজার বত্সরের পরাধীনতার জোয়াল ছুড়িয়া ফেলিয়া স্বাধীনতার সোনালি সোপানে উত্তরণের পথে সাতই মার্চের ভাষণটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি মাইলফলক। সংগঠন ও নেতৃত্বের ক্যারিশমা তথা জাদুকরী ক্ষমতার সফল মিথস্ক্রিয়ার একটি অভূতপূর্ব প্রদর্শনীও সাতই মার্চ। বঙ্গবন্ধুর মাত্র ১৯ মিনিটের এই ভাষণটি ছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক সঞ্জীবনী মন্ত্র। আমরা যখন একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিতেছি, তখন এই মন্ত্রই আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছাইতে অনুপ্রেরণা জোগাইবে। ইহার পথ ধরিয়া আসিবে আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি। দান করিবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করিয়া চলিবার শক্তি।