অভিনয়টাই বেঁচে থাকা: অভিনয়ের কিংবদন্তি সৌমিত্র

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫, ১০:৫৪
পঞ্চান্ন বছর ধরে অভিনয় করছি। এই যাত্রাপথ কঠিন ছিল। আমি ‘অপুর সংসার’ ছবিটি করেই যাকে বলে ‘টক অব দ্য টাউন’ হয়ে উঠেছিলাম। তারপরও যাত্রা খুব সহজ ছিল না। এই কঠিন পথ পাড়ি দিতে অনেক কিছু ছাড়তে হয়- অনেক কিছু দিতে হয়।’
 
বলছিলেন পশ্চিম বাংলার অভিনয় জগতের কিংবদন্তিতুল্য পুরুষ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। গতকাল শনিবার শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত আড্ডায় নিজের জীবনের অনেক কথাই বললেন। প্রকাশ করলেন তার চিন্তা। সেসব কথা অভিনয়শিল্পীদের কাছে স্মরণীয় উক্তি হয়ে রইবে। কথার নৈপুণ্যে, বলবার মুন্সীয়ানায় হাসালেন সবাইকে, ভাবালেন, সহজ কথায় মন ভরিয়ে দিলেন।
 
দুই বাংলার অভিনয় জগতের জীবন্ত কিংবদন্তি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। খ্যাতিমান এই অভিনেতা শনিবার সকালে জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে সাংবাদিক ও নাট্যকর্মীদের মুখোমুখি হন। বাংলাদেশের দর্শকদের উদ্দেশে বললেন, আপনাদের প্রাণভরে ধন্যবাদ জানাই। এটা আপনারা আমাকে ভালোবাসেন সেজন্য নয়, আপনারা আমার কাজের প্রতি এখনো আগ্রহ ধরে রেখেছেন সেজন্য। বললেন, এখানে এসে মনটা ভালো হয়ে যাচ্ছে। আপনাদের আগ্রহ- বোধহয় এটার লোভেই আমরা অভিনেতারা টিকে থাকি, বসে পড়ি না। আমার যা বয়স বসে যাওয়ারই কথা। কিন্তু বিশ্রাম নিতে চাই না। আমার জীবনে অভিনয় করার বিকল্প নেই। অভিনয়টাই বেঁচে থাকা। না করা মানেই বসে পড়া।
 
অভিনয় প্রসঙ্গে সৌমিত্র বলেন, অভিনয়ের কোন স্বরলিপি নেই। মুদ্রা নেই। সেই মুহূর্তে কোনটা প্রয়োজন সেটা অভিনেতাকে ঠিক করতে হয়। অভিনয় করতে করতে শিখতে হয়। প্রস্তুতি নিতে নিতে তা মেলে। পঞ্চান্ন বছর পরে এখন কখনো কখনো মনে হয়, এখন হয়তো কিছু ঠিক ঠিক অভিনয় করছি।
 
গুণী এই শিল্পী গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উত্সবে অংশ নিতে বাংলাদেশে এসেছেন শুক্রবার। জনপ্রিয়তার তুঙ্গস্পর্শী এ অভিনেতা কখনোই নিজের স্টার ইমেজ প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি। গতকাল সকালে শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার রুমে এলেন খুব সহজ ভঙ্গিতে, নিরাভরণ। নেভি ব্লু হাফ হাতা শার্ট। ব্লু গ্যাবার্ডিনের প্যান্ট। পায়ে ঘরে পরার রাবারের চপ্পল। সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানালেন গুণী শিল্পীকে। ‘আমার চেহারা নিয়ে হীনমন্যতা ছিল’ কিংবদন্তিতুল্য অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এ কথা বলার সাথেই সাথেই সবাই হেসে উঠলেন। সবাই হাসবেন তিনি যেন জানতেন। বললেন, একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা এমন কথা বললে তো হাসারই কথা। কিন্তু এতোটা পথ পেরিয়ে এসে যখন জীবন নিয়ে চিন্তা করেছি তখন এই উপলব্ধিটা হয়েছে। আমি রুগ্ন ছিলাম, ৬৩ দিন জ্বরে ভুগেছি। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছিল। সেইসময় সবাই আমাকে উপহাস করতো। দেখলাম, অভিনয়টা মুখ লুকানোর একটা জায়গা। চরিত্রের আড়াল নিয়ে প্রকাশিত হওয়ার পন্থা।
 
তাহলে নিজেকে মুক্ত অবস্থায় খুঁজে পান কোথায়– এমন প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র বললেন, কবিতায়। সেখানে নিজেকে মেলে ধরার আলাদা সুযোগ এলো। বলতে লজ্জা লাগছে, এই কবিতা লেখার পেছনে বিশেষ কোন মেয়েকে ভালো লাগার ব্যাপার আছে। আমাদের সময়ে একটা মেয়ের হাত ধরতে অনেক সময় লাগতো। সে অব্যক্ত বাসনা থেকেই কবিতা লেখা শুরু। আমি নিজেকে খুঁজে পেতে শুরু করি। অভিনয় হচ্ছে, পারফর্মিং আর্ট। কবিতা, গান, মঞ্চ, ছবি আঁকা, চলচ্চিত্র– এসবের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে। কখনো একটি মাধ্যম, অন্য মাধ্যমে ওভারল্যাপ করে। যাকে উদ্দেশ্য করে কবিতা লেখা শুরু তাকে যাপিতজীবনে পেয়েছিলেন কি না- এমন প্রশ্নের উত্তরে তার সোজা উত্তর ‘হ্যাঁ, পেয়েছি।’ এরই মধ্যে হাস্যরসে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো মিলনায়তন।
 
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সৌমিত্র বলেন, একটা জাতিকে অনেক মূল্য দিয়ে মানুষের মুক্তি আনতে হয়েছে। ত্যাগ কখনো বিফলে যায় না। এখানে নতুন চিন্তার উদ্ভব হবে বলে আমরা আশাকরি। বাংলাদেশের নাটকের ভবিষ্যত্ কী- এক গণমাধ্যম কর্মীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, অভিজ্ঞতা ও ত্যাগ কখনো বিফলে যায় না; যায়নি অতীতে, ভবিষ্যতেও যাবে না হয়তো। সেই সঙ্গে সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের জীবনের সঙ্গে মিল রেখে কতটুকু প্রাসঙ্গিক আমাদের নাটক সেটার ওপরও অনেকাংশে নির্ভর করে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় মানেই সত্যজিত্ রায় প্রসঙ্গ আসবে। এলোও। বললেন, ওঁনার কাজের প্রতি আমার বিপুল শ্রদ্ধা ছিল। আমি সবসময় তাঁর কাছে হাঁটু গেঁড়ে শিক্ষার্থী হতে পারতাম। সত্যজিত্ রায় ও আমার প্রতিভার বিপুল পার্থক্য থাকার পরেও আমাদের মাঝে ‘কালচারাল লিগ্যাসি’ ছিল। সে জন্য হয়তো তিনি আমার সঙ্গে কাজ করার সুবিধা পেতেন, আমি তো পেতামই। আমাদের সম্পর্ক খুব গভীর ছিল। অনেক চরিত্র আমি করতে চেয়েছি কিন্তু তিনি আমাকে নেননি। কিন্তু সব চিত্রনাট্যই তিনি আমাকে শোনাতেন। আমরা আলোচনা করতাম। আবৃত্তিতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছেই তাঁর ‘ঋষিঋণ’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠ নিয়ে আমার পরিবারেও নানা কথা বলত, যেহেতু তাঁর কণ্ঠে আবৃত্তির রেকর্ডিংগুলো বেশ খারাপ মানের ছিল। তবে দেশের বাইরে যে দু’একটা রেকর্ডিং আছে তা শুনেই বুঝেছি তাঁর কণ্ঠে কী গভীরতা ছিল।’ ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সৌমিত্র বলেন, ‘গত ২০ বছর ধরে একটি সিনেমাও মেজর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে পুরস্কার পায়নি। যারা পুরস্কার পায় বলে মিডিয়ায় প্রচার করে, সেসব উল্লেখযোগ্য পুরস্কার নয়। ভালো বাংলা সিনেমা হচ্ছেই না।’
 
অনুষ্ঠানের ধারাবাহিকতায় একে একে চলতে থাকে কৌতূহলোদ্দীপক প্রশ্ন। প্রশ্ন করেন সৈয়দ হাসান ইমাম, রামেন্দু মজুমদার, কেরামত মওলা, ড. ইনামুল হক, মোহাম্মদ বারী, জাহিদ রিপন, চন্দন রেজাসহ নাট্য, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের প্রতিশ্রুতিশীল কর্মীরা। সঞ্চালনায় ছিলেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ।
 
কেরামত মওলার প্রশ্নের উত্তরে সৌমিত্র বলেন, অভিনয় ছাড়া আমি কিছু ভাবতে পারি না। অতঃপর নাটক লেখার বিষয়ে প্রশ্ন রামেন্দু মজুমদারের। উত্তরে জানান, প্রয়োজনের তাগিদে নাটক লিখেছেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিল রেখে জীবনের সঞ্চিত খাতায় যোগ হয়েছে ত্রিশটির মতো নাটক। নাট্যচর্চায় পেশাদারিত্ব সম্পর্কে নাট্যকর্মী জাহিদ রিপনের প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় জানান, কলকাতার পেশাদারী নাট্যচর্চার ইতিহাস প্রায় শত বছরের। সেটা বিকাশের মধ্য দিয়ে এসেছে। কখনো সে গতিসীমা কমেছে আবার কখনো তা হয়েছে প্রাণবন্ত। এভাবে চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে চলছে এসব কর্মযজ্ঞ। তবে আমরা অনেক সময় প্রফেশনালিজমের সঙ্গে কমার্শিয়ালিজম মিক্স করে ফেলি। সব কথার বড় কথা হল আমাদের দায়। সর্বোত্তম ক্ষমতা দিয়ে সৃজনশীল মানুষকে তুষ্ট করতে হলে সে দায়কেই মূল উপজীব্য মনে করে নিতে হবে।
 
টিভি, চলচ্চিত্র ও মঞ্চ এসব জায়গায় অভিনয় করতে গিয়ে নিজেকে কি আলাদা করে তৈরি করতে হয়-নাট্যব্যক্তিত্ব কেরামত মওলার এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘প্রথমত অভিনয়। তারপর পরিবেশ বুঝে উপস্থাপন। এতে আমি কোন পার্থক্য খুঁজে পাই না। যিনি ছবি আঁকেন তিনি ছোট ক্যানভাসেও আঁকতে পারেন, বড় ক্যানভাসেও আঁকতে পারেন। সেই সত্যিকার অভিনেতা যে সমাজের ভাবনা-চিন্তা, অবস্থা প্রকারান্তরে বুঝিয়ে দিতে পারেন। আবৃত্তিকার গোলাম সারোয়ার জানতে চান অভিনয়ে আবৃত্তিচর্চার প্রয়োজন আছে কি-না। সে বিষয়ে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের ভাষ্য, ‘এটা অভিনয়ে ভীষণ দরকার। যারা এটা বোঝেন না তারা এখনো চোখ বুজে আছেন। অভিনয়ের প্রারম্ভিক কাজ হল কথা বলা, সেটা আবৃত্তিচর্চা ছাড়া হয় না। আমি প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আবৃি্ত্ত ও গান করেছি। ইদানিং বয়সের কারণে পারি না। সর্বোপরি, একজন অভিনেতাকে চার অক্ষরের একটি শব্দকে আঁকড়ে রাখতে হয়, তা হলো ভালবাসা। ভালবাসা ছাড়া কিছু হয় না।’ আবৃত্তি যিনি করেন তিনি নাকি কবিতায় পারঙ্গম হতে পারেন না? সৌমিত্র বলেন, ‘এর বাস্তবতা এখন পাল্টে গেছে। কারণ সুনীল ও শক্তি চট্টোপাধ্যায়ও অভিনয় এবং আবৃি্ত্ত করে। পরক্ষণেই বললেন, করতেন। ওঁরা যে নেই তা মনেই থাকে না।
 
বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী তৈরির পথে আরও একটি বিষয় ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত, তা হলো ভারতে বাংলাদেশের চ্যানেল প্রদর্শন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতে সেটি নেই। এক গণমাধ্যমকর্মীর প্রশ্নের জবাবে সৌমিত্র বলেন, ‘এটাকে আমরা সাংঘাতিক মিস করি। এ দেশের প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ থাকলেও এরকম একটি প্রতিবন্ধকতার কারণে সেটা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। এটার উত্তরণ জরুরি।’
 
দুই ঘণ্টাব্যাপী এ আলাপচারিতার শুরুতেই আয়োজক সংগঠন গঙ্গা-যমুনা নাট্য ও সাংস্কৃতিক উত্সবের আহ্বায়ক গোলাম কুদ্দুছ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চান কীভাবে তিনি অভিনয় জগতে এলেন। জবাবে সৌমিত্র বলেন, ‘বাবা একজন সংস্কৃতিমনা মানুষ ছিলেন। অভিনয় ও আবৃত্তির প্রতি ঝোঁক ছিল তার। কিন্তু তখনো অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেয়ার প্রশ্নটি ওঠেনি। সে কারণেই হয়তো বেঁচে থাকার অবলম্বন হিসেবে ওকালতি পেশায় নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু একান্ত নিমগ্নতায় বাবাকে অভিনয় আর আবৃত্তি করতে দেখেছি। এ সব দেখেই এক সময় অভিনয় ও আবৃত্তির প্রতি আগ্রহ বাড়ে। বাবা আমাকে বোঝাতেন কীভাবে অভিনয় করতে হয়, আবৃত্তি করতে হয়। এভাবে চিন্তার ক্রমাগত উত্কর্ষতায় পরবর্তী সময়ে কলকাতায় শিশির কুমার ভাদুরীর অভিনয় দেখে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ে। সৌমিত্র জানান, এম এ পড়ার সময় ‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন জগদ্বিখ্যাত পরিচালক সত্যজিত্ রায়। তিনি এর দ্বিতীয় পর্ব ‘অপরাজিত’ নামে চলচ্চিত্র নির্মাণের কথা ভাবতে শুরু করেন। এটার জন্য একজন অভিনেতা খুঁজছিলেন। সত্যজিত্ রায় তার সহকারীর বন্ধুর মাধ্যমে জানতে পারেন সৌমিত্র নামের একটি ছেলে অভিনয় করে। অভিনয়ের প্রতি বেশ আগ্রহ। তা থেকেই আমার সেখানে যাওয়া। সত্যজিত্ বাবু আমাকে দেখামাত্র বললেন, ‘আরে না না তোমার বয়সটা একটু বেশি মনে হচ্ছে।’ পরে বেশ কয়েকবার গেছি তার কাছে। কথা বলেছি। কিন্তু আমাকে কাজ করাবেন তা নিয়ে কিছু বলেননি। বেশ কদিন পরে একদিন ‘জলসাঘর’ সিনেমার শুটিং ইউনিটে যেতে বললেন। সেখানে ছবি বিশ্বাসের সঙ্গে পরিচয় করাতে গিয়ে বললেন, ছবিদা এই ছেলেটাকে অপুর চরিত্রে নিচ্ছি।