রাজধানী ঢাকায় পুকুর কিংবা খাল এখন চোখেই পড়ে না। তবে এক সময় ছিল পুকুর-খাল-ঝিলের সোনালী যুগ। ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে গেছে পুকুর, খাল ও ঝিল। ৩০ বছর আগে ঢাকা নগরীতে ২ হাজার ছোট-বড় পুকুর ছিল। এখন সরকারি কাগজে আছে মাত্র দু’শ। প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা একশ’ বেশি হবে না। এর ফলে অল্প বৃষ্টি হলেই দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা।
এ প্রসঙ্গে পরিবেশবিদ রানা আব্বাস বলেছেন, পুকুরসহ জলাশয় ভরাটের ফলে জীব বৈচিত্র্যে ব্যাঘাত ঘটছে। পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। জলাশয় কমে যাওয়ায় রাজধানীতে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটলে পানিরই যোগান নিয়ে সমস্যা দেখা দেবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচেতনতা এবং পরিবেশবান্ধব পরিকল্পনার অভাবের কারণেই নগরীর পুকুর এবং জলাশয় হারিয়ে গেছে। নগর উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত একাধিক সংস্থা এবং সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়হীনতার কারণে জলাশয় দখল বন্ধ করা যাচ্ছে না। সরকার ড্যাপ ঘোষণা করলেও পুকুর জলাশয় রক্ষায় কার্যকর কোন ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। অধিকন্তু বার বার সংশোধন হচ্ছে ড্যাপের পরিধি।
মত্স্য অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ১৯৮৫ সালে ঢাকায় পুকুরের সংখ্যা ছিল ২ হাজার। ১৯৮৯ সালের দিকে সেটা কমে ১ হাজার ২শ’তে নেমে আসে। ২০০৭ সালে মত্স্য ভবন থেকে পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, পুকুরের সংখ্যা ২শ’। তবে এখন হিসাব করলে ডোবা ও পুকুরের সংখ্যা একশ’র বেশি হবে না বলে মত্স্য ভবনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এদিকে ঢাকা শহরে পুকুরের সঠিক সংখ্যার হিসাব নেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছে।
পরিবেশ কর্মী বায়েজিদ আহমেদ বলেন, আগে ঢাকায় অসংখ্য পুকুর থাকলেও বর্তমানে তা ভরাট করে বাসাবাড়ি করা হয়েছে। শাহবাগে বড় দুটি পুকুর ছিল, যার একটি আজিজ সুপার মার্কেট এবং অন্যটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুজিব হল ও জিয়া হল করা হয়েছে। আজিজ সুপার মার্কেটের পশ্চিম পাশেও একটি পুকুর ছিল, যেখানে পাওয়ার হাউস করা হয়েছে।
শহরের শান্তিনগরের পীর সাহেবের গলিতেও অনেক বড় একটি পুকুর ছিল। চারদিক থেকে ভরাট করার কারণে এটা এখন ছোট ডোবায় পরিণত হয়েছে। শহরের জিগাতলা, রায়েরবাজার এলাকায় প্রচুর ডোবা ছিল। এখন এ ডোবাগুলোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে বহুতল ভবন।
বাসাবো, খিলগাঁও, রাজারবাগ এলাকার প্রায় সব পুকুরই সরকারিভাবে ভরাট করা হয়েছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পুকুর, কমলাপুর রেল স্টেশনের পূর্ব দিকে রেলের ঝিল, আহমদবাগ এলাকার ঝিলের নাম মানচিত্র থেকে উঠে গেছে। রেলওয়ের ঝিল দুটিতে হাসপাতাল ও কমিউনিটি সেন্টার হচ্ছে। খিলগাঁওতে বিখ্যাত পুকুর হয়ে গেছে খেলার মাঠ। পুরান ঢাকার শত বছরের ঐতিহ্য সিক্কাটুলী পুকুরটিও হুমকির মুখে।
অবশিষ্ট কিছু পুকুর
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের পুকুর নিয়ে কুসংস্কার ছিল– এখানে গোসল করতে গেলেই মারা পড়ে লোকজন। এই কুসংস্কারের ভিত্তিটা যে কতটা পাকাপোক্ত সেটা টের পাওয়া যায় কর্তৃপক্ষের সতর্কবাণী দেখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পুকুর আর জহুরুল হক হলের পুকুরেও সাঁতরানো যায় অনায়াসে। রমনা পার্কের পুকুরটি অসম্ভব রকম সুন্দর। চারদিকে স্নিগ্ধ সুন্দর প্রকৃতি। তার মাঝখানে টলটলে জলাধার। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরের পুকুরে পুণ্যার্থীরা স্নান সারতে আসেন নিয়মিত। কদমতলা-রাজারবাগের কালীমাতা মন্দিরে রয়েছে গঙ্গাসাগর দীঘি। এই দীঘিটি দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশাল। দেখতে খুবই মনোরম। বহু লোক প্রতিদিন এখানে আসে গোসল করতে। সবুজবাগের বৌদ্ধবিহারের পুকুরও উন্মুক্ত রয়েছে সাধারণ মানুষের জন্য। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলী-ইসলামপুরের নবাববাড়ির পুকুরে নামতে হলে অবশ্য কিছু টাকা খরচ করতে হবে। তবে এই পুকুরে গোসলের সময় কোন ধরনের সাবান ব্যবহার করা যায় না।
পুরান ঢাকার বংশাল পুকুরে রয়েছে সিঁড়িসহ দুটি ঘাট। বংশালের পুকুরটি ছয় বিঘা জমির ওপর কাটা। ১৮৪০ সালে এলাকাবাসীর পানি সমস্যা সমাধানের জন্য বংশালের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও জমিদার হাজি বদরুদ্দীন ভুট্টো নিজ জমিতে খনন করেন এ পুকুর। এ কারণে পুকুরটি ভুট্টো হাজির পুকুর হিসাবেও পরিচিত। পুকুরটির চারদিকে পাকা বেষ্টনী ও রাস্তা রয়েছে। নওয়াব আবদুল বারীর পুকুর। আহসান মঞ্জিল পরিবারের নওয়াব আবদুল বারীর খননকৃত বিশাল পুকুর। ১৮৩৮ সালে এটা খনন করা হয়। অনেক উত্থান-পতনের সঙ্গী এই গোল পুকুর। বড় বড় বিল্ডিংয়ের ঘেরাটোপে একখণ্ড কোমল স্নিগ্ধতা এই পুকুর। অনেক চড়াই-উত্তরাই পেরিয়ে এখন এই পুকুর পরিচালিত হচ্ছে মৌলভী খাজা আবদুল্লাহ ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের তত্ত্বাবধানে। এখানে গোসলের ব্যবস্থা আছে। তবে কাপড় কাঁচা, সাবান ব্যবহার করা নিষেধ।
নগরীর বাইরেও কমছে পুকুর
ঢাকা মহানগরের বাইরে সাভার, ধামরাই, কেরানীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহারেও কমছে পুকুরের সংখ্যা। মাছের উত্পাদনও কমে এসেছে। আগে সরকারি পুকুর ছিল ১২৫টি, যার আয়তন ৭৫ হেক্টর এবং বেসরকারি ছিল ৬ হাজার ৭শ’ ১৩টি। এগুলোর আয়তন ৪ হাজার ৯৮৫ হেক্টর। হিসাব অনুযায়ী খাস পুকুরের সংখ্যা অপরিবর্তিত থাকলেও বেসরকারি পুকুরের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭শ’ ২৯টিতে। ঢাকা জেলার পাঁচটি উপজেলার মানুষ পুকুর ভরাট করে বিল্ডিং তৈরি করছে। এছাড়া এ অঞ্চলের মানুষদের বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পুকুর ভরাট করে বিক্রি করছে। ফলে পুকুরের সংখ্যা কমে আসছে।
হারিয়ে যাচ্ছে ঢাকার খাল
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের সামপ্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ১৯৬০ সালে ঢাকা শহরে জলাশয় ও নিম্নভূমি ছিল ১৬ হাজার ৪৭৯ হেক্টর। ১৯৮৮ সালে তা কমে দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৮২১ হেক্টরে। ২০১৩ সালে কমে দাঁড়ায় ৯ হাজার ৩২৫ হেক্টরে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্যমতে, রাজধানীর ৪৩টি খালের ১৭টির হদিস নেই। বাকি ২৬টি খালের ৫টি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে নিয়েছে অসাধু চক্র। এগুলো হচ্ছে- মান্ডা, হাজারীবাগ, কসাইবাড়ি, সাংবাদিকলোনা ও বাইশ টোকি খাল। বেদখল খাল উদ্ধার করতে নেমে জেলা প্রশাসন ও ওয়াসার কর্মকর্তারা তালিকাভুক্ত এসব খালের অস্তিত্বই খুঁজে পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে ব্যক্তিমালিকানায় চলে যাওয়া খালগুলো ফিরে পেতে সরকারের সহায়তা চেয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। খালগুলো দখলের পর অবকাঠামোর এমন পরিবর্তন আনা হয়েছে যে, ওই স্থানে কখনও খাল ছিল তা বোঝার কোনো উপায় নেই।
অবিভক্ত সিটি করপোরেশনের ২০০৮ সালের এক জরিপে বলা হয়, রাজধানীতে একসময় ৪৪টি খাল ছিল। যার মধ্যে ৩৫টি খাল শুকিয়ে গেছে। অনেক খাল ভরাট করে সড়ক, ড্রেনেজ লাইন করে ফেলা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান জানান, ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর খালগুলো বাঁচিয়ে রাখতে আন্তরিকভাবে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। খাল পাকাকরণ, পরিষ্কার এবং খাল দখলমুক্ত করতে ওয়াকওয়ে নির্মাণকাজ করছে। ঢাকা ওয়াসার এ ধরনের কার্যক্রমের কারণে রাজধানীর বিদ্যমান খালগুলো নতুন করে দখল হচ্ছে না।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক বলেন, রাজধানীর খালগুলো দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় এবং ড্রেনগুলো সরু করার কারণে রাজধানীতে জলাবদ্ধতা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, রাজধানীর খাল এবং জলাধারগুলো ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
যেভাবে সংকুচিত হচ্ছে খাল
বাসাবো, বেগুনবাড়ি, মহাখালী, রামচন্দ্রপুর, আবদুল্লাহপুর, কল্যাণপুর, গুলশান, বনানী, কাটাসুর, ইব্রাহিমপুর, বাউনিয়া, দিয়াবাড়ী, কল্যাণপুর, শাহজাদপুর খালের অস্তিত্ব থাকলেও এগুলো এখন দখলদারদের থাবায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
জলবায়ু ইন্সটিটিউটের তথ্যমতে, রাজধানীর খালগুলোর সঙ্গে আশপাশের চারটি নদীর সংযোগ ছিল। সুত্রাপুর থেকে লোহারপুল হয়ে বুড়িগঙ্গা, মোহাম্মদপুরের বসিলা হয়ে বুড়িগঙ্গা, উত্তরা-আবদুল্লাহপুর হয়ে তুরাগ, উত্তরখান হয়ে তুরাগ, খিলক্ষেত ডুমনি হয়ে বালু ও মানিকনগর হয়ে শীতলক্ষ্যা নদ-নদীতে চলাচল করা যেতো। বুড়িগঙ্গা নদীর বসিলা থেকে ধানমন্ডি, তেজগাঁও, রামপুরা হয়ে তুরাগ নদে মিলেছিল শুক্রাবাদ খাল। এই খালের রায়েরবাজার, জিগাতলা ও শুক্রাবাদ এলাকায় এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এসব খালের ৮০ শতাংশই স্থায়ী স্থাপনার দখলে চলে গেছে। মোহাম্মদপুর ও পিসিকালচার হাউজিংয়ের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত কাটাসুর খালটি এখন নর্দমার আকৃতি পেয়েছে।
সেগুনবাগিচা খালটি একসময় পান্থপথ থেকে শুরু হয়ে হাতিরপুল, রমনা হয়ে সেগুনবাগিচা, বিজয়নগর, আরামবাগ, কমলাপুর, মানিকনগর, ডেমরা হয়ে শীতলক্ষ্যা নদীতে মিলেছিল। ঢাকার অন্যতম বড় খাল বেগুনবাড়ি খালের মাঝখানের অংশ হয়েছে হাতিরঝিল। খালটি পান্থপথ থেকে শুরু হয়ে সোনারগাঁও হোটেলের পেছন দিয়ে তেজগাঁও শিল্প এলাকা হয়ে রামপুরা ব্রিজের তলদেশ দিয়ে বনশ্রী ও আফতাব নগরের মধ্য দিয়ে বালু নদের সঙ্গে মিশেছে। এ খালের একটি অংশ মহাখালী বাস টার্মিনালের পাশ দিয়ে নাখালপাড়া পাগলাপুল হয়ে পুরাতন বিমানবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
কল্যাণপুর, শ্যামলী, আদাবর ও বায়তুল আমান এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত কল্যাণপুর খাল। একসময় এ খাল তুরাগ নদে সংযুক্ত ছিল। কিন্তু মোহাম্মদপুর-গাবতলী বেড়িবাঁধের কারণে গতিপথ বাধাগ্রস্ত হয়। এখন খাল সরু হয়ে নর্দমার আকৃতি ধারণ করেছে। দুর্গন্ধময় পানি এলাকাবাসীর জন্য দুঃসহ যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবদুল্লাহপুর খালটি হরিরামপুর, রানাভোলা, আবদুল্লাহপুর, উত্তরা, দলিপাড়া হয়ে বাউনিয়ায় গিয়ে মিশেছে।
বেদখল হয়ে যাওয়া আরও কয়েকটি খালের মধ্যে রয়েছে- মিরপুরের পল্লবী এলাকা ঘেঁষে যাওয়া বাউনিয়া খাল, পল্লবীর রূপনগর, বোটানিক্যাল গার্ডেনের উত্তর প্রান্ত দিয়ে যাওয়া দ্বিগুণ খাল, খিলগাঁও, বাসাবো ও সবুজবাগ এলাকা দিয়ে প্রবাহিত খিলগাঁও খাল, মুগদাপাড়া, জিরানী ও সবুজবাগ দিয়ে যাওয়া জিরানী খাল, মান্ডা, গোলাপবাগ, মানিকনগর এলাকা দিয়ে যাওয়া মান্ডা খাল। এছাড়া মিরপুরের কসাইবাড়ি ও বোয়ালিয়া এলাকা দিয়ে প্রবাহিত বোয়ালিয়া খাল, খিলক্ষেত পাতিরা ও ডুমনি এলাকা দিয়ে প্রবাহিত সুতিভোলা খালের ৬০ ভাগেরই কোনো অস্তিত্ব নেই।
