চিরকুট

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ১৯:৩০

কাউন্টারে বিল মিটিয়ে ব্যাগ হাতে বেরিয়ে যাচ্ছিল নবীন। আর ঠিক তখনই নবীন দেখতে পেলো তাকে। এক ঝলক একটুখানি দেখবার সুযোগ হলো কেবল। তবু থমকে গেল ও। ওর মনে হলো ‘যেন কোথায় দেখেছি! যেন খুব চেনা!’ ঘুরে দাঁড়াল নবীন। আবার ঢুকে পড়ল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের ভেতরে। হ্যাঁ, তাকের ওপর সাজানো জিনিসপত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এটা-ওটা দেখছে সে। হুট করে গিয়ে তো সামনে দাঁড়ানো যায় না! আগে ভালোভাবে দেখতে হবে, কে সে। জিনিসপত্র দেখার ছুতায় নবীন তাই ঘোরাঘুরি করতে লাগল। ভালোভাবে দেখতে চেষ্টা করল তাকে। আচমকা ঘুরে দাঁড়াল মেয়েটি, একেবারে সামনাসামনি। নবীনের মুখের দিকে  তাকিয়ে স্পষ্ট জিজ্ঞেস করল, ‘কিছু বলবেন?’ কিন্তু উত্তর শোনার অপেক্ষা করল না। পরমুহূর্তেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল সে, ‘আরে! নবীন দা তুমি!’ নবীন সশব্দে হেসে ফেলল। সেই চমত্কার হাসি। ইরার বুকের খুব গভীরে কী যেন একটু দোল দিয়ে গেল। ‘কেমন আছ ইরা?’ বলতে বলতে নবীন এগিয়ে এল দু’ কদম। স্পষ্ট করে যেন দেখতে চাইল ইরাকে।

কয়েকটা মুহূর্তমাত্র। তারপরই নবীনকে অবাক করে দিয়ে ইরা বলল, ‘এখানে একটা কফিশপ আছে দেখলাম। কিছুক্ষণ বসবে নবীন দা?’ নবীনের ভালো লাগল। এতকাল পরে দেখা। তবু ইরার মধ্যে কোনো জড়তা নেই। সেই সহজ সরলতা আজও ঘিরে আছে ওকে। পা বাড়াল নবীন। হাসল—‘কেন নয়? চলো, কফি খেতে খেতে কথা হবে।’ দোতলায় উঠে এল ওরা। কফিশপের ভেতরটা ছিমছাম, গোছানো। ভালো লাগল ইরার। জানালার পাশের একটা টেবিল দেখে বসল ওরা। এখান থেকে মার্কেটের সামনের রাস্তাটা দেখা যায়। আর রাস্তাটার ওপারে বিশাল ধূ-ধূ প্রান্তর চোখে পড়ে। যার ও-মাথায় কেবল একটা জোড়া-তালগাছ। নবমেঘে ছেয়ে আছে আগমনী বর্ষার সারা আকাশ। চুপচাপ দুজনেই তাকিয়ে রইল সেদিকে। ইরার কাছে নতুন এই জায়গাটা ভারি চমত্কার মনে হলো। মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগল ও। কিন্তু নবীন আগেও এসেছে কয়েকবার। তাই হয়তো প্রকৃতির দিকে না ছুটে ওর মন ছুটে গেল অতীত দিনের স্মৃতির অতলে।

কফি খেতে খেতে ইরা তাকাল নবীনের মুখের দিকে। যে প্রশ্নটা দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াচ্ছে ও, সেটা জানার জন্যই বোধহয় বিধাতা আজ এই সুযোগটা তৈরি করে দিলেন। তাই অকপটেই ও জানতে চাইল, ‘যুদ্ধ শেষে সবাই ফিরে এল। তুমি এত দেরি করলে কেন, নবীন দা?’ শেষ কথাটা বলতে গিয়ে গলার ভেতর যেন ছোট্ট একটা ব্যথা অনুভব করল ইরা। দূরের মেঘলা আকাশের দিকে খানিক চেয়ে রইল নবীন। তারপর বলল, ‘কেন, জয়া তোমায় বলেনি?’ ‘বলেছে। তবু...।’ বলে ইরা চেয়ে রইল নবীনের দিকে। ‘পায়ে গুলি লেগেছিল। আর আমারই যেন দুর্ভাগ্য। ইনফেকশন হয়ে মারাত্মক হয়ে উঠল সেটা। স্বাধীনতার উল্লাস ছড়িয়ে পড়লেও আমি কিন্তু বাড়ি ফিরতে পারলাম না। ওই অবস্থায় কেউ আমাকে নিয়ে আসতেও পারেনি। স্বাধীনতার অপূর্ব এক স্বর্ণরেণু গায়ে মেখে কত মুক্তিযোদ্ধাই তো বাড়ি ফিরে এল। আর আমি, আরও অনেক হতভাগ্য মুক্তিযোদ্ধার সাথে পড়ে রইলাম হাসপাতালে। পরে, যখন খানিকটা হাঁটতে পারলাম, তখন ফারুক আর শ্যামল আমায় নিয়ে এল বাড়িতে। কিন্তু ততদিনে তো পাহাড়তলি ছেড়ে তোমরা চলে গেছ!’ কথাটা শেষ করেই এত বছর পরেও নবীনের সারা মুখে যেন ছড়িয়ে পড়ল অভিমানের মেঘ। একদম চুপচাপ বসে রইল দুজনে।

সেই কতদিন আগে! ইরার তখন বালিকা থেকে কিশোরী হয়ে ওঠার সন্ধিকাল। আর সরল শান্ত মাধুর্যে ঘেরা এক কোমল অভিব্যাক্তি ওর। সে-সময়, বড় দা’র বন্ধু হয়েই এ বাড়িতে আগমন ঘটেছিল নবীনের। ভীষণ রকমের লাজুক আর একদম চুপচাপ ধরনের ছিল এই নবীন। অল্পদিনেই ইরার মায়ের মনে জায়গা করে নিল ও। ইরার মা ছিলেন বই পড়বার পোকা। আর অল্পদিনেই নবীন সেটা বুঝে নিল। লাইব্রেরি থেকে ভালো ভালো সব বই এনে দিতে লাগল মাকে। আর অচিরেই হয়ে উঠল ইরার মায়ের প্রিয়পাত্র। বলতে গেলে ইরার মায়ের সাথে যেন বন্ধুত্বই গড়ে উঠল নবীনের। কিন্তু ইরার ব্যাপারে ও এতটাই লাজুক ছিল যে, ইরা নামের কেউ এ বাড়িতে আছে তা-ই যেন ও জানত না। এক-দেড় বছর পর হঠাত্ একদিন ব্যাপারটা নাড়া দিল ইরার মনে। ইরার মনে হলো—নবীন দা’র কাছে আমি কি এতটাই তুচ্ছ! কোনো সময়, কখনোই কি আমার সাথে কথাবার্তা বলা যাবে না! কেমন এক ধরনের রাগ এসে গেল মনের মধ্যে। নবীনের সংকোচ ইরার কাছে তাচ্ছিল্য হয়ে ধরা দিল। আর সেটাই ক্রমশ জেদি করে তুলল ওকে।

দুষ্টুবুদ্ধি মাথায় চাপাল একদিন। তারপর শুরু হলো ইরার নিঃশব্দ, নির্বাক এক অভিনব খেলা। নবীন নতুন বই নিয়ে এলে মা বলেন, ‘যাও তো ইরা, এটা রেখে এস। আর আগেরটা এনে নবীনকে দাও।’ নবীনকে বই ফেরত দেবার সময় ইরা একদিন একটা ছোট্ট চিরকুট লিখল, ‘এত বোকা কেন তুমি!’ বই-এর ফাঁকে সেটা রেখে বই ফেরত দিল নবীনকে। কিন্তু অদ্ভুত! তারপরও দিব্যি বই আনা-নেওয়া করতে লাগল নবীন। কিন্তু ওর অভিব্যাক্তিতে, ওর চলনে-বলনে কোথাও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখতে পেলো না ইরা। মন খারাপ হয়ে গেল ইরার। বুদ্ধিটা মোটেই কাজে লাগল না। কিন্তু কেমন একধরনের জেদ চেপে গেল ইরার। তাই ও নিজেকে সংযত করল না। বরং তারপর, প্রায় দেড় বছর এই চিরকুটের খেলা একাই খেলে গেল ইরা। ‘এত নির্বোধ মানুষ তো কখনো দেখিনি!’ ‘রোবট না আর কিছু!’ ‘বোধ আর বুদ্ধি দুটোই যে অনুপস্থিত!’ কিংবা, ‘পাগল না ছন্নছাড়া?’ এরকম নানা ছোট ছোট কথায় লেখা চিরকুট ইরা দিয়ে দিতে লাগল বইয়ের পাতার ফাঁকে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না!

নবীনকে উত্যক্ত করতে এ খেলা খেলতে গিয়ে কখন যে নবীনের প্রতি ও নিজেই মনোযোগী হয়ে উঠেছে, ইরা তা বুঝতেও পারল না। চিরকুট লেখা, সেটা নবীনের হাত অবধি পৌঁছে দেওয়া, আর তারপর সেটার প্রতিক্রিয়া দেখার বা জানার আগ্রহ ওকে ধীরে ধীরে নবীনের প্রতি মনোযোগী করে তুলল। নবীনের নির্লিপ্ত নীরব অভিব্যক্তিকে ছাপিয়ে এক ছোট্ট কোমল অভিনব অনুভূতি জেগে রইলো ইরার মনের কোণে। জ্বলে রইলো ছোট্ট জোনাকির আলোর মতো।

এই রকম সময়েই কোথা থেকে এল এক ঘূর্ণি হাওয়া। ছোট ছোট সুখ, আনন্দ আর ভালোলাগাকে ছাপিয়ে শহর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল সন্ত্রাস আর শঙ্কা। আর তারপর, অল্পদিনের মধ্যেই বেজে উঠল যুদ্ধের দামামা। পাকিস্তানিদের অকথ্য অত্যাচার আর ভয়ঙ্কর তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে বাংলার ছেলেরা ঝাঁপিয়ে পড়ল মুক্তিযুদ্ধে। দেশমাতাকে স্বাধীন করে সোনার বাংলা গড়বার ব্রতে ঘর ছাড়ল তারা। তবে ইরার বড় দা আর নবীন দা’ই বা ঘরে বসে থাকবে কেন? পরদিন ভোরে রওনা হবে ওরা। আগের রাতে জানতে পারল ইরা। কাকভোরে উঠে পেছনের খিড়কির দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো ইরা। ও জানে, এখান থেকেই বড় দা’কে ডেকে নিয়ে যাবে নবীন। খিড়কি দরজায় এসে হতবাক হয়ে গেল নবীন। ইরা দাঁড়িয়ে আছে? ‘কী ব্যাপরে ইরা?’ এই প্রথম সরাসরি একটা প্রশ্ন  করল নবীন। তারপর দু’ কদম এগিয়ে এল। অবাক হয়ে গেল ইরার মুখের দিকে চেয়ে। ওর বড় বড় চমত্কার চোখ দুটোতে জল থৈ থৈ করছে। ‘নবীন দা, তুমি যেও না।’ বলতে বলতেই শ্রাবণের ধারার মতো নেমে এল চোখের জল। স্তব্ধ হয়ে গেল নবীন। বুকের ভেতর অদ্ভুত আর অভিনব এক শিরশিরে হাওয়া দোল দিয়ে গেল যেন! ততক্ষণে ইরা দেখল বড় দা এসে গেছে। ইরার মুখের দিকে মুহূর্তকাল চেয়ে রইলো নবীন। তারপরই হাঁটতে শুরু করল। ইরার দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল বড় দা। ‘কাঁদছিস কেন বোকার মতো? স্বাধীনতা আনতে যাচ্ছি, জানিস না!’ বলেই হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল বড় দা। এক অদ্ভুত শূন্যতায় ছেয়ে রইলো ইরার বুকের ভেতরটা।

যুদ্ধের সেই অস্থির সময়ে কত রকম অস্থিরতা, কত নতুন অভিজ্ঞতা! কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে ইরার বুকের গভীরে আশ্চর্য অচেনা এক অজানা অনুভূতি উঁকি দিয়ে রইলো। সেই আশ্চর্য অনুভূতি কখনো ওকে আলোড়িত করল, কখনো বুকে তিরতিরে এক কাঁপন ধরালো, কখনো বা অকারণেই বুক ভাসালো। বড় দা’র জন্য, নবীন দা’র জন্য সেই অপেক্ষার দিনগুলো বুঝি কোনোদিন ভোলার নয়!

তবে দীর্ঘ অপেক্ষার পরও ওরা কিন্তু কেউ ফিরে এল না। ইরাকে স্বাধীন দেশ এনে দিতে গিয়ে আত্মাহুতি দিয়েছে বড় দা। শহিদ হয়েছে দেশের জন্য। আর দীর্ঘদিন নবীন দা’র কোনো খবর জানা যায়নি। ছেলের মৃত্যু ইরার মা মেনে নিতে পারলেন না। আর সে কারণেই দেশ স্বাধীন হবার অল্পদিন পরেই তিনি চলে গেলন অন্য সেই ভুবনে, যেখানে তার ছেলে চলে গেছে। তারপরই আত্মীয়-স্বজন কিশোরী ইরার বিয়ে দিয়ে দিল। ইরাকে দেখেশুনে রাখবার দায়িত্ব থেকে এভাবেই নিজেদের মুক্ত করল তারা। জীবনের নানা জটিলতায় ততদিনে ইরার মনের অভিনব সেই তিরতিরে কাঁপুনি পাথরচাপা পড়ে গেল। হারিয়ে গেল কোন অজানায়!

আর তারপর, এতকাল বাদে দেখা সেই নবীন দা’র সাথে। এতসব ভাবতে ভাবতে কেমন আনমনা হয়ে ওঠে ইরা। হঠাত্ চোখ যায় নবীনের দিকে। ওর দিকে অপলক চেয়ে আছে নবীন। ইরা তাকাতেই নবীন বলে ওঠে, ‘তোমার মনে আছে ইরা, একদিন তোমাদের কলপাড়ে আছাড় খেয়ে পড়ে গিয়েছিলে? আমি খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম হাত-পা কিছু একটা ভেঙেছে। কিন্তু তুমি তক্ষুনি উঠে দৌড়ে ঘরে চলে গেলে।’ ‘ওমা! দৌড়ে যাবো না? খুব লজ্জা পেয়ে গেলাম যে! তখন কত ছোট ছিলাম না! বালিকাই বলা যায়, তা-ই না?’ নবীন হাসিমুখে চেয়ে থাকে ইরার দিকে। বলে, ‘বালিকা কি বলা যায়!’ ‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসু চোখে চেয়ে বলে ইরা। এবার নবীন তার চমত্কার হাসিটা হাসে। বলে, ‘কেবল বালিকা নয়, ছিলে বালিকা-কিশোরী।’ ‘সেটা কেমন?’ অবাক চোখে জানতে চায় ইরা। “রবি ঠাকুরের ‘শ্যামা’ নাটকের ‘উত্তীয়’-এর মতো! উত্তীয় ছিল বালক-কিশোর, আর তুমি ছিলে তখন বালিকা-কিশোরী!” বলে মিটিমিটি হাসে নবীন। ইরাও হেসে ফেলে এবার—‘এখন তুমি এত কথাও শিখেছ, নবীন দা!’ ‘মিথ্যা বলিনি কিন্তু! প্রমাণ চাও?’ শুনে হাসিমুখে চেয়ে থাকে ইরা। নবীন পকেট থেকে ওর ওয়ালেট বের করে রাখে টেবিলের ওপর। তারপর সেটা খুলে ছোট একটা খাম বের করে। কৌতূহলী হয়ে ওঠে ইরা। খামের মুখটা ফাঁক করে উপুর করে ঢেলে দেয় নবীন। বেরিয়ে পড়ে ছোট ছোট কাগজের টুকরো। ‘কতকাল আগের লেখা সেই চিরকুটগুলো!’ বিম্ময়ে হতবাক হয়ে যায় ইরা। চোখ সরাতে পারে না যেন! বুকের ভেতরের সেই নাম না জানা কাঁপন এতকাল বাদে আরও একবার দোল দিয়ে যায় বুকের গহিনে। এতকাল ধরে এগুলো বয়ে বেড়াচ্ছে নবীন দা! অথচ ও ভেবেছিল এগুলো কোনোদিন দেখেইনি নবীন। বিহ্বল হয়ে উঠল ইরা। অস্ফুটে বলে উঠল, ‘এগুলো এখনো আছে তোমার কাছে!’ নবীন হাসে, ‘কী করব? এগুলোই তো আমার সারা জীবনের সাথি।’ ইরা চোখ তুলে তাকাল নবীনের মুখের দিকে। হাসছে নবীন। কিন্তু এ কেমন হাসি? কষ্টের মেঘেরা যেন ঘিরে রেখেছে ওর হাসিকে। সংকোচের আবর্তে ঘেরা সেদিনের নবীন দা’কে বুঝতে না পারলেও, আজ কিন্তু নবীন দা’কে বুঝতে ওর কিছুমাত্র অসুবিধা হলো না। বুকের ভেতরটা বড় খালি খালি লাগল ইরার। নবীন আনমনে বলতে লাগল, ‘রাজকন্যাকে সোনার বাংলা উপহার দেবো বলে রাক্ষসদের মারতে গিয়েছিলাম। লড়াই করে রাক্ষসদের হাত থেকে সোনার বাংলাকে উদ্ধারও করেছিলাম। কিন্তু ফিরে এসে দেখি, রাজকন্যাই হারিয়ে গেছে!’ ইরা স্পষ্ট দেখতে পেলো অভিমান আর হতাশার মেঘেরা মুহূর্তেই এসে জড়িয়ে ধরল নবীনের সারা মুখে ছড়ানো কষ্টের মেঘেদের। বুকের কোণে এক অদ্ভুত চিনচিনে ব্যথা অনুভব করল ইরা। খুব যত্ন করে চিরকুটগুলো আবার গুছিয়ে নিল নবীন। তারপর সযত্নে রেখে দিল ওয়ালেটের ভেতর। নির্বাক হয়ে নীরবে বসে রইলো দুজন। পেরিয়ে গেল অনেকখানি সময়। হঠাত্ কোন গভীর গহন অতল থেকে উঠে আসা বুজে যাওয়া অস্পষ্ট গলায় নীরবতা ভেঙে নবীন বলে উঠল, ‘এবার উঠি তাহলে! অনেকখানি পথ যেতে হবে।’

উঠে পড়ল দুজন। একদম চুপচাপ। যেন কথা বলতে গেলেই এলোমেলো হয়ে যাবে সব! বাইরে এসে সিঁড়ির ওপর দাঁড়াল ওরা। ‘তুমি একা যেতে পারবে তো?’ জানতে চাইল নবীন। ‘পারব’ ছোট্ট করে জবাব দিল ইরা। নবীন তরতর করে নেমে গেল সিঁড়ি দিয়ে। শেষ ধাপে নেমে থমকে দাঁড়াল। মুহর্তকাল চেয়ে রইলো ইরার দিকে। যেন কিছু বলতে চাইল। কিন্তু বলল না। অথবা বলতে পারল না। তারপরই হাঁটতে শুরু করল। ইরা দেখল, ডান পা’টা সামান্য টেনে হাঁটছে নবীন। তবু চেষ্টা করছে জোরে হাঁটার। কিন্তু কেন!

খোলা মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে নবীন। ইরা সেদিকে চেয়েই রইলো। বিশাল মাঠ পেরিয়ে, জোড়া তালগাছ ছাড়িয়ে এগিয়ে চলল নবীন। মেঘলা আকাশের আবছা আলো পড়ন্ত বিকেলকে আরও আবছা করে তুলেছে। সন্ধ্যা না হতেই চারদিক থেকে ঘিরে আসছে যেন ছায়া ছায়া আঁধার। সেই অস্পষ্ট মায়াবী আলো ইরার দৃষ্টি থেকে আড়াল করে দিল নবীনকে। ইরার মনে হলো, নবীন দা যেন বিশাল প্রান্তর পেরিয়ে মিলিয়ে গেল দিগন্তের ওপারে। কয়েকটা মুহূর্ত! তারপরই ইরার থৈ থৈ চোখের জল আর বৃষ্টির ধারা নেমে এল যেন একইসাথে। বছরের প্রথম বৃষ্টি গায়ে মেখে ইরা দাঁড়িয়েই রইলো। ভিজতে লাগল। ফিসফিস করে বলতে লাগল, ‘তুমি আমায় একটা স্বাধীন দেশ এনে দিলে। আর আমি? কেবল কয়েকটা চিরকুট। যুদ্ধের ডামাডোলে আর সব কিছু হারিয়ে গেল। তবু আমাদের এই দেয়া-নেয়ার আস্বাদটুকু অসীম আকাশে মেঘেদের কোণে কোণে লুকিয়ে থাকুক অনন্তকাল!’