দেশ-কালের সীমা উত্তীর্ণ যে-ভাষণ

আপডেট : ০৭ মার্চ ২০১৯, ২২:১৩

প্রতিটি জাতির জীবনে এমন কিছু ঘটনা থাকে, সবকিছুকে ছাপিয়ে যা সেই জাতির আত্মার অবিভাজ্য অংশ হয়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সে রকমই একটি ঘটনা, যার তুলনা আমাদের ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। আর মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রেরণা ছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তো বটেই, স্বাধীনতার পরও সেই ভাষণ আমাদের প্রাণিত ও উজ্জীবিত করে চলেছে।

সেই ভাষণ যখন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকো বিশ্ব ইতিহাসের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করে, তখন সেটি হয়ে ওঠে সমগ্র দেশ ও জাতির গৌরবের সমাচার। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জ্যাকব এফ ফিল্ড বিশ্বের সেরা বক্তৃতাগুলো নিয়ে ‘উই শ্যাল ফাইট অন দ্য বিচেস: দ্য স্পিচেস দ্যাট ইন্সপায়ার হিস্ট্রি’ নামে যে বই লিখেছেন, তাতেও ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্বের অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়ী বক্তৃতা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেবল ঐতিহাসিক নিদর্শন নয়, গোটা জাতির প্রেরণা। যুগে যুগে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে আন্দোলিত করার মতো ভাষণ অনেক নেতাই দিয়েছেন। কিন্তু একই সঙ্গে সেই ভাষণের প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের নজির বিরল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র বাংলাদেশে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন গড়ে ওঠে, ২৫ মার্চের পর যা সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে রূপ নেয়। এক কথায় বলা যায়, এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের রণকৌশল। তাঁর এই ভাষণ কেবল মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে আমাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে তাই নয়, ভবিষ্যত্ প্রজন্মের জন্যও দিশা হয়ে থাকবে।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণের মাধ্যমে বাঙালি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি বাঙালিকে যেকোনো মূল্যে স্বাধীনতা অর্জনের নিমিত্তে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁর সেই নির্দেশ জাতি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি এখনো প্রাণবন্ত এবং যেকোনো মুক্তিকামী জাতিকে পথ দেখাতে পারে, পারে স্বাধীনতার স্বাদ দিতে। কারণ, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি সময়ের পরিক্রমায় না থেকে যুগের সাথে সতত বহমান। ইউনেস্কো প্রধান ইরিনা বোকোভো বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাষণ কোনো জাতির জন্য গণ্ডিবদ্ধ নয়, যেকোনো জাতি কিংবা গোষ্ঠী তাদের মুক্তির জন্য এ ভাষণ থেকে অনুপ্রেরণা পেতে পারে, পেতে পারে মুক্তিসংগ্রামের আলোকময় ছটা।

কাব্যিক মহিমা, শব্দশৈলী বিন্যাস ইতিহাসপ্রসিদ্ধ ভাষণের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সে বিবেচনাতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ইতিহাসের অন্যতম  শ্রেষ্ঠ। কারণ, ভাষণের প্রতি পরতে পরতে তিনি যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তাতে সাধারণের মধ্যে তিনি একেবারে মিশে যেতে সক্ষম হয়েছেন। এ কারণেও সম্ভবত বঙ্গবন্ধু রাজনীতির কবি হিসেবে আখ্যায়িত।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি অন্য সবার থেকে আলাদা ও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে থাকে। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের কোনো লিখিত ড্রাফট ছিল না। পৃথিবীর ইতিহাসে যে প্রসিদ্ধ ভাষণগুলো রয়েছে, সেখানে দেখা যায় নেতারা শুরুতে লিখিত আকারে শুরু করলেও পরে হূদয় নিংড়ানো উক্তি দিয়ে ভাষণ শেষ করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি পুরোটাই হূদয়ের তাড়নায় প্রস্ফুটিত, সাধারণের আবেগে তাড়িত হয়ে বাংলার মানুষের মনের বাসনাকেই কাব্যিক মহিমায় তুলে ধরেছিলেন রেসকোর্সের ময়দানে। তিনি স্বতঃ:স্ফূর্তভাবে মর্মস্পর্শী বয়ান তুলে ধরেছিলেন মুক্তিকামী মানুষের সামনে। আর বাঙালি জাতিও মুক্তিযুদ্ধের পুরোটা সময় বঙ্গবন্ধুর ভাষণটিকে মুখ্য পাঠ হিসেবে ধরে নিয়ে মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

বর্তমানে ৭ মার্চের ভাষণের গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? আমার মনে হয়, বর্তমানে ৭ মার্চের ভাষণের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই দেশের ইতিহাস সম্বন্ধে জানে না। জানে না কেন আমাদের স্বাধীনতার প্রয়োজন হয়েছিল? তাছাড়া আমাদের অভিভাবকেরা সে ব্যাপারে যথেষ্ট তাগিদ অনুভব করেন না। তাই ছেলেমেয়েরা পথভ্রষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি শতভাগ জোর দিয়ে বলতে পারি, কোন দেশপ্রেমিক ছেলেমেয়ে পথভ্রষ্ট হতে পারে না। ছেলেমেয়েদের দেশপ্রেমিক হওয়ার পেছনে পরিবারের ভূমিকা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ইতিহাস জানতে বাবা-মায়ের ভূমিকার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যথেষ্ট দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

৭ মার্চের ভাষণ একটি দালিলিক প্রমাণ। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন অগ্নিগর্ভ ভাষণের নমুনা খুব বেশি নেই। আমরা বাঙালি জাতি এ নিয়ে গর্ব করতে পারি। এ ভাষণটিকে যথাযথ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের  কাছে তুলে ধরা গেলে তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের স্পৃহা ও অনুরাগ বৃদ্ধি করা যাবে নিঃসন্দেহে। কারণ এ ভাষণের মাধ্যমেই বাঙালিরা মুক্তিসংগ্রামে উজ্জীবিত হয়েছিলেন। এ ভাষণেই বাঙালিদের শত বছরের শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস বর্ণিত হয়েছিল। বিশ্বের যে সকল নির্যাতিত সমপ্রদায় আজও তাদের স্বাধিকার থেকে বঞ্চিত, বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও নিস্পেষণের শিকার তাদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ উদ্দীপনা জোগাবে।

 লেখক: প্রভাষক, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিক্স বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়