যাবেন মালয়েশিয়ায় গেলেন লিবিয়ায়

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৯, ০৮:১৮

নাটোরের নলডাঙ্গার যুবক মমিনুল ইসলাম। যাবার কথা মালয়েশিয়ায়। কিন্তু দালাল নিয়ে যায় লিবিয়ার এক মরুভূমিতে। সেখানে নির্যাতন সেলে আটক রেখে মুক্তিপণের জন্য চলে অমানুষিক নির্যাতন। কিন্তু মুক্তিপণের টাকা প্রদানের পরও মিলছিল না মুক্তি। শেষটায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তায় মমিনুল ইসলাম দেশে ফেরেন গত ৩ মার্চ। বর্ণনা করেন নির্যাতন সেলের লোমহর্ষক কাহিনী। এ ঘটনায় গোয়েন্দা পুলিশ দালাল চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। তারা হলেন নোয়াখালীর সফিউল্লাহ, বরগুনার এহসান রাসেল ও নওগাঁর গুলজার হোসেন। রিমান্ডে এনে পুলিশ তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে বেশ কিছু দালাল চক্র মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে ভালো চাকরির লোভ দেখিয়ে কৌশলে লিবিয়ায় নিয়ে যায়। পরে সেলে আটক রেখে নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায় করে থাকে।

 

মমিনুল ইসলাম জানান, তিনি খুব বেশি পড়াশুনা করেননি। পরিবারের বড় সন্তান। গ্রামে তার মতো অনেকেই বিদেশ গিয়ে সংসারের চাকা ঘুরিয়েছে। তিনিও যাওয়ার জন্য সুযোগ খুঁজছিলেন। শেষটায় দালালের প্রলোভনে পড়েন। দালাল প্রস্তাব দেয় মালয়েশিয়া ভালো চাকরির ব্যবস্থা করে দেবে। দিতে হবে ৪ লাখ টাকা। দালালের কথা মতো দ্রুত পাসপোর্ট করে নেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিকে দালালদের হাতে টাকা তুলে দেওয়া হয়। এরপর গত ১ মার্চ দালালদের কথা মতো তিনি লাগেজ নিয়ে হাজির হন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এসময় দালালরা বিমানবন্দরের বাইরে তাকে জানায়, প্রথমে দুবাই যেতে হবে সেখান থেকে মালয়েশিয়া পাঠানো হবে।

 

প্রথম বিমানযাত্রা। ভয়ে ভয়ে উঠে পড়েন দুবাইগামী ফ্লাইটে। দুবাই এয়ারপোর্টে পৌঁছানোর পর জাহিদ নামে এক বাংলাদেশি যুবক তাকে রিসিভ করে। পরে দুবাই থেকে তাকে বাস করে নিয়ে যায় তিউনিসিয়ায়। সেখান থেকে একইভাবে নেওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজি শহর লাগোয়া এক মরুভূমিতে।

 

তিনি আরো জানান, বেনগাজীর যেখানে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সেটি বলতে গেলে বিশাল বালুমাঠ। রয়েছে বেশ কয়েকটি তাঁবু। সেখানে দেখা মেলে তার মতো আরো বাংলাদেশি শতাধিক যুবকের সঙ্গে। ওই যুবকদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি বুঝতে পারেন, সেটি দালাল চক্রের (বাংলাদেশি) নির্যাতন সেল। দালালরা এখানে তাদের আটক রেখে তাদের নির্যাতন করে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য। ঠিকমত খেতেও দেয় না। আর নির্যাতনের সময় তাদের আর্তচিত্কার মোবাইল ফোনে শোনানো হয় স্বজনদের। স্বজনরা প্রত্যাশিত টাকা দালালদের (বাংলাদেশ অবস্থানকারী সদস্য) হাতে তুলে দেওয়ার পরও অনেক সময় মুক্তি মেলে না। কোন কোন সময় শহরের কোন নির্জন স্থানে নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। পরবর্তী এসব হতভাগ্য যুবকদের আশ্রয় জোটে লিবিয়ার কোন কারাগারে।

 

মমিনুল তার মুক্তি পাওয়ার ব্যাপারে জানায়, লিবিয়ায় নির্যাতন সেলে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টা পরই তার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। তাকে বলা হয়, স্বজনরা যাতে আরো দুলাখ টাকা তাদেরকে প্রদান করে। নির্যাতন সহ্য না করতে পেরে সে দালালদের কথায় রাজি হয়। পরে দালাল জাহিদের (নির্যাতন সেলে অবস্থানকারী) ফোনে তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে। আর এ অবস্থায় ছেলেকে নির্যাতনের হাত থেকে রক্ষা করতে মমিনুলের মা বিথি আক্তার দ্রুত দালাল চক্রের সদস্য নওগাঁর ছাত্তারের হাতে ১ লাখ টাকা তুলে দেয়।

 

যেভাবে মুক্তি মেলে

 

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, মমিনুল ইসলামের মা বিথি আক্তার তার এক আত্মীয়ার মাধ্যমে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর তিনি দালাল চক্রের সন্ধানে অভিযান শুরু করেন। শুরুতেই রাজধানীর উত্তরা থেকে গ্রেফতার করেন দালাল চক্রের সদস্য গুলজার হোসেনকে। তার দেওয়া তথ্যমতে বিমানবন্দর এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয় এহাসন এবং উত্তরা থেকে সফিউল্লাহকে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে।

 

এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, গ্রেফতারকৃত সফিউল্লাহর মাধ্যমে লিবিয়ায় টর্চার সেলে অবস্থানকারী জাহিদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয়। পরে সফিউল্লাহর নির্দেশেই জাহিদ ঢাকাগামী বিমানের টিকিট কেটে গত ৩ মার্চ মমিনুল ইসলামকে দেশে পাঠায়। এ ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়েছে। ৪ মার্চ মমিনুল ইসলাম আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন।

 

মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) মশিউর রহমান বলেন, গ্রেফতারকৃতরা স্বীকার করেছে তাদের মতো আরো বেশ কয়েকটি চক্র রয়েছে। তাদের গ্রেফতারে অভিযান শুরু করা হয়েছে।

 

ইত্তেফাক/ইউবি