ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবত্সর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িলেও সেই অনুপাতে বাড়িতেছে না আবাসনব্যবস্থা। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আবাসিক হল ১৮টি। হলগুলিতে ধারণক্ষমতার চাইতে দ্বিগুণের অধিক শিক্ষার্থী বসবাস করেন। হলের কক্ষগুলি বত্সরের পর বত্সর দখল করিয়া রাখিয়াছে সাবেক ও বহিরাগত শিক্ষার্থীরা। ফলে বিপুলসংখ্যক বৈধ শিক্ষার্থীর ঠাঁই হইয়াছে হলের গণরুমগুলিতে। বিশেষ করিয়া প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলগুলিতে থাকিবার সুযোগ পান না বলিলেই চলে। এই সুযোগে হল নিয়ন্ত্রণকারী ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন কিছু কক্ষে তাহাদের থাকিবার ব্যবস্থা করে, যাহা ‘গণরুম’ নামে পরিচিত। যখন যেই সরকার ক্ষমতায় থাকে, তখন তাহাদের ছাত্র সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে থাকে এইসকল গণরুম। কোনো কোনো হলে কক্ষগুলি অছাত্র ও ছাত্রত্ব শেষ হওয়া ছাত্রনেতাদের দখলে থাকায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরাও ‘গণরুমে’ থাকিতেছেন। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন হইতে জানা গিয়াছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলে অন্তত ৮১টি গণরুম রহিয়াছে। এইসকল কক্ষে গাদাগাদি করিয়া থাকেন আড়াই হাজারের অধিক শিক্ষার্থী।
বলিবার অপেক্ষা রাখে না যে, ইহাতে ব্যাহত হইতেছে শিক্ষার পরিবেশ। অভিযোগ রহিয়াছে যে, হল প্রশাসনগুলির ঠিকঠাক নজরদারি না থাকিবার কারণে অবৈধ ও বহিরাগতদের উত্পাত আরো চরমে পৌঁছাইয়াছে। তাহাছাড়া, ছাত্রত্ব শেষ হওয়া অনেক শিক্ষার্থী বত্সরের পর বত্সর হলে অবস্থান করিতেছেন। অন্যদিকে ছাত্রনেতাদের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে বহিরাগতরাও থাকিতেছেন। এমনকী বহিরাগতদের নিকট হলের কক্ষ ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও রহিয়াছে অনেক ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে। অনেক ক্ষেত্রেই হল প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নামে সিট বরাদ্দ দিলেও সেই সিটে উঠিতে পারেন না সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আবার হল প্রশাসনও বরাদ্দকৃত সিটে উঠিতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের তেমন সহায়তা করে না মর্মে অভিযোগ রহিয়াছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানাইতেছে যে, আবাসন সুবিধা বাড়াইতে প্রয়োজন নূতন নূতন হল। তবে জমির অভাবে তাহা করা সম্ভবপর হইতেছে না। সম্প্রতি রাজধানীর পূর্বাচলে বিশ্ববিদ্যালয়টির দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের প্রস্তুতি চলিতেছে। সেইখানে ক্যাম্পাস নির্মাণ করা হইলে এই সমস্যা কিছুটা হইলেও কমিবে বটে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বিদ্যমান পুরাতন আবাসিক ভবনগুলির পরিবর্তে আরো বেশি বেশি বহুতল ভবন নির্মাণ করিতে পারেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েও আবাসিক হলে সমস্যা প্রকট। যদিও বিগত ১০ বত্সরে ৪৩টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫৩টি প্রশাসনিক ভবন ও একাডেমিক ভবন, ৭৩টি আবাসিক ভবন এবং ১০১টি আবাসিক হল নির্মাণ করা হইয়াছে। এইসব অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রায় ১৫ সহস্রাধিক শিক্ষার্থীর আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভবপর হইয়াছে। কিন্তু এখনো ব্যাপক আবাসিক সমস্যা বিদ্যমান এবং তাহার বড় একটি কারণ হইল অব্যবস্থাপনা। হলে আসন বরাদ্দে অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক প্রভাব দূর করা সম্ভবপর হইলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বৃহত্ একটি অংশের আবাসন সংকট দূর হইবে, ইহা নিশ্চিত করিয়া বলা যায়।
