দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি দিনই এক একটি ইতিহাস, প্রতিটি দিনই স্মরণীয় দিন। স্বাধীনতা ও বিজয় দিবস উদযাপনের সাথে সশস্ত্র বাহিনী ২১শে নভেম্বরকে উদযাপন করে ‘সশস্ত্রবাহিনী দিবস’ হিসেবে।
বাঙালি জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে এদেশের আপামর জনতা, সামরিক, আধাসামরিক, পুলিশ বাহিনী সেদিন ঝাঁপিয়ে পড়েছিল শৃঙ্খল ভেঙে পরাধীনতার গ্লানি মুছে স্বাধীনতার সাধ পেতে। এদের মাঝে ছিল সেই সময়ে সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত বিভিন্ন স্তরের অসংখ্যা বাঙালি সেনাসদস্য, যারা কর্মস্থল ত্যাগ করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে, ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে, বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে তারা যুদ্ধ করেছিল দীর্ঘদিন। চূড়ান্ত সফলতার জন্য মিত্রবাহিনীর অংশ হিসেবে ১৯৭১-এর ২১শে নভেম্বর আপামর জনতাকে সাথে নিয়ে প্রথমবারের মতো সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী একত্রিত হয়ে তাদের নিজস্ব শক্তি ও সামর্থ্য দিয়ে সম্মিলিতভাবে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে জল, স্থল ও আকাশ পথে সর্বাত্মক আক্রমণ পরিচালনা করেছিল এবং এরই মাধ্যমে বিজয় ত্বরান্বিত হয়েছিল। সেই সময় থেকেই শুরু হয়েছিল এই তিন বাহিনীর সম্মিলিত যাত্রা। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ শহীদের মাঝে রয়েছে এই বাহিনীত্রয়ের অসংখ্য সহকর্মী-সহযোদ্ধা। পঙ্গুত্ব বরণ করেছে এর অগণিত সদস্য।
সময়ের সাথে শক্তিশালী হয়েছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী, প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে সশস্ত্র বাহিনীও এগিয়ে যাচ্ছে সময়ের চাহিদা পূরণ করে সামনের দিকে। ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর আলোকে একটি আধুনিক ও চৌকস সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে চলছে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন। সেনাবাহিনীর আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় গঠন করা হয়েছে নতুন নতুন ডিভিশন, ব্রিগেড, ইউনিট, স্থাপনাসমূহ। অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জাম; চতুর্থ প্রজন্মের ট্যাংক এমবিটি-২০০০, আর্মড রিকভারি ভেহিকেল, সেল্ফ প্রপেল্ড (এসপি) কামান, অ্যান্টি ট্যাংক গাইডেড মিসাইল, লাইট আর্মাড ভেহিকেল, সাউন্ড রেঞ্জিং ইকুইপমেন্ট ও মাল্টিপল লঞ্চিং রকেট সিস্টেম, আপগ্রেডেড ট্যাংক টি-৫৯ জি ‘দুর্জয়’, মাল্টি লঞ্চ রকেট সিস্টেম, শোরাড স্যাম সিস্টেম, এমআই-১৭১ এস এইচ হেলিকপ্টার, মাল্টি ইঞ্জিন কাসা সি ২৯৫ ডব্লিউ বিমান ইত্যাদি।
নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে স্থাপিত হয়েছে নতুন নৌঘাঁটি, সংযোজিত হয়েছে নতুন যুদ্ধজাহাজ, পেট্রোল ক্রাফট, ল্যান্ডিং ক্রাফট, ইউটিলিটি এবং ল্যান্ডিং ক্রাফট, করভেট এবং মেরিটাইম প্যাট্রোল এয়ারক্রাফট। এছাড়া প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে সাবমেরিন বানৌজা নবযাত্রা ও বানৌজা জয়যাত্রা, যা নৌবাহিনীকে নিয়ে গিয়েছে অন্য মাত্রায়, দিয়েছে তাদের ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীর মর্যাদা।
বিমান বাহিনীর আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় গঠিত হয়েছে নতুন নতুন ইউনিট/স্থাপনা, অন্তর্ভুক্ত হয়েছে অত্যাধুনিক ডিজিটাল ককপিট সম্বলিত Yak-130 কম্ব্যাট ট্রেইনার বিমান, মেরিটাইম সার্চ এন্ড রেসকিউ হেলিকপ্টার AW-139, PT-6 প্রশিক্ষণ বিমান, এমআই-১৭১ ই স্যালুন (ভিআইপি) হেলিকপ্টার, F-7 BGI যুদ্ধ বিমান, Mi-171SH হেলিকপ্টার, K-8W জেট প্রশিক্ষণ বিমান, L-410 পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমান, C-130 JMK 5 এয়ার ক্রাফট, মাল্টি রোল কম্ব্যাট এয়ার ক্রাফট ইত্যাদি।
সশস্ত্র বাহিনী স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজ নিজ অবস্থানে দৃঢ় প্রত্যয়ী ও সদা প্রস্তুত। বাহিনীর নিজস্ব রণকৌশল ও সম্মিলিত যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের জন্য নিয়মিত আধুনিক ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ গ্রহণ ও চর্চা করছে। দেশ-বিদেশে নানাবিধ প্রশিক্ষণ গ্রহণ, দেশে ও দেশের বাইরে সম্মিলিতভাবে যুদ্ধ মহড়ায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদেরকে যোগ্য করে তুলেছেন।
প্রতি বছর ২১শে নভেম্বরে তিন বাহিনীর এই মিলন মেলায় সম্পৃক্ত হন এ দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানসহ মন্ত্রী, সাংসদ, মুক্তিযোদ্ধা, বিদেশি কূটনৈতিক, তিন বাহিনীতে কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক সদস্য এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। এই দিবসটি অন্যতম দিবস যেখানে দলমত নির্বিশেষে সকলের আগমন ঘটে। সশস্ত্র বাহিনী দেশের মানুষের কাছে যেমনি আস্থা অর্জন করেছে, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও, বিশেষভাবে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে নিজেদের আস্থা ও শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ রেখেছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় সশস্ত্র বাহিনী বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়েছে সবার অগ্রভাগে। এই দেশকে প্রতিষ্ঠিত করেছে বিশ্ব শান্তির এক অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী দেশ হিসেবে।
যে সশস্ত্র বাহিনী মুক্তিযুদ্ধে তার মৌলিক অস্ত্র ৩০৩ রাইফেল নিয়ে পাকিস্তানি সুসজ্জিত সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, সেই সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিক বাহিনীতে পরিণত করার যে রূপরেখা দিয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সেই রূপরেখার সফল বাস্তবায়নও করেছেন তারই সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী তাদের আধুনিকায়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক গৃহীত অভূতপূর্ব পদক্ষেপসমূহের জন্য চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী এগিয়ে যাবে সবার অগ্রভাগে।
