নিষ্ঠুর নূর হোসেন

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০১৫, ০০:০০

নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের পরিবহন শ্রমিক থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী হওয়ার নেপথ্যে রয়েছে নানা কাহিনী। সিদ্ধিরগঞ্জের টেকপাড়া এলাকার বদরউদ্দিনের ছেলে নূর হোসেন ১৯৮৫ সালে ট্রাকের হেলপারের কাজ করার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। মাত্র দুই বছরেই তিনি হেলপার থেকে চালক হয়ে যান। এরই মধ্যে শিমরাইল মোড়ে পরিবহনের হেলপার ও চালকদের সংগঠিত করে নানা অপর্কম শুরু করেন বর্তমানে আলোচিত এই সন্ত্রাসী।

 
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার তত্কালীন ওসিরা নূরের নির্যাতনের শিকার মানুষদের জিডি-মামলা গ্রহণ করতেন না। উল্টো নূরের পরামর্শে নির্যাতিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করতেন তারা। সাবেক ওই সব ওসিদের কারণেই জঘন্য সব অপরাধ করার সাহস পেয়েছেন নূর ও তার বাহিনী।
 
নূরের নির্যাতনের স্বীকার সিদ্ধিরগঞ্জের আজিবপুরের বাসিন্দা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘২০১৩ সালের ৬ অক্টোবর রাত ১২টার দিকে সাদ্বিসা মাজার হয়ে বাড়ি ফিরছিলাম। হঠাত্ ৩টি গাড়ি আমার পথ রোধ করে। নূর হোসেন চেয়ারম্যানসহ ১৪-১৫ জন লোক গাড়ি থেকে নেমে হিংস্র বাঘের মতো লাঠি, হকিস্টিক, রামদা, চাইনিজ কুড়াল দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে শুরু করে।’ সালাউদ্দিন আরো বলেন, ‘আমি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়লে তারা টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলে শিমরাইল ট্রাক স্ট্যান্ডের কাউন্সিলর অফিসে নিয়ে যায়। সেখানে আবার অমানুষিক নির্যাতন চালায়। এ সময় প্রচুর রক্তক্ষরণে অজ্ঞান হয়ে পড়ি। ভোরের দিকে এলাকাবাসী অফিসের সামনের রাস্তা থেকে আমাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। ৭ দিন অচেতন অবস্থায় থেকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছি। সেই নির্যাতনের কথা মনে পড়লে শরীর অবশ হয়ে পড়ে। এখনও হাত-পা নাড়াতে কষ্ট হয়। এরপর আবার মাদক, চুরি, ভাংচুরসহ ৪টি মিথ্যা মামলা দিয়ে বাড়িছাড়া করেন নূর হোসেন।’
 
নূর হোসেনের নির্যাতন থেকে বাদ যায়নি তার ছেলে ২১ বছর বয়সী বিপ্লবও। ২০১৩ সালের ৯ নভেম্বর তার নির্যাতনে বিপ্লবের মৃত্যু হয়। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে সক্ষম হন তিনি। তত্কালীন ওসি ও এসপি তার বাড়িতে অবস্থান নিয়ে বিপ্লবের লাশ দাফন করতে সহযোগিতা করেছিলেন এমন অভিযোগ রয়েছে। নূর হোসেনের বিষয়ে অনেকেই মুখ খুলতে রাজি হয়নি। কারাগার থেকে বের হতে পারলে পুনরায় তাদের উপর নির্যাতন করবে এটাই তাদের ভয়।
 
এদিকে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নূর হোসেনকে সাধারণ হাজতিদের ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে। তবে সাধারণ ওয়ার্ড হলেও এটি ‘অসাধারণ’। কেননা যারা সমাজের উঁচু শ্রেণির সাধারণ হাজতি, তাদের জায়গা হয় শাপলা ভবনের দ্বিতীয় তলায়। সেখানেই নূর হোসেনকে রাখা হয়েছে। সাধারণ হাজতিরা লাইনে দাঁড়িয়ে খাবার সংগ্রহ করলেও নূর হোসেনের খাবার সংগ্রহ করছেন অন্য এক হাজতি। টাকার জোরে কারাগারেও নূর হোসেন একজনকে কিনে ফেলেছেন। তার কাপড়-চোপড় অন্য আরেকজন ধুয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া তার শরীর মালিশ করে দেয়া হচ্ছে।
 
জানা যায়, কারাগারে জেল কোড অনুযায়ী নূর হোসেনের সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরা দেখা করেছেন। এ সময় শুকনো খাবার, বিস্কুট, চানাচুর, আপেল, কলা, আঙ্গুর ফল, ১০ কেসের মতো পানি ও শীতের পোশাক তার হাতে তুলে দেন স্বজনরা। কারা কর্তৃপক্ষও এর সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। এদিকে নূর হোসেন কারাগারে বসে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন বলে জানা গেছে।
 
জেলগেটের বাইরে একজন কারারক্ষী বলেন, নূর হোসেন কারাগারে আসার পরপরই কয়েকজন কারারক্ষী তার স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কেন এ যোগাযোগ, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোঝেন না কেন! নূর হোসেনের অনেক টাকা আছে। যেকোনো উপায়ে নূর টাকার বিনিময়ে ভালো থাকতে চাইবেন। আর এ সুযোগটা কারারক্ষীরা নেয়ার চেষ্টা করছেন।’
 

এদিকে, নূর হোসেনের এক যুগেরও বেশি সময়ের সার্বক্ষণিক সঙ্গী আলী মোহাম্মদের দেয়া জবানবন্দিতে উঠে এসেছে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। নৃশংস হত্যাযজ্ঞের আরও অনেক অজানা তথ্যই বেরিয়ে এসেছে আলী মোহাম্মদের জবানিতে। গত বছরের ২৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের খাস কামরায় অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছিল। তিনি বলেন, সাত খুনের ঘটনার দিন রাত সাড়ে ১২টা থেকে ১টার দিকে নূর হোসেন তার বাড়ির দোতলায় সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বলে, দেখ নজরুল আমার সঙ্গে বাড়াবাড়ি করছে। দিছি তারে দুনিয়া থেকে সরাইয়া। যা তোরা বাড়িতে গিয়া আরামে ঘুমা।