মিয়ানমারে এসব কী হচ্ছে?

আপডেট : ২০ নভেম্বর ২০১৮, ২১:৪৬

 

গত দুই দশকের মধ্যে (১৯৯৮-২০১৮) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো নেতাই ‘গণতন্ত্রই মুক্তি, গণতন্ত্রই শক্তি’ এই দৃঢ় চেতনায় অং সাং সুচির চেয়ে এগিয়ে থাকার কথা নয়। সুদীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দি থাকার পর যখন ২০১৫ সালে তাঁর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি নির্বাচনে বিজয়ী হয়, মিয়ানমারের জনগণ ও ব্রাসেলস-দিল্লি-ঢাকার এটি ছিল গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস। তবে ইতিহাস ঠিক করবে প্রকৃতপক্ষে ‘নেপিডো’-তে কারা লাভবান হয়েছিল। আপাতত মিয়ানমারকে গণতন্ত্রের পথে আরো সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। মিয়ানমারের গণতন্ত্রের ‘মানসকন্যা’ আজ গণতন্ত্রের খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছেন, যে খাদে গণতন্ত্রের পথেই অধিকার হরণের প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন করা হয়েছে। গণতন্ত্রের ঢালের আড়ালে নয়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিনিয়োগের সোনার খাঁচায় মিয়ানমারের সমাজ বন্দি হয়ে যাচ্ছে।

বৈচিত্র্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যই গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য। তবে তা কেবল গণতন্ত্রমনা মানুষের জন্য। মিয়ানমারের জন্য কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে এই বৈচিত্র্যকেই ‘জাতিগত বিদ্বেষ’ ও পরে রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের নীতিতে রূপ দিয়ে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার দীর্ঘ মেয়াদি এজেন্ডা। পৃথিবীর অন্যতম বৈচিত্র্যপূর্ণ এ দেশটিতে দুই শতাধিক জাতির বসবাস। এর মধ্যে বামান ৯টি, চ্যাইন (২.৫০%) ৫৩টি, ক্যাইন ১১টি, ক্যায়া ৯টি, মোন (২%) ১২টি, রাখাইন (৩.৫০%) ৭টি, শান ৩৩টি এবং কাচিন (১.৫০%)—এই ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠী প্রধান ৮টি গোষ্ঠীতে বিভক্ত এবং এরাই কেবল সরকারিভাবে স্বীকৃত। আর ধর্মের দিক থেকে ৮৭.৯% বৌদ্ধ, ৬.২% খ্রিস্টান, ৪.৩% মুসলমান। বামান ছাড়াও মোট জনসংখ্যার ৩২%-ই অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী। জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশন মিয়ানমারের ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উদ্দেশ্যমূলক গ্রেপ্তার, বাধ্যতামূলক শ্রম, নিপীড়ন ও যৌন সহিংসতা, বিচার বহির্ভূত হত্যা, ধর্ষণ।

দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় জাতিগত বিদ্বেষ ও ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি নতুন কিছু নয়। এ অঞ্চলের ১৭টি দেশের মধ্যে কেবল কয়েকটি দেশ একবিংশ শতাব্দীর এই দুই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেয়েছে। তবে অমসৃণ গণতন্ত্রের মিয়ানমারের ক্ষেত্রে এটি আরো জটিল ভূরাজনৈতিক খেলার অংশ। দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জাতিগত কাঠামো ও জাতীয় চেতনার সঙ্গে উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় বিভাজন ও সংখ্যালঘুর অধিকার হরণের একটি সাংঘর্ষিক বিরোধ রয়েছে। আর নয়া সাম্রাজ্যবাদী শক্তি মূলত এ আদর্শগত বিরোধের উর্বর ক্ষেত্রগুলোতেই বিনিয়োগ করছে। কারণ তারা গণতন্ত্রকে ভয় পায়, বৈচিত্র্যকে ভয় পায়।

চার দশক ধরে (১৯৬২-২০১১) আন্তর্জাতিক অবরোধের মুখে থাকা একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশের পক্ষে আঞ্চলিক কোনো পরাশক্তির ‘সবুজ সংকেত’ ছাড়া সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর এরূপ অপারেশন চালানো সম্ভব নয়। দক্ষিণ এশিয়ার ওপর ক্রমাগত ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে এই নয়াশক্তি পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালে একই বিনিয়োগ কৌশলে এগিয়ে। এই নীতি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য কতটা হুমকি তা ইতোমধ্যেই ঢাকা-ওয়াশিংটন-নয়াদিল্লির উপলব্ধি হয়েছে। নয়া সাম্রাজ্যবাদী এই কৌশল দিন শেষে গণতন্ত্রকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তাই পৃথিবীর প্রত্যেকটি শক্তিকে দক্ষিণ ও দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার গণতন্ত্রমনা প্রত্যেক নেতার পাশে দাঁড়াতে হবে। যেন কোনো অর্থনৈতিক কূটকৌশলই একটি অবাধ, স্বাধীন, গণতান্ত্রিক ভারত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াতে না পারে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও সুদীর্ঘ সময় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন। তাঁর উচিত রোহিঙ্গা সংকটকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সমাজের সীমাবদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করা। মিয়ানমারের প্রত্যেকটি জাতিগোষ্ঠীর নাগরিক যেদিন সমান মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে, সেই দিনই রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান হবে। যত দেরিই হোক না কেন মিয়ানমার ও বাংলাদেশের দুই গণতন্ত্রের মানসকন্যার সেদিনের জন্য অপেক্ষা না করে উপায় নেই।

ঢাকা কমার্স কলেজ