চোরাই পথে আসছে পণ্য : রাজস্ব আয়ে বড় ধরণের ধস

আপডেট : ২৫ নভেম্বর ২০১৫, ২০:৩৭
 
বেনাপোল বন্দর থেকে খালাশ করা আমদানিকৃত বৈধপণ্য মাঝপথে বিজিবি কর্তৃক আটক করে হয়রানির প্রতিবাদে এই বন্দর দিয়ে অনির্দিষ্টকালের জন্য আমদানি-রফতানি বন্ধের হুমকি দিয়েছে বন্দর ব্যবহারকারী সংগঠনগুলো।
 
বিজিবির হয়রানির কারনে ইতিমধ্যে বেনাপোল বন্দর দিয়ে পন্য আমদানি কমে গিয়ে রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ধ্বস নামতে শুরু করেছে। বৈধপথে পন্য আমদানি বন্ধ করে একটি মহল অবৈধপথে পন্য আমদানিকে উৎসাহীত করছে প্রত্যক্ষভাবে। গত ২৩ নভেম্বর রাজস্ব আয় বৃদ্ধি ও অদালতে ঝুলে থাকা রাজস্ব সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পওির লক্ষ্যে বেনাপোলে আসা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের কাছে ব্যবসায়ীরা বিজিবির হয়রানির অভিযোগ'র তথ্য তুলে ধরলে রাজস্ব বোর্ডের মেম্বার (কাস্টমস) ফরিদ উদ্দিন জানান, বৈধ রুটে আমদানি করা কোন পণ্য চালান আটক করার কোন বৈধতা নেই বিজিবির। তবে বিজিবি যদি কোন ইনফরমেশন পায় তাহলে তাৎক্ষনিকভাবে তারা বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কমিশনারকে অবহিত করবেন। কমিশনরাই পণ্য চালানটি পুনঃপরীক্ষা নিরীক্ষা করে যদি কোন অনিয়ম পান তাহলে কাস্টমস অ্যাক্ট অনুয়ায়ী ব্যবস্থা গ্রহন করবেন।
 
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ বেনাপোল বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত বৈধ পণ্য রাজস্ব পরিশোধ করে বন্দর থেকে খালাশ নেয়ার পর বিজিবির হয়রানির কারণে আমদানি কমে অর্ধেকে নেমে এসেছে। গত ৩ নভেম্বর তারিখে ঢাকার আমদানিকারক মেসার্স তানজিম এন্টারপ্রাইজ, ভারতে থেকে ২৪৯ প্যাকেজ থান কাপড় আমদানি করেন, যার কাস্টমস বি/ই নাম্বার -৬০৭৯৬ তারিখ :-৩/১১/১৫
 
পণ্য চালানটি কাস্টমস এর সকল আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে ১৭ লক্ষ ৬৫ হাজার ৩০৭ টাকার রাজস্ব পরিশোধের পর  ঢাকায় যাওয়ার সময় মাঝ পথে বিজিবি পণ্য চালানটি আটক করে তিনদিন পর বেনাপোল কাস্টম হাউসে জমা প্রদান করেন। পরে কাস্টম ও বিজিবি যৌথ পরীক্ষা করে পণ্য চালানের ঘোষিত পরিমান ও সংখ্যা সঠিক পাওযা যায়।
 
একই দিনে ঢাকার আমদানিকারক আনাম এন্টারপ্রাইজ ভারত থেকে ২৮০ প্যাকেজ থান কাপড় আমদানি করেন যার কাস্টমস বি/ই নং- ৬০৬৯৬ তারিখ:- ৩/১১/১৫ যেখানে ১৬ লাখ ৬৬ হাজার ২১৭ টাকার রাজস্ব পরিশোধ করে ঢাকায় যাওযার পথে বিজিবি মাঝ পথে তা আটক করে, কোন গড়মিল না পাওয়ার পরও কাস্টমস এ জমা প্রদান করে বলে সংশ্লিস্ট সিএন্ডএফ  এজেন্ট’র মালিক সেলিম জানান।
 
তবে ২৬ বিজিবির অদিনায়ক লে. কর্নেল জাহাংগীর হোসেন জানান, পণ্যচালানটি থান কাপড় হিসেবে আমদানি করা হলেও মূলত : এগুলো শাড়ি হিসেবে ব্যবহার হবে। এতে সরকারে রাজস্ব ফাকি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ বলছে এ ক্ষেত্রে রাজস্ব ফাকির কোন ঘটনা ঘটেনি। কারণ থান কাপড় কেটে জামা ও থ্রিপিচ তৈরি করা যায়। যদি থানে ১২ হাত পরপর ব্লাউজ পিচ সহ মার্জিন করা থাকে তাহলে এটিকে শাড়ি হিসেবে ধরা হবে।
 
বেনাপোল কাস্টমসের সহকারী কমিশনার ড. সিরাজুল ইসলাম জানান, ভারত থেকে যে সব কমার্শিয়াল আইটেম আমদানি হয় তার মধ্যে কাপড় আমদানি খাতে সরকার প্রতিদিন প্রায় ৩/৪ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করে থাকে। আমদানিকৃত থান কাপড় যথাযথ রাজস্ব আদায় করেই খালাশ দেয়া হযে থাকে। সাধারণত ২০/৩০ মিটারের থান কাপড়ে যদি কোথাও কোন মার্জিন করা না থাকে তাহলে সেটাকে শাড়ি হিসেবে শুল্কায়ন করার কোন সুযোগ নেই। যদি কাপড়ে মার্জিন করা থাকে তাহলে  শাড়ি ফেব্রিকস হিসেবে প্রতিকেজি ৪.৫০ মার্কিন ডলারে শুল্কায়ন করা হয়ে থাকে। যদি পাতলা জর্জেট থান কাপড়ে মার্জিন থাকে তাহলে সেটাকে ওড়না ফেব্রিকস হিসেবে প্রতিকেজি ৩.২০ মার্কিন ডলারে শুল্কায়ন করা হয়। বাংলাদেশের অন্যাণ্য কাস্টম হাউসের চেয়ে বেনাপোলে এ জাতীয় পন্য বেশি মূল্যে শুল্কায়ন করা হচেছ। সেখানে ক্যাটাগরি করে এ জাতীয় পণ্যের শুল্কায়ন করা হয় না।
 
ভারত থেকে বেনাপোল বন্দর দিয়ে সবচেয়ে কম সময়ে দ্রুত পণ্য আমদানি করা সম্ভব। আগে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন আমদানি হতো প্রায় পাঁচশ ট্রাক মালামাল। বর্তমানে আমদানি হচ্ছে তার অর্ধেক। বেনাপোল বন্দরের চিরচেনা উচ্চ শুল্কহারের পণ্যগুলো অধিকাংশ এখন আমদানি হচ্ছে মংলা, সোনামসজিদ ও বুড়িমাড়ি  বন্দর দিয়ে।
 
ফল, পেয়াজ, চাল, মাছসহ পচনশীল পণ্য চলে গেছে ভোমরা ও সোনামসজিদ বন্দরে। বেনাপোল কাস্টমসের সঙ্গে অন্য সব শুল্ক স্টেশনগুলোর অভিন্ন মূল্যে শুল্কায়ন না হওয়ায় আমদানিকারকরা তাদের সুবিধার্থে অন্য বন্দরে চলে যাচ্ছে বলে জানান সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ীরা।
 
আমদানি-রফতানি কারক সমিতির সহ-সভাপতি আমিনুল হক আনু জানান, বেনাপোল কাস্টমস হাউসে রাজস্ব বোর্ড সম্প্রতি তিন জন সৎ ও দক্ষ অফিসার নিযোগ দিযেছেন। বর্তমানে পণ্য চালান স্বচ্ছতার সঙ্গে পরীক্ষা করে মূল্য বৃদ্ধির কারণে আমদানিকারকরা এই বন্দর ছেড়ে মংলা, সোনামসজিদ, বুড়িমাড়ি ও ভেমারা বন্দরে চলে গেছে। একদিকে কাস্টমস এর কড়াকড়ি অন্যদিকে বিজিবির হয়রানি সব মিলিয়ে বেনাপোল বন্দরে অমদানি-রফতানি বানিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
 
বেনাপোল কাস্টম হাউসের কমিশনার এ এফএম আব্দুললাহ খান জানান, কাস্টম হাউসে মূল্য বৃদ্ধির কারণে কমার্শিয়াল আইটেম'র আমদানি কমে গেছে। তবে অন্যন্য শুল্ক স্টেশন দিয়ে এ জাতীয় পণ্য খালাশ হচ্ছে। তাছাড়া চোরাচালানের মাধ্যমে এসব পণ্য আসায় সরকার একদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে এবং অবৈধ ভাবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা পাচার হচ্ছে। রাজস্ব আয় কমে গেলেও গ্রোথ বেড়ে ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে যে পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করা হযেছে আর পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করা হবে না। সার বিশ্বে পেট্রোলিয়াম জাত পণ্যের মূল্য কমে যাওয়ায় পণ্যের মূল্যও কমে গেছে আন্তর্জাতিক বাজারে।