জারের পানিতেও ডায়রিয়া-কলেরার জীবাণু!

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৯, ২১:১৫

সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই এখন পারতপক্ষে অনিরাপদ পানি পান করেন না। কারণ এই পানি যে তাহাদের মৃত্যুরও কারণ হইতে পারে—তাহা কমবেশি সকলেই জানেন। ফলে মানুষ বাড়তি অর্থ ব্যয় করিয়া বোতলজাত বা জারের পানি পান করিতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করিয়া থাকেন। মূলত ক্রমবর্ধমান এই চাহিদার কারণেই রাজধানীর সাধারণ চায়ের দোকান হইতে শুরু করিয়া বিভিন্ন অফিস-আদালতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সরবরাহ হইতেছে জারভর্তি পানি। রাজধানী ঢাকাসহ নগরগুলিতে গড়িয়া উঠিয়াছে পানির রমরমা বাণিজ্য। কিন্তু অতিশয় উদ্বেগের বিষয় হইল, জনগণ তাহাদের কষ্টার্জিত অর্থ ব্যয় করিয়া যেই পানি ক্রয় করিতেছেন সেইসকল জারের অধিকাংশেরই পানিতে রহিয়াছে ডায়রিয়া ও কলেরার জীবাণু। খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরির এক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠিয়া আসিয়াছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থান হইতে সংগৃহীত জারের পানির নমুনা পরীক্ষা করিয়া সেইগুলির অধিকাংশেই উচ্চমাত্রায় কলিফর্মের (ডায়রিয়া ও কলেরার জীবাণু) উপস্থিতি শনাক্ত করিয়াছে পাবলিক হেলথ ল্যাবরেটরি। এই তথ্য অবগত হইবার পর ভোক্তাসাধারণের স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত উদ্বেগ যদি গভীর হতাশা ও ক্ষোভে পর্যবসিত হয় তাহা হইলে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না।

নিরাপদ পানির নামে কার্যত কী ভয়াবহ সব কান্ডকারখানা চলিতেছে তাহা কাহারও অজানা নহে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গত বছরের ১৫ এপ্রিল হইতে ১৫ মে পর্যন্ত রাজধানীর মিরপুর, ক্যান্টনমেন্ট, ভাসানটেক, পল্টন, বিমানবন্দর, মোহাম্মদপুর, উত্তরা, ধানমন্ডি, তেজগাঁও, শেরেবাংলা নগর, যাত্রাবাড়ী, কাফরুল, রমনা ও লালবাগ থানার ২৬টি অফিসপাড়া ও জনবহুল স্থানের রাস্তার পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হইতে জারের পানির ৮০টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। অভিজ্ঞ স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের সংগৃহীত এইসকল নমুনা পাবলিক হেলথ ল্যাবে পরীক্ষা করার পর ৪৪টি নমুনাতেই কলিফর্মের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে। আটটি নমুনায় কলিফর্ম ও ফিকাল কলিফর্ম (মলমূত্রের সঙ্গে ছড়ানো কলিফর্ম) উভয়েরই উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে। কলিফর্ম ছাড়াও প্লাস্টিকের তৈরি অপরিচ্ছন্ন এইসকল জারের পানি আরো নানাভাবে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করিতেছে বলিয়া সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এমনকি প্লাস্টিকের ক্ষতিকর উপাদানগুলিও পানিতে মিশিয়া মারাত্মক দূষণ সৃষ্টি করে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যুর ২৪ শতাংশই ঘটিতেছে কোনো না কোনো পানিবাহিত রোগের কারণে। অনিরাপদ পানি পানের কারণে একদিকে যেমন ডায়রিয়া, কলেরা, জন্ডিস, টাইফয়েডসহ নানা পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটিতেছে, অন্যদিকে তেমনি প্রতি বত্সর ডায়রিয়ার কারণে প্রাণ হারাইতেছে এক লক্ষ শিশু। অসাধু পানি-বাণিজ্যের হোতাদের এই প্রতারণা নূতন নহে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) ২৫০টি জারের পানির নমুনা পরীক্ষা করিয়াছিল। সেই সময়েও উচ্চমাত্রায় কলিফর্ম ও ফিকাল কলিফর্ম ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছিল।

যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন তোলা যায় যে, দেশে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)সহ এত যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রহিয়াছে তাহারা তবে করেন কী? সমপ্রতি উচ্চ আদালতও প্রশ্নটি তুলিয়াছেন বেশ জোরালোভাবে। কর্তৃপক্ষ যে বসিয়া আছেন তাহাও নহে। অভিযান চলিতেছে। শত শত জার ধ্বংস করা হইতেছে। সিলগালা করা হইতেছে বহু ভেজাল পানির কারখানা। কিন্তু দুর্বৃত্তপনা থামিতেছে না। এই ক্ষেত্রেও কি তবে ‘জিরো টলারেন্স’-এর পথেই হাঁটিতে হইবে?