আজ বহুল প্রতীক্ষিত ডাকসু নির্বাচন। গত ২৮ বছরের অচলায়তন ভেঙে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষার্থীরা পেতে যাচ্ছে তাদের কথা বলার অধিকার। সেইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি-নির্ধারণী মহল পেতে যাচ্ছে পূর্ণাঙ্গ একটি সিনেট। স্বাধীন একটি গণতান্ত্রিক দেশে দীর্ঘ এ খরা কাটিয়ে ছাত্ররাজনীতির এই মূল্যবান প্রতিষ্ঠানটি কতটা কার্যকর হবে তার গৌরবময় অতীতের তুলনায় সবার দৃষ্টি এবার সেদিকে। অতীতের নির্বাচনে দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের প্রশ্নে জয়-পরাজয় ছিল শুধুমাত্র একটি ভোটের হিসেব, সেখানে যেই নির্বাচিত হোক একাত্তরের পূর্বে স্বাধীনতা আর নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারই ছিল মুখ্য বিষয়। কিন্তু বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে একটি জটিল সমীকরণে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠন ও তার প্রধান বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্রদের কাছে এখন তাদের মাতৃ সংগঠনের উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের হাতিয়ার ছাড়া আর কিছুই নয়। অন্যদিকে সমসাময়িক সামাজিক প্রেক্ষাপটে তৈরি কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনও এবারের নির্বাচনে একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলশ্রুতিতেই গতানুগতিক রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের বাইরেও ডাকসু নির্বাচনে সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, স্বাধিকার ও স্বতন্ত্র জোটভিত্তিক প্যানেল ঘোষণা করেছে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা ও অন্যান্য আন্দোলনকারীরা।
এতসব জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে প্রতিটি প্যানেলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। ক্ষমতাসীন ছাত্রলীগ থেকে শুরু করে বিরোধী সংগঠন হিসেবে পরিচিত ছাত্রদল ও বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ, প্রগতিশীল ছাত্র জোট, স্বাধিকার স্বতন্ত্র পরিষদ, স্বতন্ত্র জোট নিজ নিজ ইশতেহারে গুরুত্ব দিয়েছে বর্তমান সমস্যাগুলোকে। এবারে ক্ষমতাসীন দল থেকে শুরু করে অন্যান্য সবার ইশতেহারেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তারা প্রত্যেকেই ফিরিয়ে আনতে চান ডাকসুর অতীত গৌরবকে। শিক্ষার্থীদের অধিকারের প্রশ্নে জর্জরিত করতে চান প্রশাসনকে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন বাদে অন্যান্য সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসকে নির্দিষ্ট সংগঠনের দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করে সকলের সহাবস্থানের দিকেও দিচ্ছেন সবিশেষ গুরুত্ব।
ছাত্র সংগঠনগুলো এবারে ইশতেহার প্রণয়নের সময় দৃষ্টি রেখেছে সাধারণ ছাত্রদের দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও হতাশার দিকে। ফলে তাদের প্রত্যেকের ইশতেহারেই মোটামুটি একই বিষয় গুরুত্ব পেয়ে আসছে।
তবে এত এত প্রতিশ্রুতি আর ইশতেহারের ভিড়ে সাধারণ ছাত্ররা কি চাইছেন তাও দেখা দরকার। ক্যাম্পাসের অধিকাংশ শিক্ষার্থীই চান নিজেদের কথা বলার অধিকার, প্রশাসন ও শিক্ষকদের যে কোনো স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর মতো একটি মঞ্চ। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কে শুধুমাত্র কর্পোরেট চাহিদার যোগানদাতা হিসেবে না গড়ে ভবিষ্যতের বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের এক অনন্য যোগানদাতা হিসেবেও দেখতে চান তারা। ফলে শিক্ষকদের মান নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি গ্রন্থাগারে আসন সমস্যা, যুগোপযোগী গ্রন্থ, জার্নাল ও গবেষণা খাতে বিশেষ বরাদ্দসহ নানা চাহিদা তাদের।
এসবের প্রেক্ষিতেই অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা নিজেদের ইশতেহারে রেখেছেন এসব সমস্যার সমাধান করার প্রতিশ্রুতি। একইসঙ্গে ক্যাম্পাসে সকল ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থানের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন শিক্ষার্থীরা। তারা মনে করছেন সকলের সহাবস্থান থাকলে ক্যাম্পাসে আধিপত্যবাদী কোনো শক্তি দাঁড়াতে পারবে না ফলে জাতীয় যে-কোনো প্রয়োজনে সবাই একসঙ্গে লড়তে পারবে। এদিকে লক্ষ্য রেখে প্রগতিশীল ছাত্র জোটসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সকলেই ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। ছাত্রীদের হলে নানা প্রতিবন্ধকতা, বিশেষ সান্ধ্য আইনের প্রয়োগ শিথিল ও ছাত্রদের হলে গণরুম আর তীব্র আবাসন সংকটের দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন প্রার্থীরা।
মোটামুটি নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রতিটি প্রার্থীর ইশতেহারেই দেখা যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক ও পরিপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে তোলা। একই সঙ্গে ওয়ার্ল্ড র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রম এগিয়ে আনার জন্য প্রত্যাশিত পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কিঞ্চিত্ আশার আলো সঞ্চার করছে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে। বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ইশতেহার পর্যালোচনা করে দেখা যায় দীর্ঘ সময়ের অনিয়মের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য সকলেই একটি সুন্দর সমাধানের মানচিত্র আঁকছেন তাদের কর্মপরিকল্পনায়। একই সঙ্গে এসব প্রতিশ্রুতিকে শুধুমাত্র কথার ফুলঝুড়ি না ভেবে সে অনুযায়ী কাজ করার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করছেন তারা।
শিক্ষার্থীরা যদি অতীতের সবদিক বিবেচনা করে তাদের জন্য যুগোপযোগী শিক্ষার্থীবান্ধব প্রার্থীদের ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারে তবে এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখা কোনো দুঃসাধ্য ব্যাপার নয় বলেই মনে করে সবাই। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি উপযুক্ত ভোটই পারে নানা সমস্যায় জর্জরিত এই ঐতিহাসিক বিদ্যাপীঠকে একটি সুন্দর সমাধানের মানচিত্র উপহার দিতে। একই সঙ্গে তা বাস্তবায়ন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতীত গৌরব ও সম্মান ফিরিয়ে আনতে।
লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
