মানুষের ঢল নেমেছিল নীলফামারীর চিলাহাটি ও ভারতের হলদিবাড়ী সীমান্তে। গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে এপারে বাংলাদেশ ও ওপারে ভারতে বসবাসকারীদের মধ্যে চোখের দেখা আর কথা বলার হাট বসেছিল। দীর্ঘ ৭ কিলোমিটার সীমান্ত জুড়ে আবাল বৃদ্ধ বনিতার আনন্দ-বেদনার অশ্রুধারা এপার-ওপারের আত্মীয়-স্বজনদের চোখে বয়ে যায়। এ সময় ভারতের হলদিবাড়ীর মানুষজনের হাতে হাতে দেখা যায়: পুনরায় হলদিবাড়ী-চিলাহাটি আইসিপি (ইমিগ্রেশন) খুলতে হবে, পুনরায় হলদিবাড়ী-চিলাহাটি রেলপথ চালু করতে হবে লেখা প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন ও ব্যানার। প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ভারতের হলদিবাড়ীর শমসের আলী সরকার বলেন, ২০০৪ সালের ২৬ জুন পর্যন্ত চিলাহাটি-হলদিবাড়ী ইমিগ্রেশন চালু ছিল। এটি পুনরায় চালুর দাবি নিয়ে এখানে দাঁড়িয়েছি। পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদের সাথে দেখা করছি।
এই মিলনমেলা চলে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত। ডোমারের ভোগডাবুড়ি গ্রামের ৮০ বছরের বৃদ্ধ ধনির উদ্দিনের প্রায় ৪০ বছর পর দেখা হয় ভারতের হলদিবাড়ীর প্রধান পাড়ায় বসবাসরত ছোটবোন আম্বিয়ার সাথে। কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁকে দুই ভাইবোনের কান্না আর আহাজারী। বাংলাদেশের ভাই ছোটবোনকে তিনটি ইলিশ মাছ দিতে পেরেছেন। ছোটবোন ভাইকে দিয়েছেন লুঙ্গি।
কুড়ি বছর পর দেখা হলো, কথা হলো। কিন্তু কাঁটাতারের ব্যবধানে এপার বাংলা ওপার বাংলার দুই ভাই আব্দুর কাদের (৬৫) ও সাইদুল ইসলাম (৬০) এর হাত ছোঁয়া হলো না। নানা-নানী-নাতিকে ছুঁয়ে আদর করতে পারলো না। নাতি স্কুল শিক্ষক তাসকিনুল সরকার (৪৫) পারলেন না নানা-নানীর হাত ধরতে। তবে উপহার হিসাবে কাঁটাতারের উপর দিয়ে বিনিময় হলো ইলিশ মাছ, শাড়ি-কাপড়, কমলা, আপেল, বিস্কুট ও চানাচুর। মিলনমেলায় শুধু নীলফামারী জেলার মানুষজন নয়, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর, লালমনিরহাট জেলার মানুষজন নীলফামারীর ডোমার উপজেলার চিলাহাটি ডাঙ্গাপাড়া থেকে পূর্ব সীমান্ত হয়ে দক্ষিণ সীমান্তের গিড়িয়ারডাঙ্গা হিমকুমারী সীমান্ত পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার বিস্তৃত হয়ে পড়েছিল।
বিজিবি ও বিএসএফ সূত্র জানায়, চিলাহাটি ও হলদিবাড়ী সীমান্ত দিয়ে বিলুপ্ত ছিটমহলের ৪৭৮ জন ভারতগমনের প্রেক্ষিতে দুই বাংলায় বসবাসকারীদের আত্মীয়-স্বজনদের দেখা-সাক্ষাত্ করার জন্য এই মিলনমেলার আয়োজন করা হয়। এতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিলেন।
পঞ্চগড় জেলার ভাউলাগঞ্জ গ্রামের বিধবা দিনেশ্বরী রায় (৬৫) জানান, কুড়ি বছর পর দেখা হলো, কথা হলো। কিন্তু কাঁটাতারের ব্যবধানে ওপারে হলদিবাড়ীতে বসবাসরত শিশিকুমার রায়ের দিদি পঞ্চমী রায়ের হাত ছোঁয়া হলো না। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, এপারে দাঁড়িয়ে ওপারে স্বজনদের দেখা আর কথা বলার সুযোগ পেলাম। দীর্ঘ ২০ বছর পর ভাই-বোনের দেখা হলো। তিনি বোনকে দুটি ইলিশ মাছ দিয়েছেন কাঁটাতারের উপর দিয়ে।
স্বজনদের সঙ্গে দেখা করে এসে ডোমার উপজেলার মির্জাগঞ্জ গ্রামের রশিদুল ইসলাম বলেন, এ সময় দুই দেশের মানুষের সেখানে মিলনমেলা ঘটে। দুইদিকে হাজারো মানুষের ভিড়, মাখখানে কাঁটাতারের বেড়া। এরই মাঝে দেখা ও কথা হয় আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে। দীর্ঘদিন পর স্বজনের দেখা পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকে। বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বিজিবি ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বিএসএফ কর্তৃপক্ষ সামান্য ওই সময়ের মিলনমেলার সুযোগ দেয়।