ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলা সীমান্তবর্তী গ্রাম চরভিটা। যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় গ্রামের অসংখ্য শিশু ছিল শিক্ষাবঞ্চিত। এলাকার সচেতন অভিভাবকরা এ নিয়ে ছিলেন দুশ্চিন্তায়। এক পর্যায়ে এলাকাবাসী উদ্যোগ নেন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। অবশেষে ২০০১ সালে বাড়ির পাশে ইরফান আলী নামে একজন নিজের ৪০ শতক জমির ওপর আশপাশের লোকের সাহায্য নিয়ে বাঁশের ঘর দিয়ে তৈরি করেন চরভিটা প্রাথমিক বিদ্যালয়। শুরু হয় বিদ্যালয়ে পাঠদান। ছাত্র-ছাত্রীও পাওয়া যায় ৫০ জন। শুধু তাই নয়, এলাকাবাসীর উদ্যোগে স্কুলটিতে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচিও শুরু করা হয়।
স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইরফান আলী জানান, নিজের অর্থে ২০১৪ সালের পহেলা জুলাই স্কুলে শুরু করেন ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি। কিন্তু কিছুদিন চালানোর পর হিমশিম খেতে শুরু করলেন। তারপর প্রতিবেশীদের নিয়ে আলোচনার পর ঠিক হলো রান্নার সময় এলাকার সব মায়েরা মুষ্টির চাল রাখবেন আর সেটি প্রতি সপ্তাহে দিবেন ‘মিড ডে মিলে’র তহবিলে। তা দিয়েও চালানো কঠিন হয়ে পড়লে স্কুলের পাশে দুটি পুকুর লিজ নিয়ে সেখানে মাছ ও হাঁস চাষ শুরু করা হয়। এভাবে অনেক কষ্টে শিক্ষার্থীদের খাবারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এখন খাবারের জন্য স্কুলে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৩৩ হাজার টাকা খরচ লাগে বলে তিনি জানান।
ইরফান বলেন, দ্বিতীয় শ্রেণির নিচের শিক্ষার্থীদের সকালে এবং তার ওপরের শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দুপুরে খাবার দেয়া হয়। সপ্তাহে তিন দিন দেয়া হয় খিচুড়ি, সঙ্গে একটি করে ডিম। খিচুড়ি তৈরির জন্য দিনে চাল লাগে ২৪ কেজি। সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে এক দিন বাড়ি থেকে জমানো মুষ্টির চাল নিয়ে আসে। সপ্তাহের বাকি তিন দিন দেয়া হয় পাউরুটি, সঙ্গে কলা বা ডিম।
জানা গেছে, কিছুদিন আগে জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস স্কুলে গেলে তার সহায়তায় তৈরি হয় ইটের দেয়াল ঘেরা ৩টি কক্ষ। তবে বসার বেঞ্চ নেই। দরকার আরো শ্রেণিকক্ষ। তাই উপায় না পেয়ে এখনও চলছে স্কুল মাঠে গাছতলায় পাঠদান। বর্তমানে ১৭৬ জন ছাত্র-ছাত্রী শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলে পড়ছে। ৪ জন শিক্ষকের নিরলস চেষ্টায় প্রথম বছর থেকেই শতভাগ পাস করেছে। গত ৩ বছরে ৩টি বৃত্তি পেয়েছে। ২০১৩ সালের ১ জুলাই সরকারিকরণ করা হয় বিদ্যালয়টি। কিন্তু এখনও শিক্ষকরা বেতন পাচ্ছেন না।
বকুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু তাহের বলেন, ‘আমার জানা মতে, রংপুর বিভাগে আর কোনো বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের এমন কর্মসূচি চালু নেই।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু হারেস বললেন, কমিউনিটির (স্থানীয় জনগণ) সক্রিয় অংশ্রহণ নিশ্চিত হলেই যে কোনো কর্মসূচি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
স্থানীয় উদ্যোগে ‘মিড ডে মিল’ কর্মসূচি চালুর কথা শুনে ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস বিদ্যালয়টি পরিদর্শনে যান। এর অবকাঠামো নির্মাণে চার টন চাল বরাদ্দ করেন। ওই অনুদান দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে একটি টিনশেড ঘর। মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘যে উদ্যোগের সঙ্গে জনগণ সম্পৃক্ত থাকে, তা কখনোই ব্যর্থ হয় না। চরভিটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই উদ্যোগকে উদাহরণ হিসেবে সামনে রেখে জেলার সব উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে মিড ডে মিলের কর্মসূচি চালু করতে পরিকল্পনা নিচ্ছি আমরা।’
সম্প্রতি বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান। মন্ত্রী বিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ব্যক্তিগত তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা অনুদান দেয়ার ঘোষণা দেন। দ্রুত বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণেরও আশ্বাস দেন তিনি।
