সমঝোতা। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক। একটি ট্রেন যার পুরো নাম সমঝোতা এক্সপ্রেস। এই সমঝোতা তিনবার বন্ধ হয়েছে। ২০০১ সালে ভারতীয় পার্লামেন্ট ভবনে হামলা, ২০০৭ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো নিহত এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কাশ্মিরে জঙ্গি হামলার পর। ২০০৭ সালে সমঝোতায় একবার হামলা হয়েছিল। বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সমঝোতায় হামলা নয়, জঙ্গি হামলাই সমঝোতাকে আটকে দিয়েছে। বিশেষ করে, কাশ্মির ইস্যুতেই হামলার ঘটনা ঘটে। অথচ কাশ্মির সমস্যা সমাধানে ভারত ও পাকিস্তানের কিংবা আন্তর্জাতিক মহলের কোনো উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা তেমন দেখা যায় না। নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বলছে, কাশ্মির সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত শুধু যুদ্ধ নয়, পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকিও এই অঞ্চলে রয়েই যাবে।
যুদ্ধ এখন বাকযুদ্ধে: ভারত এবং কাশ্মিরের পরিস্থিতি আপাতত শান্ত। যদিও দুই পক্ষই সীমান্তে সৈন্য মোতায়েন অব্যাহত রেখেছে। তবে সীমান্ত যু্দ্ধ এখন দুই দেশের সরকারের মধ্যে বাকযুদ্ধে পরিণত হয়েছে। প্রথমত: ১৪ ফেব্রুয়ারি কাশ্মিরের পুলওয়ামায় জঙ্গি হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয় সৈন্য নিহত হন। পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জয়শ-ই-মোহাম্মদ হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে। ভারত দাবি করে, হামলার সঙ্গে পাকিস্তান জড়িত। কিন্তু পাকিস্তান সেটি অস্বীকার করে। দ্বিতীয়ত, ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারত পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলার দাবি করে। ভারতের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা বিমান হামলায় ব্যাপক হতাহত এবং অবকাঠামো ধ্বংস হওয়ার দাবি করেন। কিন্তু কিছু মিডিয়া সূত্রের বরাত দিয়ে জানায়, হামলায় ৩৫০ জনের বেশি জঙ্গি নিহত এবং অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। এমনকি ক্ষমতাসীন দল বিজেপির সভাপতি অমিত শাহও সম্প্রতি আড়াইশ’র বেশি নিহত হওয়ার দাবি করেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের এক মন্ত্রী জানান, হামলায় হতাহতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এমনকি একটি বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাও এই কথা বলেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিমান হামলার সময় ওই স্থানে ৩০০ মোবাইল সক্রিয় ছিল। ওইসব মোবাইল কী গাছেরা ব্যবহার করেছিল। পাকিস্তানের দাবি, কোনো হতাহত কিংবা ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেনি। ভারতের বিরোধী দলগুলো হতাহতের পক্ষে প্রমাণ চান। এমনকি পুলওয়ামা হামলায় নিহত কয়েকজন সেনাদের পরিবারও হামলার প্রমাণ দাবি করেছেন বলে ভারতীয় মিডিয়া এনডিটিভি জানায়। তারা মনে করছেন, সামনে নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দল বলছে, হামলার প্রমাণ চেয়ে বিরোধীরা পাকিস্তানের হাতকেই শক্তিশালী করছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, আমার প্রমাণ ১৩০ কোটি ভারতীয়।
কাশ্মিরে বহুদিনের সংঘাত, বহুদিনের ক্ষত
g ১৯৪৭: বলা হয় দেশবিভাগের পর পাকিস্তান থেকে আগত উপজাতিক যোদ্ধারা কাশ্মির আক্রমণ করে। তখন কাশ্মিরের মহারাজা ভারতের সাথে সংযোজনের চুক্তি করেন যা থেকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।
g ১৯৪৮: ভারত জাতিসংঘে কাশ্মির প্রসঙ্গ উত্থাপন করলে পর ৪৭ ক্রমিক সংখ্যক প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী গোটা কাশ্মিরে গণভোট অনুষ্ঠিত হবার কথা। কিন্তু প্রস্তাব অনুযায়ী পাকিস্তান কাশ্মির থেকে সৈন্যাপসারণ করতে অস্বীকার করে। অতঃপর কাশ্মিরকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
g ১৯৫১: ভারতীয় কাশ্মিরে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ও ভারতের সঙ্গে সংযোজনকে সমর্থন করা হয়। অতঃপর ভারত বলে, আর গণভোট অনুষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন নেই। জাতিসংঘ ও পাকিস্তানের মতে, গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়া আবশ্যক।
g ১৯৫৩: কাশ্মিরের ‘প্রধানমন্ত্রী’ শেখ আব্দুল্লাহ গণভোটের সমর্থক ছিলেন ও ভারতের সঙ্গে সংযোজনকে বিলম্বিত করার চেষ্টা করেন। ফলে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জম্মু-কাশ্মিরের নতুন সরকার ভারতের সঙ্গে কাশ্মিরের সংযোজনকে পাকা করেন।
g ১৯৫৭: ভারতের সংবিধানে জম্মু-কাশ্মিরকে ভারতের অংশ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
g ১৯৬২-৬৩: ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীন আকসাই চীন দখল করে। তার আগের বছর পাকিস্তান কাশ্মিরের ট্রান্স কারাকোরাম ট্র্যাক্ট এলাকাটি চীনকে প্রদান করে।
g ১৯৬৫: কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ।
g ১৯৭১-৭২: আবার যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয়ের পর সিমলা চুক্তি সম্পাদিত হয় ১৯৭২ সালে। যুদ্ধবিরতি রেখাকে লাইন অফ কন্ট্রোল বা নিয়ন্ত্রণ রেখায় পরিণত করা হয় ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিবাদ সমাধান সম্পর্কে ঐকমত্য অর্জিত হয়।
g ১৯৮৪: ভারত সিয়াচেন হিমবাহ নিজ নিয়ন্ত্রণে আনার পর পাকিস্তান তা একাধিকবার দখল করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু সফল হতে পারেনি।
g ১৯৮৭: জম্মু-কাশ্মিরে বিতর্কিত নির্বাচনের পর রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থাকে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ করে। কিন্তু পাকিস্তান সে দোষারোপ চিরকাল অস্বীকার করে এসেছে।
g ১৯৯০: গওকাদল সেতুর কাছে ভারতীয় সিআরপি রক্ষীবাহিনী কাশ্মিরি বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালালে শতাধিক আন্দোলনকারী নিহত হন। প্রায় সমস্ত হিন্দু কাশ্মির ছেড়ে চলে যান। জম্মু-কাশ্মিরে সেনাবাহিনীকে আফসা বা আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট অনুযায়ী বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়।
g ১৯৯৯: কাশ্মিরে গোটা নব্বই-এর দশক ধরে অশান্তি চলে।
g ১৯৯৯: আবার ভারত-পাকিস্তানের লড়াই হয়, কারগিলে।
g ২০০১-২০০৮: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আলাপ-আলোচনার যাবতীয় প্রচেষ্টা প্রথমে নয়াদিল্লির পার্লামেন্ট ভবন ও পরে মুম্বাই হামলার ফলে ব্যর্থ হয়।
g ২০১০: ভারতীয় সেনার গুলি লেগে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর পর কাশ্মির উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। বিক্ষোভ চলে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে, প্রাণ হারান অন্তত ১০০ জন।
g ২০১৩: পার্লামেন্ট ভবনের উপর হামলার মুখ্য অপরাধী আফজল গুরুকে ফাঁসি দেওয়া হয়। এই বছরই ভারত আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীদ্বয় মিলিত হয়ে উত্তেজনা উপশমের কথা বলেন।
g ২০১৪: ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ উপস্থিত থাকেন। কিন্তু এরপর নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনার কাশ্মিরি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ায় ভারত আলাপ-আলোচনা স্থগিত রাখে।
g ২০১৬: কাশ্মিরের উরিতে হামলায় অনেক ভারতীয় জওয়ান নিহত হন। এরপর ভারত পাকিস্তানে সার্জিক্যাল স্টাইক চালানোর দাবি করেছিল। ওই বছর আজাদ কাশ্মিরভিত্তিক হিজবুল মুজাহিদীনের অধিনায়ক বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর কাশ্মিরে স্বাধীনতা সমর্থকরা আবার রাস্তায় নামেন। এই আন্দোলনে এ পর্যন্ত অন্তত ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে ও বিক্ষোভ অব্যাহত আছে।
তথ্যসূত্র: দ্য ডিপ্লোম্যাট, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট ও ডয়চেভেলে
