সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা পাথুরে সাম্রাজ্য নামে পরিচিত। এই উপজেলার নানা স্থানে ছড়িয়ে আছে পাথর আর পাথর। এলাকাটিতে রয়েছে অসংখ্য পাথর কোয়ারী। দিনভর মানুষ কোয়ারী নিয়ে ব্যস্ত। উপজেলার কৃষি জমি নিয়ে বা অন্যান্য বিষয়াদি নিয়ে যতটা না মাতামাতি তার চেয়ে বেশি মাতামাতি পাথর আহরণও বিক্রয় নিয়ে। বৈধ-অবৈধ ভাবে এখানে পাথর আহরণ ও বিক্রি চলে সারা বছর। এই পাথর নিয়ে রযেছে নানা কথা। পাথরকে কেন্দ্র করে চলছে প্রকৃতি বিনাশী কাণ্ড। মানুষ পাগলপারা পাথর নিয়ে। সৌভাগ্যের পরশ যেন পাথরে। তাই লেখাপড়া বা সুস্থ সমাজ গঠনের প্রক্রিয়া থমকে পড়েছে পাথুরে সাম্রাজ্যে। এর ভিতরে রয়েছে নির্মম কাণ্ড কারখানা। নির্যাতনসহ নানা অত্যাচারে ঘটনা নিরবে চলছে। কোন প্রতিবাদ, প্রতিরোধ নেই।
যারা একটু সচেতন বা অগ্রসর তারা চলে এসেছেন সিলেট নগরীতে। কিন্তু বিশাল একটি অংশ এখানে পড়ে আছে অন্ধকারে। তারা না পাচ্ছে শিক্ষা বা প্রকৃত ধর্মের আলো। প্রতিনিয়ত তারা প্রতারিত ও নির্যাতিত হচ্ছে নানা কায়দায়। ঠিক এমনি এক কাহিনী ধরা পড়েছে ওসমান ‘পাগলা’ নামের কথিত এক ভণ্ড পিরের কাণ্ড কারখানায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি সরলমনা মানুষদের ঠকিয়েই যাচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করার সাহস করেনা। করলে নেমে আসে নির্যাতন অথবা মৃত্যুর হুমকি। এই ‘পীর বাবা’র নির্দেশে এক লাখ টাকা চাঁদা না দেয়ায় পরিবারের আট নরনারীকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে।
ওসমান ‘পাগলা’ গাঁজা খায়। গান গায়। তাবিজ কবজ বিক্রি করে অনেক টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। ওরস শরীফ ও দরবার তৈরির নামে তিনি বড় অংকের টাকা কথিত ভক্তদের কাছ থেকে বিভিন্ন কায়দায় হাতিয়ে নেন।
এলাকাবাসী জানায়, তার আস্তানা কোপানীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ঢালারপাড় গ্রামে। মূল বাড়ি নরসিংদী জেলার রায়পুর থানায়। নিজেকে ‘আধ্যাত্মিক পির’ দাবি করে সাধারণ লোকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। তার কথা না শুনলে ভক্তদের লেলিয়ে পটিয়ে হাসপাতালে পাঠায়। প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেয়। এখানকার সাধারণ মানুষদের কাছে ‘পীর বাবা’ এক আতঙ্কের নাম।
কয়েকদিন আগে চাঁদা না দেয়ায় এই ‘পির বাবা’র নির্দেশে এখানকার কয়েকটি নিরীহ পরিবারেরকে কুপিয়ে জখম করা হয়। এসব ঘটনায় থানায় মামলা করার পরও স্বস্তি মিলছে না জানালেন ভুক্তভোগীরা।
দক্ষিণ ঢালারপাড় গ্রামের বিলাল মিয়া নামের একজনকে ‘পির বাবার’ মুরিদ হতে বলে কয়েকজন ভক্ত। তিনি অস্বীকৃতি জানালে তার কাছে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। অন্যথায় মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। এখানেই শেষ নয়। গত ২২ নভেম্বর রাতে মোস্তফা নগর গ্রামের বিলাল মিয়াকে লোকালয়ে নিয়ে প্রাণনাশের চেষ্টা চালানো হয়। এ সময় তার আর্তচিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে গিয়ে তাকে প্রাণে বাঁচান। এ ঘটনায় পীরের ভক্ত দাবিদার ও মোস্তফানগরের ইয়া ছালামকে (৩৩)প্রধান আসামি করে কোম্পানীগঞ্জ থানায় লিখিত অভিযোগ দেন বিল্লাল। এতে ৩০ নভেম্বর ভোর রাতে বিলালের ছোট ভাই ইসমাইল মিয়া (৩০) ও একই গ্রামের সামছু মিয়াকে (২৫)পিটিয়ে গুরুতর আহত করে ‘পীর বাবা’র লোকজন। চিৎকার শুনে ইসমাইল মিয়ার বৃদ্ধা মা আলেকজান বিবি (৬০) ছুটে গেলে তাকেও লোহার রড দিয়ে আঘাত করে আহত করা হয়। এক পর্যায়ে প্রতিবেশীরা ছুটে গিয়ে তাদের রক্ষা করেন। এরপরও ভক্তদের আক্রোশ থামেনি। ইসমাইল মিয়ার বসতঘরে প্রবেশ করে লুটপাট চালিয়ে পৌনে তিন লাখ টাকার মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে নেয় ওই পিরের মুরিদানরা। এ ঘটনায়ও ইসমাইল মিয়া বাদী হয়ে ‘পীর বাবা’র ভক্ত ও দক্ষিণ ঢালারপাড় গ্রামের শেরে বাংলাকে (৪০) প্রধান আসামি করে কোম্পানিগঞ্জ থানায় মামলা করেন। মামলায় এজাহারনামীয় ২৫ জনকে আসামি করা হয়।
এদিকে চাঁদা না পেয়ে গত ১ ডিসেম্বর আবার শরিয়ত উল্লার পরিবারের চারজনকে পিটিয়ে আহত করে ‘পির বাবা‘র ভক্তরা। আহতরা হলেন, দক্ষিণ ঢালারপাড় গ্রামের শরিয়ত উল্লাহ (২৪), তার পিতা রহিম উদ্দিন (৬০), মাতা নুর জাহান (৫০) ও বোন আছিয়া (১৬)। এ সময় তারা নগদ টাকাসহ লক্ষাধিক টাকার মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় ‘পির বাবা’ ওসমানকে প্রধান আসামি ও তার ভক্ত ৩৫ জনকে এজাহারনামীয় আসামী করে মামলা করেছেন শরিয়ত উল্লাহ।
শরিয়ত উল্লাহ জানান, সরল বিশ্বাসে তিনি প্রতিবছর পির বাবাকে একটি ছাগল, এক বস্তা চাল ও রান্না করার উপকরণ দিয়ে থাকেন। কয়েক বছর দেয়ার পর আর্থিক অভাব-অনটনের কারণে এখন আর দিতে পারেন না। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ভক্তদের মাধ্যমে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ওই ‘পির বাবা’। দাবিকৃত চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে তাকেসহ তার পরিবারের সবাইকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। পরে গত ১ ডিসেম্বর বাড়িতে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের উপর নির্যাতন চালায় পিরের ভক্ত দাবিদার সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় মামলা দিয়েও স্বস্তি মিলছে না বলে জানান শরিয়ত উল্লাহ। সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে তাদের। ভণ্ড পিরের ছোবল থেকে বাঁচতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বায়েছ আলম জানান, ঢালারপাড়ের এ ঘটনায় দুইটি মামলা নথিভুক্ত করা হয়েছে। হানিফ (৩৫) নামের একজন এজাহারভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাকীদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
