নরসিংদীর মনোহরদী কৃষি ব্যাংক শাখার দুর্নীতি নিয়ে ‘ঘুষের টাকা ১০ ভাগ’ শীর্ষক শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকের ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই সুপারিশকে।
ঋণের জন্য ১০ ভাগ ঘুষ দাবির ঘটনা প্রমাণিত হওয়ায় কৃষি ব্যাংক মনোহরদী শাখার প্রাক্তন শাখা ব্যবস্থাপক কার্তিক চন্দ্র সেন ও বর্তমান ব্যবস্থাপক নিজামুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহনের সুপারিশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পক্ষান্তরে বাংলাদেশ ব্যাংক সে সুপারিশ অমান্য করে দুই ব্যবস্থাপককে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয় কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, মনোহরদী উপজেলার চরমান্দালিয়া গ্রামের মনোহরদী এগ্রো ফার্মস’র ব্যবস্থাপনা অংশীদার শাহাদাৎ হোসেন সরকার কৃষি ব্যাংক মনোহরদী শাখায় তার এগ্রো ফার্মের জন্য এক কোটি ৪০ লক্ষ টাকা ঋণ প্রস্তাব পাঠায়। এই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপক কার্তিক চন্দ্র সেন কয়েক দফা মনোহরদী এগ্রো ফার্ম পরিদর্শন করেন। পরির্দশনকালে ও পরে ব্যাবস্থাপনা অংশীদার ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সকল প্রকার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রদানসহ সকল শর্ত পূরণের পরও ব্যবস্থাপক কার্তিক চন্দ্র সেন বিভিন্ন অজুহাতে ঋণ না দিয়ে তাকে হয়রানি করতে থাকে। এক পর্যায়ে ব্যবস্থাপক কার্তিক চন্দ্র সেন এক কোটি ৪০ লাখ টাকার ঋণ প্রস্তাবের বিপরীতে শতকরা ১০ ভাগ হারে মোট ১৪ লক্ষ টাকা ঘুষ দাবি করেন। ঘুষ দাবি প্রসঙ্গে তিনি জানান, উৎকোচের ১৪ লাখ টাকা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে না দিলে ঋণ ছাড় করতে পারবেন না। এ অবস্থায় এগ্রো ফার্মের ব্যবস্থাপক অংশীদার শাহাদাৎ সরকার তাকে দুই লাখ টাকা ঘুষ প্রদান করেন। বাকী টাকা ঋণ প্রদান করার পরে দিবে বলে জানান। এ অবস্থায় হঠাৎ কার্তিক চন্দ্র সেন অন্যত্র বদলি হয়ে যান। তার স্থলাভিষিক্ত হন নিজামুল ইসলাম নামে আরেকজন ব্যবস্থাপক। শাহাদাৎ হোসেন নতুন ব্যবস্থাপক নিজামুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, পূর্বের দেয়া কাগজপত্র দিয়ে তিনি ঋণ দিতে পারবেন না। তাকে নগদ ১৪ লক্ষ টাকা দিলে তিনি ঋণ দিবেন। শাহাদাৎ হোসেন সরকার দাবিকৃত টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এক বছর ১০ মাস হয়রারির পর ঘুষ ছাড়া ঋণ দিতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন ওই ব্যাংক কর্মকর্তা।
শাহাদাৎ হোসেন সরকার কৃষি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘুষ দাবির বিচার ও ঋণ না পেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে সাংবাদিকদের বিষয়টি জানালে সরেজমিনে তদন্ত করে এ প্রতিনিধি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন যা দৈনিক ইত্তেফাকের ২০১৪ সালের ৪ ডিসেম্বর প্রকাশ হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের যুগ্ম-পরিচালক মো. শাহজাহান ও উপ-পরিচালক মো. ওমর ফারুকের সমন্বয়ে একটি দল ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে কৃষি ব্যাংক মনোহরদী শাখায় গিয়ে সরেজমিনে তদন্ত করেন। এতে এলাকার লোকজন প্রত্যক্ষভাবে ঘুষ দাবির কথা জানিয়ে সাক্ষ্য প্রদান করেন।
মনোহরদী এগ্রো ফার্ম’র ব্যবস্থাপনা অংশীদার শাহাদাৎ হোসেন ও ভুক্তভোগী অনেকের সাক্ষ্য প্রমাণে অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দল ২০১৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর দাখিলকৃত এক তদন্ত প্রতিবেদনে প্রাক্তন ব্যবস্থাপক কার্তিক চন্দ্র সেন ও বর্তমান ব্যবস্থাপক নিজামুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করেন। কিন্তু কৃষি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এই তদন্ত প্রতিবেদনের কোনো তোয়াক্কা না করে দোষীদের শাস্তির পরিবর্তে পুরস্কৃত করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ না করে তাদেরকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
