কবি

বহিরঙ্গে নাগরিক, অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৯, ১৯:২২

 

বাহ্যত রফিক আজাদের কাব্যবিশ্ব দু’ভাগে বিভক্ত। তাঁর কবিতার একটি পঙিক্ত ধার করে বলা যায়, বহিরঙ্গে তা ‘নাগরিক’ এবং ‘অন্তরঙ্গে অতৃপ্ত কৃষক’। ‘নাগরিক’ বিশ্বটি নির্মিত হয়েছে মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক সূত্র অনুযায়ী—‘গ্রহণে-বর্জনে’। আর, এক্ষেত্রে ঐতিহ্যের অবদান কত ব্যাপক প্রথম কাব্যগ্রন্থের নামকরণেই তা সুস্পষ্ট  হয়ে উঠেছে। আরো একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তা হলো, তাঁর কাব্য আঙ্গিকে তত্সম শব্দের ব্যাপক ও স্বচ্ছন্দ ব্যবহার। এটিও ষাটের দশকের সচেতন রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াজাত। তখন সরকারি উদ্যোগে আরবি-ফারসি শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহারের মাধ্যমে ‘মুসলমানি বাংলা’ প্রচলনের যে অপচেষ্টা চলছিল, এটা ছিল তারই শৈল্পিক প্রতিবাদ। দ্বিতীয় অর্থাত্ ‘কৃষক’ বিশ্বটি কবির একান্ত নিজের। অতীতের সবটা জুড়েই ‘অতৃপ্ত’ অথচ ‘বিশাল’ এই কৃষকের বসবাস। ফেলে আসা গ্রাম, শান্তি-ছায়াঘন প্রকৃতি, পরিশ্রমী জীবন, লাঙলের ফলপ্রসূ ফলা, উর্বর শস্যভূমি, সমূহ সারল্য ও সচ্ছল গৃহস্থ জীবনের উজ্জ্বল স্মৃতিতে সমৃদ্ধ এই কৃষক বিশ্ব। দীর্ঘ জটিল নাগরিক পথ-পরিক্রমা সত্ত্বেও, এই স্মৃতি কবিসত্তায় কতোটা জীবন্ত এবং ফেলে আসা সেই জীবনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ কতোটা গভীর—তা তাঁর কবি-কর্মের অগণিত পঙিক্ত, শব্দ ও চিত্রকল্পে ভাস্বর হয়ে আছে। নিচের উদ্ধৃতি এ প্রসঙ্গে লক্ষণীয়:

পিছনে ফেলে আসি :

কুয়োর মতো গভীর দু’চোখ অশ্রুভেজা : মা;

অনাবাদী জমির মতো ধু-ধু-দৃষ্টি : বাবা;

প্রবীণ লাঙল, বৃদ্ধ বলদ, জরাজীর্ণ বাড়ি;

কয়েকটি খুব ক্ষুধার্ত মুখ, তোবড়ানো গাল,

                                 ক্লিষ্ট হাসি—

পিছনে ফেলে আসি।

[পিছনে ফেলে আসি/‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’]

....

রফিক আজাদের আর একটি পরিচয় তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধের সৈনিক’। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের ভয়াবহ বাস্তবতা—  বেঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড, সামরিক বর্বরতা, স্বাধীনতার পরাজিত শক্তির উত্থান ও আস্ফাালন, সর্বোপরি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় একটি বড় অংশ জুড়ে আছে তাঁর কবিকর্মের। এ সময়কার সমাজমানসের শৈল্পিক দলিল হয়ে উঠেছে ‘চলে যাবো সুতোর ওপার’, ‘এ কেমন কাল এলো’, ‘নত হও, কুর্ণিশ করো’, ‘চাদরবিষয়ক দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব’, ‘লাল গোলাপের দিকে বাড়ানো হাতের সংখ্যা’, ‘নেবে স্বাধীনতা’, ‘জতুগৃহ’, ‘হাতুড়ির নীচে জীবন’, ‘গদ্যের অরণ্য হারিয়ে যাওয়া আমি এক দিগভ্রান্ত পথিক’, ‘পরিকীর্ণ পানশালা আমার স্বদেশ’, ‘যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ’ এবং ‘গোলাপ, তোমাকে ঘিরে’ ইত্যাদি কবিতা। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না হয়েও, এসব কবিতায় তিনি যেভাবে মধ্যবিত্তের শ্রেণিচরিত্র, সাম্রাজ্যবাদী শোষণের রূপ, সর্বোপরি বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলির অনৈক্য ও সংগ্রামের স্তরকে চিত্রিত করেছেন তা রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কিংবা সমাজবিজ্ঞানীর মনেও বিস্ময় জাগাবে।

রফিক আজাদ উচুকণ্ঠের কবি নন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠস্বরে আছে এক আশ্চর্য দৃঢ়তা। তিনি যা বলেন, পরিপূর্ণ আস্থার সঙ্গেই বলেন। এতে জড়তা নেই, নেই বাহুল্য কিংবা উচ্ছ্বাস। আশ্চর্য সংযমী ও পরিশীলিত রুচির এই কবি দুই দশকের তুমুল আর্থ-সামাজিক অস্থিরতায় বিস্ময়কর রকম সাড়া দিয়েও, সবকিছু থেকে প্রশংসনীয় নৈপুণ্যের সঙ্গে আড়াল করে রাখতে পারেন নিজেকে, নিজের কবিকর্মকে। এই নির্মোহ, নৈর্ব্যক্তিক, শিল্পমনস্কতাই রফিক আজাদকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য এবং আমাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কবির বিশেষত্ব।    (অংশবিশেষ)

লেখকের ‘কবি ও কবিতার সংগ্রাম’ (আগামী প্রকাশনী, ২০১৩) বই থেকে