নির্বাচনে ৭২ শতাংশ মেয়র প্রার্থী ব্যবসায়ী

আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৫, ১৯:২২
 
আসন্ন পৌরসভা নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। এ ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিদের প্রভাব আর আচরণবিধি লংঘন বড় অন্তরায় বলে মনে করছে সংস্থাটি। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উত্সবমুখর পরিবেশে আয়োজনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সুজনের নেতৃবৃন্দ।
 
শুক্রবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনী মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত ‘আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের তথ্য প্রকাশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এ আহ্বান জানান। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সুজন নির্বাহী সদস্য ড. হামিদা হোসেন, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং সুজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার প্রমুখ। রাজনীতি ব্যবসায়ীদের কব্জায় চলে যাচ্ছে উল্লেখ করে সুজন জানিয়েছে, আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের ৭২ শতাংশ ব্যবসায়ী।
 
লিখিত বক্তব্যে প্রার্থীদের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে এ প্রথমবারের মতো কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন দলভিত্তিক এবং দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাই দেশবাসীর বিশেষ দৃষ্টি রয়েছে এ নির্বাচনকে ঘিরে। তবে নির্বাচনটি কেমন হবে, তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। ইতোমধ্যেই ঘটে যাওয়া কিছু কিছু ঘটনা এ সন্দেহ ও সংশয়কে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।’
 
সংশয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘পর্যাপ্ত জনবল থাকা সত্ত্বেও কেন নির্বাচন কমিশন থেকে ২৩৪টি পৌরসভার মধ্যে ১৭৫টিতে জনপ্রশাসন থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হলো, তা বোধগম্য নয়। সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে, তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করা থেকে বিরত রাখার এবং মনোনয়নপত্র ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। একটি পৌরসভায় একটি দলের পক্ষ থেকে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিল হলে সবকটি মনোনয়নপত্র বাতিলের বিধান থাকলেও তিনটি পৌরসভায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে একাধিক প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও সব মনোনয়নপত্র বাতিল না করে, একজন করে প্রার্থীকে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণরুপে নির্বাচনী আইনের পরিপন্থী। ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আচরণবিধি লঙ্ঘন করতে দেখা গেছে। কিন্তু কমিশন এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়নি।’
 
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি ক্রমান্বয়ে ব্যবসায়িদের কব্জায় চলে যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা নির্বাচনে অংশ নিন, এ অধিকার তাদের অবশ্যই রয়েছে। আমাদেরও কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সব প্রার্থীই যদি ব্যবসায়ী হন, তাহলে জনগণের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয় গুরুত্ব পাবে না।’
 
তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে আচরণবিধি লংঘনের অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। শুধু বলছে, অভিযোগ পেলে খতিয়ে দেখা হবে। আমরা মনে করি, কমিশন এর মাধ্যমে তার দায়িত্ব এড়াতে চাইছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কমিশনের যে অগাধ ক্ষমতা রয়েছে তা প্রয়োগ করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন সুজন সম্পাদক।
 
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষন সংক্রান্ত সুজনের প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, পৌরসভা নির্বাচনে ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৬৫২ জনই ব্যবসায়ী, যা শতকরা হিসাবে ৭২.১২। এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ২২১ জনের মধ্যে ১৬৫ (৭৪.৬৬%), বিএনপি ২০৬ জনের মধ্যে ১৬২ (৭৮.৬৪%) এবং অন্যান্য রাজতৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৪৭৭ জনের মধ্যে ৩১৫ জন (৬৮.১৩) মেয়র প্রার্থী ব্যবসায়ী। প্রতিবেদনে বলা হয়, মোট ৯০৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ২২৪ জন স্কুলের পাঠ শেষ করতে পারেননি। এইচএসসি (উচ্চ মাধ্যমিক) শেষ করেছেন ১৯৮ জন, স্নাতক ২১৫ এবং স্নাতকোত্তর ১২৬ জন। বাকি ১৮ জনের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হলফনামায় উল্লেখ নেই।
 
ঋণ গ্রহীতা
৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ঋণ গ্রহীতার ১৬.১৫ শতাংশ অর্থ্যাত্ ১৪৬ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৪৮ জন (২২.৭৪%), বিএনপির ৪২ (২০.৩৮%) এবং অন্যান্য রাজতৈতিক দল ও স্বতন্ত্র ৫৫৬ (১১.৭৪%) জন। মোট ১৪৬ জন ঋণ গ্রহীতার মধ্যে কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে ১৮ জন (১২.৩২%)। যার মধ্যে আওয়ামী লীগের ৫ জন, বিএনপির ৭ জন এবং অন্যান্য রাজতৈতিক দল ও স্বতন্ত্রের ৬ জন।
 
করদাতা
গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রার্থীদের অধিকাংশ করদাতা। সকল দলের মধ্যে করতাদার হার কাছকাছি। ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে কর প্রদানকারী ৭২৯ জন (৮০.৬৪%)। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৮১ জন, বিএনপির ১৬৯ জন এবং স্বতন্ত্র ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ৩৭৯ জন।
 
বাত্সরিক আয়
বাত্সরিক অধিক আয়কারী প্রার্থীর সংখ্যা আওয়ামী লীগে বেশি, স্বল্প আয়কারী প্রার্থীর সংখ্যা বিএনপি সামান্য এগিয়ে। ৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৮ জনের বাত্সরিক আয় (০.৮৮%) কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৫ জন, বিএনপিতে ২ জন এবং অন্যান্য দলে একজন রয়েছেন। ২ লাখের কম টাকা বাত্সরিক আয় করে এ রকম প্রার্থীর সংখ্যা ১৭৪ জন (১৯.২৪%)।
 
সম্পদের বিবরণ
৯০৪ জন মেয়র প্রার্থীর মধ্যে ৪৭ জন (৫.১৯%) কোটিপতি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ২০ জন, বিএনপির ১৩ জন এবং অন্যান্য ১৪ জন। তবে মোট প্রার্থীর মধ্যে ২৩ জনের সম্পদের বিবরণ দেয়া নেই তাদের হলফনামায়।
 
মামলা
আওয়ামী লীগের তুলনায় বিএনপির প্রার্থীদের মামলা বেশি। বর্তমানে মোট ৯০৪ জন প্রার্থীর মধ্যে ২১৯ (২৪.২২%) জনের বিরুদ্ধে ৬৭৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৩৩, বিএনপির ৯৬ এবং অন্যান্য ৯০ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এছাড়া বর্তমানে হত্যা মামলা রয়েছে ৩৬ জনের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের ৭ জন, বিএনপির ১৫ জন এবং অন্যান্য দলের ১৪ জন।
নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের আধিক্য স্থানীয় পর্যায়ে কর্তৃত্ব বাড়াবে উল্লেখ করে সুজন সম্পাদক বলেন, হলফনামার তথ্য নিয়ে এবার যথেচ্ছাচার হয়েছে। যে যা পেরেছে তথ্য দিয়েছে। যেন কেউ নেই, এগুলো খতিয়ে দেখার। প্রার্থীর মধ্যে ব্যবসায়ীর অনুপাত কম দেখা যায়, কিন্তু যাঁরা নির্বাচিত হবেন, দেখা যাবে তাদের ৮০ শতাংশই ছাড়িয়ে যাবে।