প্রথমবারের মতো আজ বুধবার স্থানীয় সরকারের অন্যতম প্রতিষ্ঠান পৌরসভায় মেয়র পদে দলীয়ভাবে, দলীয় প্রতীকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আজ ভোট হবে ২৩৪টি পৌরসভায়। মেয়র নির্বাচনের পাশাপাশি নির্দলীয়ভাবে এসব পৌরসভায় একই সঙ্গে নির্বাচন হবে কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে। সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত একটানা ভোটগ্রহণ চলবে।
৭০ লাখ ৯৯ হাজার ১৪৪ জন ভোটার এসব পৌরসভায় ৩ হাজার ১৫৮ জন প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। যদিও এরই মধ্যে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৯৪ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৪০ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন।
গত ২০ দিনের প্রচার-প্রচারণা চলাকালে বেশ কয়েকটি এলাকায় নানা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় ভোট ঘিরে উত্সাহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি শঙ্কাও বিরাজ করছে ভোটারদের মধ্যে। মোট ৩ হাজার ৫৫৫টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ হাজার ১৮৪টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে এমন ২০টি এবং জঙ্গি হামলার আশঙ্কা রয়েছে রাজশাহী-রংপুর বিভাগের এমন ৭০টি পৌরসভায় বিশেষ নজর রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে এ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বিদেশি কোনো পর্যবেক্ষক সংস্থা থাকছে না। ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভোট গ্রহণকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে কমিশন। এ নির্বাচনের মেয়র, সাধারণ ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদের ২ কোটি ১০ লাখের বেশি ব্যালট পেপার, ভোট দেয়ার সিলসহ নির্বাচন সামগ্রী পৌঁছে গেছে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে। নির্বাচনে ২০টি রাজনৈতিক দলের ৬৬০ জনসহ ৯৪৫ জন মেয়র প্রার্থী অংশ নিচ্ছেন। ২২টি পৌরসভায় আওয়ামী ও বিএনপি সরাসরি ভোট যুদ্ধ মাঠে থাকছেন। বিভিন্ন দলের ১৫ জন নারী মেয়র প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন।
দলভিত্তিক নির্বাচন হওয়ায় এবারকার পৌরসভা নির্বাচন একেবারেই ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রায় সাত বছর পর পরস্পরের বিরুদ্ধে ভোট যুদ্ধে থাকায় দুই দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চ্যালেঞ্জের মনোভাব কাজ করছে। নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক থাকায় এই নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসাবেও দেখা হচ্ছে। তবে দল দুটি বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে বিপাকে রয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে মোট প্রার্থী ৯৪৫ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ২৩৪ জন। কম করে হলেও অর্ধ শতাধিক পৌরসভায় আওয়ামী লীগের রয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থী। দল থেকে বহিষ্কারের পরও তাদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে আনা যায়নি। অনেক এমপি বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থন করছেন। একই দশা রয়েছে বিএনপিতেও। ২২৩টি পৌরসভায় মেয়র পদে দলের প্রার্থী থাকলেও বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে ২০ থেকে ২৫টি পৌরসভায়। বিদ্রোহীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে লড়ছেন।
এদিকে ইসির পক্ষ থেকে বহিরাগতদের নির্বাচনী এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হলেও সেটা শতভাগ কার্যকর হয়নি। অনেক পৌরসভায় বহিরাগতরা অনেকটা নিরাপদেই বিচরণ করছেন। গত সোমবার থেকে এক সপ্তাহ পর্যন্ত অস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের সব ধরনের অস্ত্র বহন ও প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকলেও তা মানা হয়নি।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ২৯ ডিসেম্বর রাত ১২টা (দিবাগত মধ্যরাত) থেকে ৩০ ডিসেম্বর রাত ১২টা পর্যন্ত যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। পৌরসভায় বেবি ট্যাক্সি, ট্যাক্সি ক্যাব, মাইক্রোবাস, জিপ, পিকআপ, কার, বাস, ট্রাক ও টেম্পোতে এ নিষেধাজ্ঞা থাকছে। এছাড়া নির্বাচনী এলাকায় গত ২৭ ডিসেম্বর রাত ১২টা থেকে ৩১ ডিসেম্বর ভোর ৬টা পর্যন্ত মোটরসাইকেল চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নির্বাচনের মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ৪১২ জন এসআই, এএসআই ও কনস্টেবলের বদলি ও পদোন্নতির ফাইল অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে ১০টি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে চাঁদপুরের কচুয়া, চট্টগ্রামের রাউজান ও নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহারের অনুমতি চাওয়া হলেও তাতে সায় দেয়নি ইসি।
২২ পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া অন্য দলের প্রার্থী নেই
আজ যে ২৩৪ পৌরসভায় নির্বাচন হচ্ছে তার চারটিতে আওয়ামী লীগের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে বিএনপির কোন প্রার্থী নেই। পৌরসভা চারটি হচ্ছে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল, মাদারীপুরের কালকিনি ও শিবচর এবং চট্টগ্রামের চন্দনাইশ। আর ২২টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ছাড়া অন্য কোনো দলের প্রার্থী এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থীও নেই। পৌরসভাগুলো হচ্ছে-বগুড়ার সান্তাহার, রাজশাহীর কাকনহাট ও ভবানীগঞ্জ, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, পাবনার ঈশ্বরদী, যশোরের কেশবপুর, ভোলার দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিন, পিরোজপুরের স্বরূপকাঠী, টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ, ময়মনসিংহের গাফরগাঁও, নেত্রকোনার কেন্দুয়া ও দুর্গাপুর, কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর, শরীয়তপুরের ডামুড্যা, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও মাধবপুুর, ফেনীর দাগনভূঞা এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী, বারইয়ারহাট ও সন্দ্বীপ।
মেয়র পদে ১৫ জন নারী
মেয়র পদে মোট ১৫ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন। এদের মধ্যে সাত জন আওয়ামী লীগের, চার জন ন্যাশনাল পিপলস পার্টির, তিন জন স্বতন্ত্র এবং একজন বিএনপির।
নিরাপত্তা বলয়ে পৌরভোট
নির্বাচনের নিরাপত্তায় ৪৫ হাজার পুলিশ, বিজিবির ৯ হাজার ৪১৫ জন, র্যাবের ৮ হাজার ৪২৪ জন, কোস্টগার্ডের ২২৫ জন, অঙ্গীভূত আনসারের ৪৯ হাজার ৭২৮ জন এবং ব্যাটালিয়ন আনসারের ৪ হাজার ৫১২ জন সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিটি কেন্দ্রে ৮ জন অস্ত্রধারীসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ২০ জন সদস্য মোতায়েন থাকবে। আর সাধারণ কেন্দ্রে ৭ জন অস্ত্রধারীসহ ১৯ জন সদস্য থাকবেন। প্রতিটি পৌরসভায় গত সোমবার সকাল থেকে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির মোবাইল টিম টহল শুরু করেছে। পৌর নির্বাচনী এলাকাগুলোয় মোট ২৪৮ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন রয়েছে। এছাড়াও আরো ৩১ প্লাটুন বিজিবি রিজার্ভ ফোর্স হিসাবে রাখা হয়েছে। উপকূলীয় ছয়টি পৌরসভা মুলাদী, মেহেন্দীগঞ্জ, পাথরঘাটা, রামগতি, সন্দ্বীপ ও হাতিয়ায় কোস্টগার্ড নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে।
মাঠে থাকবে ভ্রাম্যমাণ আদালত
পৌর নির্বাচনে মাঠে থাকবে এক হাজার ২০৩ জন ম্যাজিস্ট্রেট। এরমধ্যে ৯৬৮ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ২৩৫ জন।
থাকছে না বিদেশি পর্যবেক্ষক
এবারের নির্বাচনে কোনো বিদেশি পর্যবেক্ষক থাকছে না। গত উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনের নির্বাচন বিভিন্ন দূতাবাস ও দাতা সংস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করলেও এবার তারা পর্যবেক্ষণ করার আবেদন করেনি। তবে দেশীয় ২৯টি সংস্থার ৪ হাজার ৮৯ জনের জন্য পর্যবেক্ষণের আবেদন করেছে। ইসি কার্যালয় থেকে সাতটি সংস্থা ১৩০টি পর্যবেক্ষক কার্ড সংগ্রহ করেছে। বিদেশি সংস্থার মধ্যে শুধু এশিয়া ফাউন্ডেশন আবেদন করলেও তা যথাযথ না হওয়ায় গ্রহণ করেনি ইসি।
ভোটার, ভোটকেন্দ্র ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা
এ নির্বাচনে ২৩৪ জন রিটার্নিং কর্মকর্তাসহ তিন শতাধিক সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া ৬৬ হাজার ৭৬৮ জন ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করবেন। প্রতি কেন্দ্রে একজন করে তিন হাজার ৫৫৫ জন প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, প্রতি বুথে একজন করে ২১ হাজার ৭১ জন সহকারী প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এবং প্রতি বুথে দু’জন করে ৪২ হাজার ১৪২ জন পোলিং কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ নির্বাচনে তিন হাজার ৫৫৫টি ভোটকেন্দ্র ও ২১০৭১টি ভোটকক্ষে ভোট হবে। ২৩৪ পৌরসভায় মোট ভোটার ৭০ লাখ ৯৯ হাজার ১৪৪ জন। এরমধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ২৮৪ জন এবং নারী ভোটার ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬০ জন।
প্রার্থী ১২ হাজার ১৭১ জন
কমিশনের তথ্য মতে, ২৩৪ পৌরসভায় ১২ হাজার ১৭১ জন প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে মেয়র পদে ৯৪৫ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৮ হাজার ৭৪৬ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ২ হাজার ৪৮০ জন প্রার্থী হয়েছেন। ২৩৪টি পৌরসভায় ২৩৪টি মেয়র, ৭৩১টি সংরক্ষিত কাউন্সিলর ও ২ হাজার ১৯৩টি সাধারণ কাউন্সিলর পদ রয়েছে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ২০ রাজনৈতিক দল
প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ২০টি দলের মধ্যে আওয়ামী লীগের ২৩৪ জন, বিএনপি ২২৩ জন, জাতীয় পার্টি-জাপা ৭৪ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি ৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদের ২১ জন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির ১৭ জন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ৫৭ জন, ওয়ার্কার্স পার্টির ৮ জন, কমিউনিস্ট পার্টির ৪ জন, খেলাফত মজলিসের ৪ জন, ইসলামী ফ্রন্টের ৩ জন এবং লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি), তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ, ইসলামী ঐক্যজোট, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও খেলাফত মজলিসের একজন করে প্রার্থী রয়েছেন। ভোটের আগেই ৭টি পৌরসভায় মেয়র পদে আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। পৌরসভাগুলো হচ্ছে পিরোজপুর, মাদারগঞ্জ, টুঙ্গীপাড়া, ফেনী, পরশুরাম, চাটখিল ও ছেংগারচর। নির্বাচনে ২৮৫ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন।
