পৌর নির্বাচনের শুরুতেই সকাল থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত নানা অভিযোগ নিয়ে দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত ছিলেন আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতারা। দফায় দফায় চারজন নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করলেও সাক্ষাৎ দেননি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)।
পৌরভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ বলেন, ভোট নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। তবে আরও ভাল হলে আরও খুশি হতাম। দু’একটি জায়গায় হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
দিনের শুরুতেই কমিশনে হাজির হয় বিএনপির বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। তারা নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ ছাড়া অন্য কোনো কমিশনারকে না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তাদের দলীয় অবস্থান তারা শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকবেন। এসময় তার সঙ্গে ছিলেন চেয়ারপার্সনের আরেক উপদেষ্টা ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন।
এরপর বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে কমিশনে আসে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল। এসময় এইচটি ইমামের সঙ্গে কয়েক মিনিট কথা হয় বিএনপি নেতা ড. রিপনের। এইচটি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে নির্বাচন কমিশনার বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলীর কক্ষে বৈঠক করেন। এসময়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ও মোহাম্মদ আবু হাফিজ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন বিএনপির প্রতিনিধি দল। পরে বিএনপির প্রতিনিধি দলের সদস্যরা নির্বাচন কমিশনার জাবেদ আলীর কক্ষে তিনজন নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজের সঙ্গে বৈঠক করেন। সাক্ষাত শেষে এইচটি ইমাম সাংবাদিকদের বলেন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বাড়াবাড়িতে দু’চার জায়গায় বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে হয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এই উপদেষ্টা বলেন, নোয়াখালীর চৌমুহনী, বরগুনার পাথারঘাটা, গাইবান্ধার বেশ কিছু জায়গা, পাবনার চাটমোহরসহ কয়েকটি এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও প্রার্থীদের সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাড়াবাড়ি পর্যায়ের আচরণ করেছে। বিএনপি-জামায়াত অধ্যুষিত এসব জায়গায় তাদের কর্মীরা আমাদের প্রার্থীদের বের করে দিচ্ছে। কিন্তু পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। কারও ব্যর্থতায় নয়, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের বাড়াবাড়ির কারণে।
কেন্দ্র দখলের বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে এইচটি ইমাম বলেন, তাদের অভিযোগ কাল্পনিক। বিএনপি নেতারা ইসিতে এসে অনেক কাল্পনিক অভিযোগ করেছে। আমরা ভালোভাবে খোঁজ খবর করে বস্তুনিষ্ঠ খবর নিয়ে কমিশনারদের জানিয়েছি। পরাজয় ‘নিশ্চিত জেনে বিএনপির অনেক প্রার্থী ‘গায়েব’ হয়ে যাচ্ছেন। তাদের এটা নতুন কিছু নয়। বিএনপি গায়েব হওয়ার গালগল্প বলে যাচ্ছে। নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য শুনেছি অনেক টাকা খরচ করে লাঠিয়াল বাহিনী ভাড়া করে ভোটারদের বাধা দেয়া হচ্ছে। এভাবে নির্বাচনকে বানচাল করে সরকারকে বিব্রবতকর অবস্থায় ফেলার চেষ্টা করছে তারা।
কয়েক দফায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিবের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় বিএনপি নেতা ড. ওসমান ফারুক নির্বাচন কমিশনে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারলে বিএনপির প্রার্থীরা বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে। কিন্তু প্রশাসনের লোকজন নির্বাচনে নিরপেক্ষ আচরণ করছে না। তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করছে। তিনি বলেন, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করবে না। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থেকে জনগণের রায় নিবে। কারণ বিএনপি নির্বাচনকে বিতর্কিত করতে আসেনি। আওয়ামী লীগ পৌর নির্বাচনের ৫ জানুয়ারির চেয়ে উচ্চমাত্রায় কারচুপি করেছে বলেও অভিযোগ করেন ওসমান ফারুক।
এর আগে বেলা দেড়টার দিকে জাতীয় পার্টির নেতা প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইদুর রহমান টেপার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে আসে। তারা ২৫টি পৌরসভার ১৭৬টি কেন্দ্র থেকে তাদের দলীয় প্রার্থীর এজেন্টদের মারধর করে বের করে দেয়া অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা দেন। প্রতিনিধি দলে ছিলেন, দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া ও বিরোধী দলীয় নেতার সচিব ফখরুল ইমাম।
এরপর দুপুর ২টায় বিএনপির চেয়ারপার্সনের আরেক উপদেষ্টা খন্দকার মাহবুব হোসেনের নেতৃত্বে বিএনপির আরেকটি প্রতিনিধি দল আসে কমিশনে। তারা নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক ও মোহাম্মদ আবু হাফিজের সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকাল সাড়ে চারটায় এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় তারা হতাশ। কারণ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর কমিশনের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো না। তাদের এক প্রকার অসহায় মনে হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন এই বিএনপি নেতা। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আশ্বাস দিলেও তারা তা রক্ষা করতে পারেনি। নির্বাচনে শতাধিক কেন্দ্র দখল হয়ে গেছে। সকাল থেকে একাধিক পৌরসভায় বিএনপির প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও তার কাছে আওয়ামী লীগের কোনো প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো তথ্য নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি। খন্দকার মাহবুব বলেন, বিএনপি কেন্দ্রীয়ভাবে পৌর নির্বাচন বর্জনে পক্ষপাতী নয়।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের মত সরকারও তারে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। বিএনপি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে তাদের অতীতের কথা ভুলে পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি ছিলো এ নির্বাচন অবাধ-সুষ্ঠু হবে। কিন্তু এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথ আরও বাধাগ্রস্ত হলো। রাত ৮টা পর্যন্ত আওয়ামী লীগ-বিএনপির প্রতিনিধি দল কমিশনে উপস্থিত ছিলেন।
