নবজাতকের লিভার প্রদাহ

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০১৬, ০২:০৫
 
বিভিন্ন ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও প্রোটোজোয়া দিয়ে নবজাতকের শরীরে ইনফেকশন হতে পারে। উক্ত ইনফেকশনের অংশ হিসেবে নবজাতকের লিভার প্রদাহ হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট জীবাণু মায়ের শরীর থেকে নবজাতকের রক্তে প্রবেশ করে জন্ডিস দেখা দেয়। শিশুর জন্মের সাত দিন থেকে এবং লিভার প্রদাহের পাশাপাশি অন্যান্য অঙ্গও আক্রান্ত হয়।
 
যে সকল ভাইরাস দিয়ে নবজাতকের প্রদাহ হতে পারে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: রুবেলা, হার্পিস সিমপ্লেক্স, সাইটোমেগালো ভাইরাস, এইচ,আই,ভি ভাইরাস এবং হেপটাইটিস ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাস। সাইটোমেগালো ভাইরাস, হার্পিস সিমপ্লেক্স ও রুবেলা নবজাতকের লিভার প্রদাহ করে বিভিন্ন মাত্রায় জন্ডিস করতে পারে। সাইটোমেগালো ভাইরাসজনিত প্রদাহের রোগীদের একটি বড় অংশ লক্ষণহীন থাকে এবং একটি অংশের জন্ডিস হয় ও লিভার বড় হয়ে যায়। এদের আরোগ্যসম্ভাবনা ভাল। তবে ৩০% রোগীর সিরোসিস হয়ে লিভার ট্রান্সপ্ল্যানটেশন করা লাগতে পারে। হার্পিসজনিত প্রদাহে শীরাপথে গ্যানসাইক্লোভির ওষুধ প্রয়োগে চিকিত্সা করতে হয়। রুবেলাজনিত লিভার প্রদাহ একা একাই ভালো হয়ে যায়। 
 
এইচআইভি ভাইরাস নবজাতক পর্যায় পেরিয়ে ৬ মাসের শিশুর লিভার প্রদাহ করে। তা এন্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধ দিয়ে চিকিত্সা করতে হয়। হেপাটাইটিস ‘এ’, ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস সাধারণত নবজাতকে লিভার প্রদাহ ও জন্ডিস করে না। কিন্তু ‘বি’ এবং ‘সি’ ভাইরাস দীর্ঘমেয়াদী লিভারে প্রদাহ করে এবং পরবর্তীতে লিভার সিরোসিসের কারণ হতে পারে।  
 
ব্যাকটেরিয়াজনিত প্রদাহের মধ্যে অন্যতম প্রধান হল, সিফিলিস ইনফেকশন। যা চিকিত্সা করতে হয় পেনিসিলিন দিয়ে।  টক্সোপ্লাজমা নামক প্রোটোজোয়া দিয়েও নবজাতকের লিভার প্রদাহ হতে পারে। চিকিত্সা করা হয় স্পাইরামাইসিন দিয়ে। 
 
উপরের আলোচনার মাধ্যমে আমরা জেনেছি যে, ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত লিভার প্রদাহের ক্ষেত্রে রোগভেদে বিভিন্ন এন্টিবায়োটিক ও এন্টিভাইরাল ওষুধ প্রয়োগ করে চিকিত্সা করা হয়। চিকিত্সার জন্য দ্রুত রোগ নির্ণয় করা জরুরী। সুতরাং নবজাতকের জন্ডিস দেখা দিলে তাকে দ্রুত চিকিত্সকের শরণাপন্ন করতে হবে। তবে- রোগ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম- এই মূলনীতি থেকে লক্ষ্য রাখতে হবে, যেন মায়ের এ রোগগুলো না হয় অথবা মায়ের রোগ হয়ে থাকলে চিকিত্সার আগে যেন সন্তান না নেয়া হয় অথবা গর্ভকালীন অবস্থায় ইনফেকশন হলে যথাযথ সময়ে যেন মায়ের চিকিত্সা করা হয়।
 
বিশেষ করে,  মায়ের শরীরে যদি হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস সুপ্তাবস্থায় থাকে অথবা মা যদি হেপাটাইটিস ‘বি’ জনিত দীর্ঘমেয়াদী লিভার প্রদাহের জন্য চিকিত্সা গ্রহণ করতে থাকে এমতাবস্থায় গর্ভে সন্তান এলে অবশ্যই লিভার বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে চিকিত্সা নিতে হবে। সন্তান জন্মের সময় ইমিউনোগ্লোবিউলিন প্রয়োগ করে নবজাতকের দেহে হেপাটাইটিস ‘বি’ প্রবেশের আশংকা কমিয়ে আনা যায়।
 
নবজাতকের বংশগত লিভার রোগ
 
নবজাতকের অনেক ধরণের বংশগত লিভার রোগ (হেরেডিটরী লিভার ডিজিজ) হতে পারে। এই রোগগুলো বিভিন্ন জিনগত ত্রুটির কারণে বংশগতভাবে বাবা বা মা থেকে সন্তানে সঞ্চার হয়। যে সকল হেরেডিটরী লিভার রোগের কারণে কনজুগেটেড বিলিরুবিনেমিয়া হয় তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল: আলফাওয়ান এনটাইট্রিপসিন ডেফিসিয়েন্সি, ফ্যামিলিয়াল ইনট্রাহেপাটিক কোলেস্ট্যাসিস ও বিলিয়ারী এট্রেসিয়া।  জিনগত ত্রুটির কারণে লিভার কোষ ও পিত্তনালীর বিভিন্ন অংশের অসম্পূর্ণতা দেখা দেয়ায় শিশুর লিভার প্রক্রিয়াজাত বিলিরুবিনসহ পিত্তরসকে ঠিকমত ক্ষুদ্রান্ত্রে নিঃসরণ করতে পারে না। এ কারণে রক্তে প্রক্রিয়াজাত (কনজুগেটেড) বিলিরুবিন বেড়ে যায়। ফলে জন্ডিস, প্রস্রাবের হলুদ রং, মলের ফ্যাকাশে রং ও ক্ষুধামন্দা জাতীয় লক্ষণ প্রকাশ পায়। আমরা জানি, পিত্তনালী নিঃসৃত বাইল সল্ট চর্বি জাতীয় খাবার হজমে সাহায্য করে। উপরোক্ত রোগগুলোতে পিত্তরসের নিঃসরণ বাধাগ্রস্থ হওয়ায় চর্বি হজম বাধাগ্রস্থ হয় এবং ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে-এর ঘাটতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়াও, রোগভেদে অন্যান্য আনুসংগিক লক্ষণও দেখা দেয়।
 
আলফা ওয়ান এনটাইট্রিপসিন ডেফিসিয়েন্সির চিকিত্সা করার জন্য পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করতে হয়; ভিটামিন এ, ডি, ই এবং কে ওষুধ হিসেবে দেয়া হয় এবং এন্টিহিস্টামিন ও আরসো-ডি-অক্সি কোলিক এসিড ওষুধ সেবন করতে হয়। ফ্যামিলিয়াল ইনট্রাহেপাটিক কোলেস্ট্যাসিস রোগে পারশিয়াল বিলিয়ারী ডাইভার্সন সার্জারী করে চিকিত্সা করা যায়, তবে কোন কোন রোগীর শিশুকালেই লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার প্রয়োজন পড়ে। বিলিয়ারী অ্যাট্রেসিয়ার ক্ষেত্রে পিত্তনালী অকেজো থাকে বিধায় পিত্তনালীর অকেজো অংশ ফেলে দিয়ে লিভারের উন্মুক্ত অংশের
 
সঙ্গে ক্ষুদ্রান্ত্র যোগ করে দেয়ার জন্য
 
এক ধরনের সার্জারী করা হয় যাকে ‘কাসাই পোর্টোএন্টারোস্টোমি’ বলে। যুক্তরাজ্যে উক্ত অপারেশনের সাফল্যের হার ৫৭%। (শেষ)
 
 
 
লেখক:পরিচালক
 
দি লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
 
বাড়ী নং-৬৪, রোড নং-৮/এ
 
ধানমন্ডি, ঢাকা