বিদ্যুৎ, জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, উত্তরবঙ্গের বহুল প্রত্যাশিত জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লা খনি এলাকার প্রাপ্ত গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কল-কারখানায় ব্যবহার করা হবে। জামালগঞ্জ কয়লা খনি প্রকল্পটি পরিত্যক্ত ঘোষণার দীর্ঘদিন পর মিথেন পাওয়ার খবরে এলাকার মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।
জ্বালানী ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ মঙ্গলবার কোল বেড মিথেন ষ্টাডি প্রকল্পের গভীর কূপ খনন কাজের উদ্বোধন করেন। এ সময় প্রতিমন্ত্রী বলেন, আবাসিক ভাবে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। গ্যাস জাতীয় সম্পদ। যত্রতত্র ব্যবহার না করে এর সুষ্ঠু ব্যবহারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন প্রতিমন্ত্রী। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এ্যাডভোকেট সামছুল আলম দুদু এমপি, পেট্রোবংলার চেয়ারম্যান ইসতিয়াক আহমেদ, জেলা পরিষদের প্রশাসক এস এম সোলাইমান আলী ও প্রকল্পের বৈদেশিক পরামর্শক সুধাংশু অধিকারী বক্তব্য রাখেন।
ফিজিবিলিটি ষ্টাডি ফর দি এক্সটেনশন অব কোল বেড মিথেন (সিবিএম) এ্যাট জামালগঞ্জ কোল ফিল্ড প্রকল্পের আওতায় এই কূপ খনন কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২৩ কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। পেট্রোবাংলার নিজস্ব অর্থায়নে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
জামালগঞ্জ কয়লা খনি এলাকার তিনটি (বড় মাঝিপাড়া, বিলাশবাড়ী ও জামালগঞ্জ) স্থানে গভীর কূপ খনন করা হবে। প্রতিটি ১১০০ মিটার করে। খনন কাজের মাধ্যমে কয়লার নমুনা সংগ্রহ, কয়লা স্তরে গ্যাসের উপস্থিতি এবং পরিমান নির্ণয় করা সম্ভব হবে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে ৬৫০ থেকে ১১০০ মিটার গভীরতায় এই মিথেন রয়েছে এবং ঘনত্ব হচ্ছে ৪০ থেকে ৬০ মিটার।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, কয়লাখনিতে প্রাকৃতিকভাবেই মিথেন গ্যাস জমা হয়ে থাকে। কূপ খনন করে সেই গ্যাস তোলার পদ্ধতি হচ্ছে সিবিএম। কানাডা, ইন্দোনেশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও ভারত সহ অনেক দেশই সিবিএম পদ্ধতিতে মিথেন গ্যাস উত্তোলন করে থাকে। দেশের পরিবেশবাদীরাও আগে থেকেই সিবিএম প্রকল্প গ্রহনের কথা বলেছেন। সরকার এই প্রথম সিবিএম প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
জামালগঞ্জ কয়লাখনিতে মিথেনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য ভারতের মাইনিং অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে ২১ জুন একটি চুক্তি সই করে পেট্রোবাংলা। ২২ জুলাই থেকে প্রতিষ্ঠানটি কাজ শুরু করে। পেট্রোবাংলার প্রকল্প পরিচালক মো: আখতারুজ্জামান বলেন খনিতে গ্যাসের পরিমান ও খনির অভ্যন্তরে গ্যাস চলাচলের ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে তিনটি কূপ খনন করা হবে। কয়লা ও গ্যাস খনিমূখেই পরীক্ষার জন্য পরীক্ষাগার স্থাপন করা হয়েছে।
১৯৬২ সালে খনিটির সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৬২-৬৬ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ ও তৎকালিন খনিজ সম্পদ বিভাগ যৌথ ভাবে জামালগঞ্জে জরিপ চালায়। এ সময় ৭টি গ্যাসের স্তর আবিষ্কার করা হয় এবং এগুলো ৬৭০ মিটার থেকে ১১৬৬ মিটার পর্যন্ত মাটির গভীরে রয়েছে বলে জানা যায়।
সরকারি ভাবে এখানে ৬ একর জমি অধিগ্রহন করে জরুরী ভাবে মেহমান খানা, কোয়ার্টার গুদামঘরসহ কয়েকটি বিল্ডিং নির্মাণ করা হয়। কর্মকর্তারা কাজও শুরু করেন কিন্তু ১৯৮১ সালে কর্মকর্তারা হঠাৎ করে ঐ স্থান ত্যাগ করে চলে যান।
জিওলজিক্যাল সার্ভে রিপোর্ট সূত্রে জানা যায়, জামালগঞ্জ কয়লা খনির ১ হাজার ১৬৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কমপক্ষে ১৪০০ মিলিয়ন টন উন্নতমানের বিটুমিন্যাক কয়লার মজুদ রয়েছে। দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জামালগঞ্জ কয়লা খনি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ৪০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রাসহ ৮০ কোটি টাকার প্রকল্প ব্যয় বরাদ্দ করা হলেও প্রকল্পটি আলোর মূখ দেখেনি।
জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লার খনি থেকে কয়লা উত্তোলনে ব্যয় বেশি হওয়ার কারন দেখিয়ে এটি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তবে পেট্র্রোবাংলার মতে এখানে আছে প্রচুর পরিমানে কোল বেড মিথেন রয়েছে। কয়লার বিভিন্ন স্তরে থাকা এই মিথেন গ্যাস উত্তোলনের পর সম্বব হবে কয়লা উত্তোলন করা। এতে উত্তোলন ব্যয় কমে যাবে কয়েকগুণ।
স্থানীয়রা বলছেন কয়লা উত্তোলন করা হলে স্থানীয়ভাবে যেমন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে তেমনি জালানী সমস্যার সমাধান হবে। তাই বর্তমান সরকারের আমলে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন ও প্রথমে গ্যাস উত্তোলনের লক্ষ্যে ২০১৪ সালের ১২, ১৩ ও ১৪ জুন দরপত্রও আহবান করা হয়। এতে অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা, চীন, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ অংশগ্রহণ করে।
