ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আমজাদহাটে বোনকে বিয়ে না দেওয়ায় নবম শ্রেনীর এক স্কুল ছাত্রীকে (১৫) তুলে নিয়ে ছাগলনাইয়ায় ২০ দিন আটকে রেখে ধর্ষণ, লাঠিপেটাসহ নানা নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। মুক্তিপণ দিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়েছে ১০ দিন আগে। কিন্তু শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে সে। তবে অপহরণের ২০ দিন এবং উদ্ধার হওয়ার পর গত ১০ দিনেও ফুলগাজী থানা পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
অভিযোগ রয়েছে, অপহরণের বিষয়টি বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটির পরিবার সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দিয়েছিল। কিন্তু পুলিশ তা মামলা হিসেবে নেয়নি। এমনকি তদন্তও করেনি। পরিবারের অভিযোগ, তারা দরিদ্র বলেই পুলিশ অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি।
পুলিশ ও স্বজনরা জানায়, নির্যাতিত স্কুল ছাত্রীর বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার আমজাদহাট ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামে। সে ওই এলাকার জাফর ইমাম উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত ১৪ ডিসেম্বর অষ্টম শ্রেনির পরীক্ষা শেষে বাড়িতে ফেরার পথে তিন যুবক তার গতি রোধ করে সড়কের ওপর থেকে একটি মাইক্রোবাসে তাকে তুলে নেয়। এরপর রাসায়নিক মিশ্রিত রুমাল তার নাকে চেপে ধরে অজ্ঞান করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। ২০ দিন ধরে তাকে নির্যাতনের পর ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ আদায় করে তারা ফেনীর মহিপালে মেয়েটিকে রেখে যায়। পরে স্বজনরা মেয়েটিকে উদ্ধার করে ফেনী ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে।
উদ্ধারের পর ১০ দিন হলো তাকে ফেনী ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের ১নং ওয়ার্ডে ২২ নং বেডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি। একদিকে নির্যাতনে শারীরিক কষ্ট, অন্যদিকে মানসিক যন্ত্রণা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না অসহায় মেয়েটি।
মঙ্গলবার দুপুরে ফেনী ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওই ছাত্রী জানায়, তাকে ছাগলনাইয়া সদরে নাসরিন নামের এক নারীর বাসার একটি অন্ধকার কক্ষে দুই হাত বেঁধে মেঝেতে ফেলে রাখা হয়েছিল। অপহরণকারী বাশার, তার শ্যালক ছোট্ট মিয়া ও নাসরিনের স্বামী নুর আলম এবং কয়েজকন যুবক সময় সময় তাকে ধর্ষণ করে এবং কথায় কথায় লাঠিপেটাসহ বিভিন্নভাবে মারধর ও নির্যাতন করে। বাসার মালিক নাসরিন একটি বেসরকারি হাসপাতালে কাজ করে। তুচ্ছ কারণে তারা তাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে। এসব বিষয়ে জানতে গেলে তার কথা বলতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল।
ওই ছাত্রীর বড় বোন রুবিনা আক্তার জানান, তাদের আরেক বোন আছে। তার জন্য ফুলগাজীর ফেনা পুষ্করিনী গ্রামের আবুল বাশার তার শ্যালক ছোট্ট মিয়ার জন্য বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু রাজি না থাকায় ক্ষিপ্ত হয়ে বাশার ও ছোট্ট মিয়া তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে এ ঘটনা ঘটায়।
উল্লেখ্য, ছাগলনাইয়া সদরের ওই বাসার মালিক নাসরিন ও আবুল বাশার সম্পর্কে দেবর-ভাবি ছিল। পরে বাশারের বড় ভাই মারা যাওয়ায় বিয়ে হয় ছাগলনাইয়া সদরের নুর আলমের সঙ্গে। অন্য পরিবারে বিয়ে হয়ে গেলেও এক সময়ের ভাবি নাসরিনের সঙ্গে বাশারের যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। বাশার চোরাচালান ও নারী পাচারের সঙ্গে জড়িত বলেও স্কুল ছাত্রীর স্বজনরা জানায়।
জানা গেছে, মেয়েটি উদ্ধার হওয়ার দুই দিন পর গত ৪ জানুয়ারি ফুলগাজী থানায় মেয়ের মা সালমা বেগম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় ফেনা পুষ্করিনীর জমিদার মিয়ার ছেলে আবুল বাশার (৪৫), ছাগলনাইয়ার পশ্চিম দেবপুরের মৃত. ছেরু মিয়ার ছেলে ছোট্ট মিয়া (২৬), আবুল বাশারের স্ত্রী হাসিনা আক্তারকে আসামি করা হলেও পুলিশ এখনো কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি।
ফুলগাজী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মাইন উদ্দিন জানান, আসামিদের ধরতে ফুলগাজী ছাড়াও ছাগলনাইয়া ও পরশুরাম এলাকায় পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু এখনো তাদেও গ্রেফতার করা যায়নি। তবে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। আসামিরা 'ঘন ঘন অবস্থান পরিবর্তন করছে'। তাই তাদের আটক করতে সময় লাগছে। তিনি বলেন, ভিকটিমের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
ফেনী ২৫০ শয্যা জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ছারওয়ার জাহান জানান, নির্যাতনের শিকার ছাত্রীটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও নিবিড় সেবা দেওয়া হচ্ছে। ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদনও দু-এক দিনের মধ্যে পাওয়া যাবে বলে তিনি জানান।
