ঠাকুরগাঁও শহরের চায়ের টেবিল থেকে পাড়া-মহল্লা, অলিগলির রাস্তার মোড়ে পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পরাজয়ের কারণ সম্পর্কে আলোচনা চলছে। আওয়ামী লীগের এ পরাজয়ের জন্য দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে দায়ী করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী তাহমিনা আক্তার মোল্লাকে ছয় হাজার পাঁচ শ ৬৯ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির দলীয় প্রার্থী মির্জা ফয়সাল আমিন।
আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এ আসনটি হারাতে হয়েছে বলে সাধারণ মানুষ মনে করছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেন বাবু বলেছেন, ‘এবারকার ঠাকুরগাঁও পৌরসভার নির্বাচনী ফল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আওয়ামী লীগের মত দলের জন্য এ নির্বাচনই শেষ কথা নয়। রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে এ সমস্যা কাটিয়ে অদূর ভবিষ্যতে তার দল সুশৃঙ্খল অবস্থানে ফিরে আসবে বলে তিনি মনে করেন।
সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর থেকে এখানে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয় নেতা-কর্মীরা। দীর্ঘ নয় বছর পর সম্মেলনে সভাপতি হন ঠাকুরগাঁও-২ আসনের সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম। এরপর থেকে দবিরুল ও রমেশ গ্রুপে বিভক্ত হয় জেলা আওয়ামী লীগ। পৌর নির্বাচনে দলীয় ত্যাগী নেতাদের মনোনয়ন না দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জেলা যুব মহিলা লীগের আহ্বায়ক তাহমিনা আক্তারকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সোলায়মান আলী সরকার শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেন। তাই জেলা আওয়ামী লীগের একাংশ গোপনে বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন দেয়। যে কারণে নির্বাচনে পরাজয়ের কথা জেনে ৩০ ডিসেম্বর দলীয় প্রার্থী তাহমিনা আক্তার মোল্লার লোকজন ভোটকেন্দ্রে হামলা, ব্যালট বাক্স ভাঙচুর, ব্যালট পেপার ছিনতাই ও অবৈধভাবে সিল মারে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, গোবিন্দনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি মহিলা কলেজ (পুরুষ) কেন্দ্রে। ওই দিন রাতে ফলাফল ঘোষণার সময় তাহমিনা আক্তার মোল্লার লোকজন জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে ডিসি মূকেশ চন্দ্র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহম্মদ সাদেক কুরাইশীকে লাঞ্ছিত করে। পরে ওই তিনটি কেন্দ্রে ফলাফল স্থগিত করা হয়।
জেলা আওয়ামী লীগের পছন্দের প্রার্থী না হওয়ায় ঠাকুরগাঁও-১ আসনের এমপি রমেশ চন্দ্র সেন দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দেয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে রমেশ অনুসারীদের তাহমিনা আক্তার মোল্লার প্রচারণার সময় তেমন কোনো ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়নি।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক জেলা আওয়ামী লীগের এক প্রবীণ নেতা জানান, শেখ হাসিনা দলীয় প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু জেলা আওয়ামী লীগে ওই প্রার্থীর কোনো ভূমিকা ছিল না এতদিন। ওই প্রার্থী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরোধিতা করেছেন। আর এ কারণেই পৌর নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পরাজয় হয়েছে।
পৌর আওয়ামী লীগের সমর্থক আবুল কাশেম বলেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম দলের ত্যাগী কোনো নেতাকে সমর্থন দেয়া হলে আওয়ামী লীগ কখনো ঠাকুরগাঁও পৌরসভায় পরাজিত হত না।’
জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মুহম্মদ সাদেক কুরাইশী জানান, দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় প্রার্থীর প্রচারণা চালিয়েছি। জনগণ পছন্দ মত পৌর মেয়র নির্বাচিত করেছে। সেখানে দলের কোনো ব্যর্থতা নেই।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী তাহমিনা আক্তার মোল্লা জানান, প্রধানমন্ত্রী নিজে আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। কিন্তু দলের বিদ্রোহী প্রার্থী ও কতিপয় নেতার কারণে পরাজিত হয়েছি।
উল্লেখ্য, ঠাকুরগাঁও ১২ নং ওয়ার্ডের খানকাহ শরীফ এলাকা আওয়ামী লীগের ঘাটি নামে পরিচিত। এই ওয়ার্ডে প্রায় তিন হাজার ভোটার রয়েছে। বিগত আমলে সেখান থেকে প্রায় দুই হাজার আট শ ভোট নৌকায় প্রদান করে ভোটাররা। কিন্তু পৌর নির্বাচনে এবার নৌকায় ভোট পায় মাত্র ১৮৮ টি। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী তাহমিনা আক্তার মোল্লা ওই এলাকার এক প্রভাবশালী পরিবারের ব্যক্তিগত কাজে হস্তক্ষেপের কারণে এলাকায় কেউ নৌকায় সমর্থন দেয়নি। তাই আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কারণ।
