দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটিতে হইবে

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৯, ২১:৪৯

ট্রেনে কাটা পড়িয়া প্রাণহানির ঘটনা ঘটিতেছে প্রায়শ। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত ছাপাও হইতেছে সেইসব মর্মান্তিক খবর। প্রকাশিত হইতেছে সম্পাদকীয়-উপসম্পাদকীয় নিবন্ধও। কিন্তু তাহাতে সংশ্লিষ্ট কোনো পক্ষের টনক নড়িতেছে বলিয়া তো মনে হইতেছে না। রেলপথ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ হইতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বত্সরে সারাদেশের রেললাইনে অকালে ঝরিয়া পড়িয়াছে ৪৬১৪টি মূল্যবান জীবন। শুধু তাহাই নহে, দিন দিন বাড়িতেছে মৃতের এই সংখ্যা। ২০১৫ ও ২০১৬ সালে যেখানে মৃতের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৮২১ ও ৯৭১ জন, সেখানে ২০১৭ সালে তাহা এক হাজার ছাড়াইয়া গিয়াছে। ২০১৮ সালের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া না গেলেও জানুয়ারি হইতে মার্চ পর্যন্ত প্রথম তিনমাসেই এই সংখ্যা ছিল ২১৩ জন। রেলপথ পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে, রেললাইনে মৃত্যুর বেশিরভাগই অসাবধানতাজনিত। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, নিয়ম-শৃঙ্খলা মানিয়া চলিবার ব্যাপারে আমাদের উদাসীনতা কতটা মর্মান্তিক প্রতিনিয়ত তাহার অজস্র উদাহরণ ছড়াইয়া রহিয়াছে দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলিতে। এমনকী নিজের জীবনের প্রতি স্বাভাবিক যে মমত্ববোধ থাকিবার কথা— তাহারও নিদারুণ অভাব লক্ষ করা যায় অনেক ক্ষেত্রে। মজ্জাগত এই বেপরোয়া মানসিকতার সহিত নূতন এক বিপজ্জনক মাত্রা যুক্ত করিয়াছে মোবাইল ফোন। রেলপথ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক জানাইয়াছেন যে, মোবাইল ফোনে কথা বলা বা কানে হেডফোন লাগাইয়া গান শুনিতে থাকা অবস্থায় অনেকেই দুর্ঘটনার শিকার হইতেছেন। উদ্বেগের বিষয় হইল, এই হার ক্রমবর্ধমান।

সরেজমিন অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে ট্রেনে কাটা পড়িয়া মৃত্যুর সাতটি কারণ চিহ্নিত করিয়াছে রেলপথ পুলিশ। তন্মধ্যে ৮০ ভাগ মৃত্যুই অসতর্কতাজনিত। সমস্যা আরও আছে। তবে অসতর্কতার লাগাম টানিয়া ধরা গেলে সিংহভাগ মৃত্যুই যে রোধ করা সম্ভব তাহা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। লক্ষণীয় যে রেললাইনে মৃত্যুর একটি বড় অংশই ঘটে ঢাকা রেলপথ থানা এলাকায়। ঢাকার কমলাপুর হইতে বঙ্গবন্ধু সেতু এবং ঢাকা হইতে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন লইয়া এই থানা গঠিত। ২০১৮ সালে এই থানাভুক্ত রেললাইনে ২৮২ জনের মৃত্যু হইয়াছে। এর মধ্যে আবার তেজগাঁও হইতে বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশে মৃত্যুর হার সবচাইতে বেশি। অতএব, প্রথম কাজটি হইতে পারে এই ধরনের অত্যধিক ঝুঁকিপূর্ণ রেলপথগুলি চিহ্নিত করিয়া সেইসকল স্থানে অত্যাবশ্যক নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম জোরদার করা। অবৈধ রেলক্রসিং, রেললাইন-সংলগ্ন বাজার ও দোকানপাট হয় উচ্ছেদ করিতে হইবে, অথবা সেখানে সার্বক্ষণিক সতর্কতামূলক প্রহরা বসাইতে হইবে। পাশাপাশি, খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়ী সমাধান। গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হকও সেই কথাই বলিয়াছেন। তাহার মতে, শহর এলাকায় রেললাইন মাটির নিচে নয়ত উপরে (উড়াল সড়কের মতো) স্থাপনের কথা ভাবিতে হইবে। আরেকটি কার্যকর পথ হইল, রেল করিডোরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা। ইহার জন্য রেললাইনের দুইপাশে দেওয়াল বা কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া যাইতে পারে। তবে সবকয়টি সমাধানই সময় ও ব্যয়সাশ্রয়ী। যদিও স্থায়ী ও কার্যকর সুফল পাইতে হইলে এই ধরনের প্রকৌশলগত ব্যবস্থার বিকল্প নাই, তবু আপাতত মানুষকে সচেতন করার উপরই অধিক জোর দেওয়া ছাড়া গত্যন্তর কী!