নারায়নগঞ্জের দুই শিশুসহ পাঁচ হত্যাকান্ডের ঘটনায় খুনীরা পুর্ব পরিচিত ছিল বলে তদন্তকারী কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন। এ ঘটনায় গতকাল মামলা হয়েছে, আসামি অজ্ঞাত। হত্যার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘নারী ঘটিত ও আর্থিক লেনদেন’। পুলিশ নিহত তাসলিমার স্বামীর ভাগ্নে মাহফুজসহ ৫ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে।
এ দিকে ময়না তদন্তকারী চিকিত্সক জানিয়েছেন, পাঁচ জনের কারোরই গলা কাটা হয়নি বরং মাথায় আঘাতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আটককৃতদের কাছ থেকে গুরুত্বপুর্ন তথ্য পাওয়া গেছে। ২/৩ দিনের মধ্যে ঘটনার রহস্য উদঘাটন ও খুনিদের গ্রেফতার করা সম্ভব হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, নারী ঘটিত কারণেই এ হত্যাকান্ড সংগঠিত হয়েছে ।
সংশ্লিষ্ট ফ্ল্যাটটি সিলগালা করে দিয়েছে পুলিশ। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছাড়া আর কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি।শনিবার রাতে নারায়ণগঞ্জ শহরের ২নং বাবুরাইল খানকা মোড় এলাকার একটি ফ্ল্যাটবাসায় একই পরিবারের পাঁচজনকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। নিহতরা হলো- গৃহবধূ তাসলিমা (৩৫), তার ছেলে শান্ত (১০) ও মেয়ে সুমাইয়া (৫), ছোট ভাই মোরশেদুল (২২) ও তাসলিমার জা লামিয়া (২৫)।
নারায়নগঞ্জের পুলিশ সুপার ড. মহিদ উদ্দিন বলেন, প্রাথমিতভাবে মনে হচ্ছে পারিবারিক বিরোধের কারণেই হত্যাকান্ড ঘটতে পারে। কারণ বাইরে থেকে ঘরের দরজার তালা মারা ছিল এবং হত্যাকান্ডের সময় প্রতিবেশী বা অন্য কেউ কোনও শব্দ পায়নি। এই অবস্থায় ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা পূর্বপরিচিত। নিহতদের মাথায় আঘাতের চিহ্ন ও ধারাল অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যার করার আলামত পাওয়া গেছে।
পুলিশের তদন্তে দুই বিষয়:তদন্তে দুটি ( আর্থিক ও নারী ঘটিত) বিষয়কে প্রধান্য দেয়া হচ্ছে জানিয়ে নারায়ণগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার ফোরকান আহমেদ বলেন, মোরশেদুলের সঙ্গে কারও আর্থিক লেনদেন থাকতে পারে। অন্যটি হল সেখানে ধর্ষণের কোনো ঘটনা ঘটেছে কিনা, বা খাবারে বিষ দেওয়া হয়েছে কিনা। কারণ ঘটনাস্থলে ধস্তাধস্তির কোনো আলামত নেই, প্রতিবেশীরাও কোনো চেঁচামেচি শোনেনি। সম্ভবত খাবারে চেতনানাশক কিছু মিশিয়ে সবাইকে অচেতন করে হত্যা করা হয়েছে।
আটককৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ও বিভিন্ন তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের সন্দেহ, মাহফুজের সঙ্গে নিহত লামিয়ার কোনো সম্পর্ক ছিল। মাহফুজের দ্বারা উত্যক্ত হওয়ার কথা শরীফকে একবার লামিয়া জানিয়েছিল বলেও আমরা জেনেছি। তদন্তে সবকিছুই বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে তিনি জানান।
মামলায় উল্লেখ করা হয়, নিহত তাসলিমার এবং তার স্বামীর অনেক আত্মীয় স্বজন নারায়নগঞ্জে রয়েছেন। এ কারণেই তারা এক মাসে আগে নারায়নগঞ্জে বাসা ভাড়া নেয়। বেশ কিছুদিন আগে থেকে ছোট মামী লামিয়ার দিকে চোখ পড়ে মাহফুজের। গত ১৫ দিন আগে বাসায় এসে মামী লামিয়াকে ধর্ষনের চেস্টা করে মাহফুজ ওরফে মারুফ। ওই ঘটনায় বড় মামী (নিহত তাসলিমা) তাকে জুতাপেটা করে বাসা থেকে তাড়িয়ে দেয়। এ ঘটনার রেশ ধরেই এ হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে বলে পুলিশ ধারনা করছে।
সন্দেহে পরিচিতরা:গতকাল রবিবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন র?্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ , পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এস এম মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান ও র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান । এসময় ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি বলেন, বাড়ির যে ফ্ল্যাটে হত্যাকান্ড ঘটেছে সেখান থেকে রান্না করা খাবার, খাবারের পাত্র ও প্যাকেট জব্দ করা হয়েছে। সেগুলো রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। এতে বিষ বা চেতনানাশক আছে কি না, তা পরীক্ষা করে দেখা হবে।
তিনি বলেন, পরীক্ষায় যদি বিষ বা চেতনানাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায় এবং হত্যাকারীদের হাতের ছাপ উদ্ধার করা যায়, তাহলে তদন্তে বেশ খানিকটা অগ্রগতি হবে। র্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, পাঁচজনকে হত্যার ঘটনাটি পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থার পাশাপাশি র্যাবও তদন্ত করছে। আমরা আশা করছি দ্রুততম সময়ের মধ্যে যারা জড়িত, তাদের গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করতে পারব।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, দুই শিশুকে খুন করা হয়েছে তারা যাতে এ ঘটনার সাক্ষী না হতে পারে। বিশেষ করে একটি বাড়িতে পাঁচজনকে খুন করা- আমাদের জন্য এটি একটি মারাত্মক ঘটনা। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। বিষয়টি পারিবারিক বা বিভিন্ন কারণেও ঘটে থাকতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, সব বিষয় মাথায় রেখেই তদন্ত চলছে।
খুনিরা পেশাদার ছিল না:আলামত সহকারী সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার এহসান উদ্দিন চৌধুরী বলেন, খুনিরা পেশাদার নয়। ধারালো অস্ত্র দিয়ে মাথায় আঘাতের পর তাদেরকে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। তাদেরকে আগে অচেতন করে এ হত্যাকান্ড ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। আমাদের ফরেনসিক টিম সব আলামত সংগ্রহ করেছে। সেগুলো পরীক্ষার পর কখন, কিভাবে হত্যা করা হয়েছে- তা নিশ্চিত করে বলা যাবে।
মামলা দায়ের:নিহত তাসলিমা বেগমের স্বামী শফিকুল ইসলাম অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনকে আসামি করেছেন বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় ওসি আবদুল মালেক। তিনি বলেন, ঘটনার পর শফিকুলের হদিস না পাওয়া গেলেও পরে পুলিশ জানতে পারে, স্বজনদের হত্যার খবরে অসুস্থ হয়ে তিনি ঢাকার একটি হাসপাতালে চিকিত্সা নিচ্ছিলেন। সেখান থেকে গতকাল ভোরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় নেওয়া হয়। সকাল পৌনে ১১টার দিকে শফিকুল বাদি হয়ে একটি হত্যা মামলা করেন। এজাহারে আর্থিক লেনদেন ও নারী ঘটিত বিষয় উল্লেখ করে তিনজনকে সন্দেহ করা হয়েছে। পুলিশ তাসলিমার স্বামী শফিকুল, লামিয়ার স্বামী শরীফ মিয়া, তাদের ভাগ্নে মাহফুজ এবং নিহত মোরশেদের খালাতো ভাই শাহাজাদাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে । তবে এদের মধ্যে মাহফুজ ও শাহাজাদাকে আটক রাখা হয়েছে।
রক্তক্ষরণেই মৃত্যু:জানা গেছে, পাঁচ জনের কারোই গলাকাটা হয়নি। বরং মাথায় আঘাতের কারণে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাদের মৃত্যু হয়েছে। এমনটাই জানিয়েছেন হত্যাকান্ডের তদন্তে গঠিত তিন সদস্য বিশিষ্ট ময়নাতদন্ত কমিটির প্রধান ও নারায়ণগঞ্জ ১০০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের আরএমও ডা. আসাদুজ্জামান। ডা. আসাদুজ্জামান জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে একদিন আগে তাদের মৃত্যু হয়েছে। তবে প্রাথমিক অবস্থায় কোনো ধরনের চেতনানাশক প্রয়োগের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। তবে তাদের গলায় ও শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। তাদের শরীরে হত্যাকারীদের হাতের ছাপ পাওয়া গেছে।
ঋণের টাকার বিরোধ:মামলার বাদি শফিকুল ইসলাম বলেন, তিনি ঢাকায় নিউজিল্যান্ড ডেইরী ফার্মের প্রধান কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার গাড়িচালক। তিনি ঢাকার কলাবাগানে দীর্ঘ ১৮ বছর বসবাস করেছেন। তিনিও স্বীকার করেন, তার স্ত্রী তাসলিমা একই এলাকার নাজমা এবং শাহজানের কাছ থেকে সুদে ১০/১২ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। অন্যদের কাছে ওই টাকা আবার চড়া সুদে ঋণ হিসেবে দিতেন। কিন্তু তাসলিমা যাদের ঋণ দিয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে আসল টাকা বা সুদ আদায় করতে পারেননি। এ কারণেই নাজমা ও শাহজাহান তাকে প্রায়ই হুমকি দিতেন। এ কারণে হত্যাকান্ড ঘটে থাকতে পারে বলে তিনি পুলিশ এবং সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। তিনি বলেন, তার ছেলে শান্ত স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেনীতে পড়ালেখা করতো। মেয়ে সুমাইয়াকে স্কুলে ভর্তি করা হয়নি।
নিহত তাসলিমা ও মোরশেদুল ইসলামের মা মোর্শেদা বেগম জানান, তার মেয়ে তাসলিমার সঙ্গে ১৩ বছর আগে শফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তারা ঢাকার ধানমন্ডিতে বসবাস করতেন। ওই সময়ে বিভিন্ন কারণে বাহাদুর, বাদশা, বাদলসহ ৮/১০ জনের কাছ থেকে বিভিন্ন পরিমাণ টাকা সুদে ঋণ নেয় শফিকুল। এদের বাড়ি ধানমন্ডি এলাকাতেই। ঢাকায় যে বাড়িতে শফিকুল ভাড়া থাকতেন ওই বাড়ির একজনের কাছ থেকেও সুদে টাকা নেওয়া হয়। এর মধ্যে উল্লিখিতরা শফিকুলকে টাকার জন্য চাপ দিতো, কখনও হুমকিও দিতো। টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তিন মাস আগে শফিকুল পরিবার নিয়ে নারায়ণগঞ্জ চলে আসে। পরে প্রতি সপ্তাহে বিশেষ করে বৃহস্পতিবার রাতে নারায়ণগঞ্জের বাসায় আসতো। আবার শনিবার সকালে চলে যেতো। নারায়ণগঞ্জ আসার পরেও ফোন করে টাকার জন্য চাপ দিতো পাওনাদাররা। তিনি ধারনা করছেন, ঋণের কারণে যারা হুমকি দিতেন তারা হয়তো এ খুনের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।
সন্ধ্যায় নিহত লামিয়ার লাশ তার স্বামী শরিফুলের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়। রাতেই লাশ গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের নান্দাইলে নেওয়া হবে বলে জানা গেছে। তাসলিমাসহ অপর চারজনের লাশ হস্তান্তর করা হয় শফিকুলের কাছে। তাদের লাশ নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হবে ।
বাড়ির মালিক যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ইসমাইলের চাচাতো ভাই হাজি মোহাম্মদ হোসেন জানান, গত নভেম্বর মাসে শফিক ও তার স্ত্রী তাসলিমা ২ কক্ষবিশিষ্ট ফ্ল্যাটটি ভাড়া নেন। পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া গৃহিণী রহিমা বেগম জানান, তাদের কাজে তেমন খারাপ কিছু দেখিনি। আমি ১৫ দিন হলো এই বাড়িতে ভাড়া এসেছি। তবে খুনের পর বাইরে থেকে কে বা কারা তালা দিয়েছে তাও জানি না। রাতে কিভাবে তারা বাড়িতে প্রবেশ করলো তাও বলা যাচ্ছে না।
