মা হ বু ব আ ল ম
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন তাদের স্বপ্নময় অভিযাত্রার অংশ হিসেবে যে কয়টি সেমিনার বা নাট্যোত্সবের আয়োজন করেছে তার মধ্যে গত ১ মার্চ থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত সদ্য সমাপ্ত হওয়া একক অভিনয় নাট্য উত্সবটি উল্লেখযোগ্য। সাত দিনের এই আয়োজনে বাংলাদেশের বিভিন্ন দলের মোট সাতটি একক অভিনয়ের নাটক মঞ্চস্থ হয়। উত্সবে মঞ্চস্থ হওয়া নাটকগুলো হলো ‘কহে বীরাঙ্গনা’, ‘নভেরা’, ‘পঞ্চনারী আখ্যান’, ‘আমি’, ‘হেলেন কেলার’, ‘বীরাঙ্গনার বয়ান’ ও ‘আমার আমি’।
বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ভালো, কিন্তু প্রশ্ন হলো সবগুলো নাটক কি একক অভিনয়ের নাটক? একক অভিনয় নিয়ে দেখা দেয় সংকট। যে সংকট কিছুটা প্রায়োগিক দিক থেকে আবার কিছুটা তাত্ত্বিক দিক থেকে। মূলত, ইংরেজি মনোলোগ থেকে মনোড্রামার উত্পত্তি আর ইংরেজি মনোলোগ হচ্ছে মঞ্চে একজন অভিনেতার দীর্ঘ সংলাপ। সে অর্থে একজন ব্যক্তির অভিনয়কেই একক অভিনয় বলা হয়ে থাকে। কিন্তু একজন ব্যক্তির অভিনয়কে যদি একক অভিনয় হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় তাহলে ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাটকে কোরাস টিমের আয়োজন সেই অর্থে কি একক অভিনয় বলা হবে কি না? ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাটকে চারটি চরিত্র রূপায়ণের মধ্যবর্তীক্ষণে নির্দেশক শুভাশিষ সিনহা একটি কোরাসের ব্যবহার করেছেন। নির্দেশক শুভাশিষ সিনহা বলতেই পারেন কোরাস তো আর অভিনয় করছে না। তাহলে সেই অর্থে ‘গোলাপজান’ নাটকও একক অভিনয়ের নাটক নয়! কথা প্রসঙ্গে বলা ভালো এস এম সোলায়মান নির্দেশিত ‘গোলাপজান’ নাটক সব থেকে জনপ্রিয় এবং মঞ্চ সফল নাটকের একটি। নাটকের আঙ্গিক দিক থেকে ‘গোলাপজান’-এর গড়ন একেবারেই আলাদা। সেখানে গানের সঙ্গে কোরিওগ্রাফিতে কোরাসের ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন চরিত্র মুকাভিনয় করে যাচ্ছে। কেউ কেউ বলতেই পারেন অন্য চরিত্রগুলো তো সংলাপ বলছে না। এখন কথা হলো মুকাভিনয়ও তো অভিনয়। অতএব গোলাপজান কোনোভাবেই একক অভিনয়ের নাটক বা একক অভিনয় হতে পারে না।
‘গোলাপজান’ যদি একক অভিনয় বা একক অভিনয়ের নাটক হয় সেখানে নিঃসন্দেহে একক অভিনয়ের পশ্চিমা মনোড্রামার যে টার্ম আমরা ব্যবহার করছি তাতে ছেদ পড়ে। তাহলে ‘কহে বীরাঙ্গনা’ নাটকও কী করে একক অভিনয়ের নাটক তা ভেবে দেখার বিষয়!
এবার উত্সবের শেষ দিনের নান্দীমুখ প্রযোজনা ‘আমার আমি’ নাটক নিয়ে আলোচনা করা যাক। নটী বিনোদিনীর জীবন যাত্রার গল্প নিয়ে নাটক ‘আমার আমি’। নাটকটি লিখেছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন অসীম দাশ আর অভিনয় করেছেন দীপ্তা রক্ষিত। নাটকটি রচনা ও নির্দেশনার ক্ষেত্রে বেশ দক্ষতার ছাপ লক্ষ করা যায়। সংলাপের গাঁথুনি অসাধারণ। তবে নির্দেশনার ক্ষেত্রে নির্দেশক অসীম দাশ বেশ সুকৌশলী অবস্থান নিয়েছেন সেটা পরিষ্কার হবে একটু বিশ্লেষণ করে বললে। বিনোদিনীর জীবনের নানা বাঁকে তার সঙ্গে সাক্ষাত্ হয় নানা লোকের। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য গিরিশ ঘোষ, শরত্চন্দ্র ঘোষ, গুরমুখ রায়, অবাবু। তারা প্রত্যেকেই স্বঅবস্থানে বিখ্যাত হয়ে আছেন ইতিহাসের পাতায়। নাটকের ঘটনা প্রবাহের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের সঙ্গে বিনোদিনীর কথা হয়, ঝগড়া হয়, বাক-বিতণ্ডা হয়। তাদের সব কথপোকথন রেকর্ডিং আকারে শোনা যায় বারবার, কয়েকবার। নির্দেশক কৌশলে সেই চরিত্রগুলোকে রক্ত-মাংসের মানুষ রূপে মঞ্চে আনেননি কেননা চরিত্রগুলো মঞ্চে আনলে হয়তো সেটা আর একক অভিনয়ের নাটক হবে না। নির্দেশকের এই কৌশলে অন্তত তাই মনে হয়। কিন্তু কথা হলো, চরিত্রগুলো মঞ্চে স্বশরীরে আবির্ভূত না হলেও তাদের কথোপকথনে কি দর্শকের মস্তিষ্কে একটি চিত্র অঙ্কিত হয় না? দর্শক ঠিকই অন্য চরিত্রগুলোকে উইংসের বাইরে দেখতে পায়। এবার হয়তো নির্দেশক বা যে কেউ আবহ সংগীতের কথা বলতে পারেন, বলতে পারেন সে তো রেকর্ডিং বাজাচ্ছে। রেকর্ডিং করা মানেই আবহ সংগীত নয়। সংগীত আর সংলাপ যে ভিন্ন বিষয় সেটা বোধকরি আজকের তরুণ নাট্যশিল্পীও জানে। অতএব ‘আমার আমি’ নাটকটিকে একক অভিনয়ের নাটক বলা যায় কি না সেটি ব্যাখ্যার দাবি রাখে।
একক অভিনয় বা একক অভিনয়ের নাটক পৃথিবীব্যাপী দিন দিন জনপ্রিয় হচ্ছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশেও এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। দলগুলোর নানাবিধ সমস্যা, সংকট আর অভিনেতার শখও আমাদের দেশে একক অভিনয়ের নাটক বেশি হওয়ার কারণ। সেদিক থেকে আরও বেশি বেশি একক অভিনয়ের প্রদর্শনী বা নাট্যোত্সব হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু যেকোনো মনগড়া ব্যাখ্যায় গোলাপজানের মতো সুন্দর মনোরম অভিনয়, মূকাভিনয়, আবহ, সংগীত ও কোরিওগ্রাফিতে সমৃদ্ধ নাটককে একক অভিনয়ের নাটকে শ্রেণিভুক্ত করে বাকিগুলোকেও একক অভিনয়ের নাটক ব্যাখ্যা দিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাটা দুঃখজনক কি না তা ভাবনার বিষয়!
