গর্ভাবস্থায় একজন নারীর শরীরে বেশ কিছু শারীর বৃত্তীয় পরিবর্তন আসে। গর্ভাবস্থায় বাড়ন্ত মানুষকে মেডিকেল সায়েন্স-এর ভাষায় বলে ফিটাস (ভ্রূণ)। ফিটাসের পুষ্টি আসে মায়ের রক্ত থেকে প্লাসেন্টার (গর্ভফুল) মধ্য দিয়ে। ফিটাসের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারীর জরায়ু বড় হতে থাকে।
এছাড়া, প্লাসেন্টায় রক্ত সঞ্চালনের জন্য রক্তের পরিমাণ ও নাড়ীর গতি এক তৃতীয়াংশ বেড়ে যায় এবং অন্যান্য অঙ্গের (যেমন- লিভার) রক্ত প্রবাহ আংশিক কমে যায়। কিন্তু এতে একজন গর্ভবতী নারীর লিভারে কোন সমস্যা হয় না।
গর্ভাবস্থায় লিভার রোগ গর্ভাবস্থায় লিভারের রোগকে তিনটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা হয়। এক, যে সকল রোগ শুধুমাত্র গর্ভাবস্থায় হয়। দুই, যে সকল রোগ গর্ভাবস্থায় অন্য কোন কারণে হয় এবং তিন, যে সকল রোগ আগে থেকেই ছিল এবং এ অবস্থায় উক্ত রুগী গর্ভবতী হয়েছে।
যে সকল রোগ শুধুমাত্র গর্ভাবস্থায় লিভারে হয় সেগুলো হল। একিউট ফ্যাটি লিভার অব প্রেগন্যান্সি, টক্সেমিয়া অব প্রেগন্যান্সি, হিমোলাইসিস এলিভেটেড লিভার এনজাইম ও লো-প্লাটিলেট কাউন্ট (এইচইএলএলপি বা হেল্প সিনড্রোম), হাইপার এমেসিসি গ্র্যাভিডেরাম এবং রিকারেন্ট ইন্ট্রাহেপাটিক কোলেস্ট্যাসিস অব প্রেগন্যান্সি।
গর্ভাবস্থায় অন্যান্য অনেক কারণে লিভার রোগ হতে পারে। তবে তার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’ এবং ‘ই’ ভাইরাস জনিত হেপাটাইটিস। আমাদের দেশে গর্ভাবস্থায় হেপাটাইটিস ‘ই’ জনিত লিভার প্রদাহ হল মারাত্মক। কারণ এই রোগটি লিভার ফেইলিউর করতে পারে।
যে সকল নারী লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত তারা সাধারণত গর্ভবতী হন না। তবে হলেও গর্ভস্থ বাচ্চা মারা যাওয়ার আশঙ্কা বেশী থাকে। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদী পিত্ত জমে থাকার রোগে আক্রান্ত নারী এবং অটোইমিউন লিভার ডিজিজ-এ আক্রান্ত নারী গর্ভবতী হতে পারেন।
গর্ভাবস্থায় পিত্তথলীতে পাথর হতে পারে। তবে এ ধরণের রোগীর সংখ্যা খুব কম। একিউট ফ্যাটি লিভার অব প্রেগন্যান্সি ১৯৪০ সালে সিহান নামক একজন চিকিত্সক সর্বপ্রথম এই রোগটি সম্পর্কে বর্ণনা করেন। গর্ভবতী নারীদের প্রতি ১৪ হাজারে একজন এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সাধারণত গর্ভকালীন ৩৪ থেকে ৩৬ সপ্তাহের সময় এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। হঠাৎ বমি বমি ভাব ও ঘন ঘন বমি শুরু হয়।
এরপর জণ্ডিস দেখা দেয়। এছাড়া পেটে ব্যথা, উচ্চ রক্তচাপ ইত্যাদি লক্ষণও প্রকাশ পেতে পারে। যারা মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হন তাদের প্যানক্রিয়াস ও খাদ্যনালীর (ইসোফ্যাগাস) প্রদাহ, কিডনী ফেইলিউর, এনকেফালোপ্যাথী ও রক্তক্ষরণ এর সমস্যা হতে পারে। পেটে পানি চলে আসতে পারে।
রক্তরসের পরীক্ষায় বিলিরুবিন, এএলটি, এএসটি, অ্যামাইনো এসিড, ল্যাকটিক এসিড, ইউরিক এসিড বেশী পাওয়া যায়। পটাসিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে এবং সোডিয়াম ও গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যায়। রক্তে শ্বেত রক্ত কনিকা বেড়ে যায় এবং অনুচক্রিকা (প্লাটিলেট) কমে যায়। লিভারের আলট্রাসনোগ্রামে ফ্যাটি লিভার পাওয়া যায়।
এই রোগের চিকিত্সার মূলমন্ত্র হলো হাসপাতালে ভর্তি রেখে মা ও ফিটাসের নিবিড় পর্যবেক্ষণ। যদি মায়ের বমি ও জণ্ডিসের পরিমাণ মাত্রাতিরিক্ত হয়ে যায় তাহলে মায়ের সুস্থতার স্বার্থে গর্ভপাত করাতে হয়। যাদের মাত্রাতিরিক্ত সমস্যা দেখা দেয় (যেমন রক্তক্ষরণ, এনকেফালোপ্যাথী) তাদের সমস্যা অনুযায়ী উপযুক্ত চিকিত্সা দেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে আইসিইউতে ভর্তি রেখে চিকিত্সা করা লাগে।
বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে সমস্যা নির্ণয় করে চিকিত্সা দেয়ার ফলে মায়ের মৃত্যুহার কমে এসেছে। একিউট ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত মায়ের সন্তান জন্ম নিলে সন্তানকেও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিত্সা করতে হয়। টক্সেমিয়া অব প্রেগন্যান্সি এর মধ্যে আছে প্রি-এক্লেম্পসিয়া, এক্লেম্পসিয়া, হেল্প সিনড্রোম, লিভারের রক্তক্ষরণ ও রাপচার। প্রি-এক্লেম্পসিয়ার লক্ষণ হল উচ্চরক্তচাপ, প্রস্রাবের সাথে প্রোটিন বেরিয়ে যাওয়া এবং শরীরে পানি আসা।
এছাড়া, পেটে ব্যথা ও বমি বমি ভাবও হতে পারে। এক্লেম্পসিয়ার ক্ষেত্রে উপরোক্ত লক্ষণগুলোর সাথে খিঁচুনী, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি সমস্যা যুক্ত হয়। এই রোগগুলোতে মূলত জরায়ু, কিডনী ও ব্রেইন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তবে মাত্রা বেশী হলে লিভারেও আক্রান্ত হতে পারে। দুটো রোগের ক্ষেত্রেই মূল চিকিত্সা হল বাচ্চা প্রসব করিয়ে ফেলা এবং মাকে পর্যবেক্ষণে রাখা। এইচইএলএলপি (হেল্প) সিনড্রোম হল প্রি-এক্লেম্পসিয়ার এক ধরণের ভ্যারাইটি। এই রোগের রোগীর লোহিত রক্ত কণিকা ভেঙ্গে যায়, রক্তে এএলটি ও এএসটি লিভার এনজাইম বেড়ে যায় এবং প্লাটিলেট কমে যায়। এই রোগের চিকিত্সাও এক্লেম্পসিয়ার মতই।
রিকারেন্ট ইন্ট্রাহেপাটিক কোলেস্ট্যাসিস অব প্রেগন্যান্সি সাধারণত গর্ভকালীন শেষ তিন মাসে এই রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রধান লক্ষণ হল চুলকানী ও জণ্ডিস। তবে সাধারণত জণ্ডিস খুব বেশী হয় না। বাচ্চা ডেলিভারী হয়ে গেলে মায়ের চুলকানী কমে যায়। তবে যাদের ক্ষেত্রে থেকে যায় তাদের প্রাইমারী বিলিয়ারী সিরোসিস হয়েছে কিনা নির্ণয় করতে হয়। মায়ের জন্য এই রোগের পরিণতি ভালো। কিন্তু বাচ্চা পূর্ণতা পাওয়ার আগেই ডেলিভারী হয়ে যাওয়া ও মৃত্যুর সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এজন্য মায়ের অসুস্থতাকালীন মায়ের সাথে সাথে ফিটাসকেও পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। আরসো-ডিঅক্সিকোলিক এসিড দিয়ে মায়ের চিকিত্সা করা হলেই বাচ্চার এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা কমে। ফিটাসের বয়স ৩৬ থেকে ৩৮ সপ্তাহ হলে, যদি দেখা যায় যে, ফিটাসের হূদপিণ্ডের গতি ও নড়াচড়ায় সমস্যা হচ্ছে তাহলে প্রসব করিয়ে ফেলা হয়।
লেখক: পরিচালক
দি লিভার সেন্টার, ঢাকা, বাংলাদেশ
মির্জা গোলাম হাফিজ রোড
বাড়ি নং-৬৪, রোড নং-৮/এ
ধানমণ্ডি, ঢাকা
