বিকাল গড়াতে ঠাণ্ডা হিমেল স্পর্শ। হট্টগোলের বদলে শান্ত ছিমছাম পরিবেশ টিএসসি থেকে বাংলা একাডেমির পথে। স্নিগ্ধতা ঘিরে রেখেছে চারপাশ। হকারদের হট্টগোল নেই, নেই বিরক্তিকর ডাকাডাকি। বদলে যাওয়া বইমেলায় যেন এই শান্ত স্নিগ্ধ পথটি আমন্ত্রণ জানাচ্ছে প্রাণের উত্সবে মেতে উঠবার আমন্ত্রণ। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে মেলায় পাঠকদের আনাগোনা বেশ ভালো। প্রকাশক আয়োজকরা এই পাঠক সমাগম দেখে দুশ্চিন্তা ঝেড়ে ফেলে স্বস্তির হাসি হেসেছেন।
মেলা দ্বার খোলার পরে অভ্যাসবশে বাংলা একাডেমি চত্বরে প্রবেশ করলেও এরপর পাঠকরা ঠিকই চলে এসেছেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মেলার মূল অংশে। কারণ এখানেই এবার শিশু কর্নারসহ সৃজনশীল প্রকাশকদের স্টল। মাত্রই শুরু হলো মেলা কিছু অব্যবস্থাপনা রয়েছে। এখনো পুরো মেলা গুছিয়ে উঠতে পারেনি। বেশকিছু কাজ বাকি রয়ে গেছে। বইয়ের সব স্টল এখনো চালু হয়নি; কিন্তু সেসব কোনো বাধা হয়নি বইয়ের টানে ছুটে আসা দর্শনার্থীদের। যারা বইয়ের গন্ধ ভালোবাসেন, ভালোবাসেন পড়তে তারা ঠিকই এসেছিলেন মেলায়। বিকালে মেলা ঠিকই জমে উঠেছিল। শিশু-কিশোররা যেমন এসেছে মা-বাবার সঙ্গে, তেমনি যুবক-যুবতীরাও বইয়ের স্টলে ঘুরে ঘুরে খুঁজে নিয়েছিলেন প্রিয় লেখকের বই। শীতের আমেজে মেলায় ঘুরেফিরে বেড়ানো, আড্ডা দেবার জন্যও বেশ সুন্দর খোলা-মেলা জায়গা রয়েছে। বন্ধুদের দলে দলে আড্ডা জমে উঠেছে মেলার ফাঁকা স্থানগুলোতে। চলেছে বই নিয়ে আলোচনা। কিছু কিছু স্টলের সামনে পাঠকদের ভিড়ও জমে উঠেছিল। নতুন বই ও মোড়কের ছটায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল স্টলগুলো।
দীপনের জন্য শোকগাথা শুদ্ধস্বরে নেই প্রাণের স্পন্দন
দীপনের বিশাল এক ছবি স্টলজুড়ে। এতো জীবন্ত সেই ছবি যে মনে হচ্ছে না এই মানুষটি নেই। জাগৃতির প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপনের হত্যা মেনে নিতে পারছেন না কেউ। তার বন্ধু প্রকাশকরা যেমন শোক প্রকাশ করছেন তেমনি যারাই জাগৃতির স্টলে বই কিনতে আসছেন তারাই থমকে যাচ্ছেন। বইমেলাতে শোকের আবহ ছড়িয়ে রয়েছে। অন্যদিকে শুদ্ধস্বর-এর স্টলের সামনেও আগের সেই প্রাণ চঞ্চলতা নেই। এর প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুল হামলার শিকার থেকে সেরে উঠে পাড়ি জমিয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে তরুণ প্রকাশক ও লেখকদের যে আড্ডা জমে উঠতো স্টলকে ঘিরে তা অনুপস্থিত। গত বছর মেলার ২৬তম দিনে মুক্ত চিন্তার লেখক অভিজিত রায়কে হত্যা এবং গত বছরের ৩১ অক্টোবর জাগৃতির ফয়সাল আরেফিন দীপনকে হত্যা এবং শুদ্ধস্বরের আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলকে আহত করে মৌলবাদী গোষ্ঠী। সে কারণে এবছর মেলার নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয় মেলার আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। ওয়াচ টাওয়ারসহ নিরাপত্তার কয়েক স্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে আইন-শৃঙ্খলা নিরাপত্তা বাহিনী।
স্টল মালিক, মেলা আয়োজকদের কাজও শেষ হয়নি এখনো
শুধু স্টল মালিকরাই নন, মেলা আয়োজকদের কাজও শেষ হয়নি এখনো। একাডেমি স্টল সজ্জার জন্য প্রকাশনা সংস্থাগুলোকে ২৭ জানুয়ারি সময় বেঁধে দিলেও, মেলার দ্বিতীয় দিনেও স্টল সাজাতে পারেনি বেশ কিছু সংস্থা। সেই সঙ্গে একাডেমিও মেলা প্রাঙ্গণে এখনো পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, মিডিয়া সেন্টার, শৌচাগার নির্মাণ, ওয়াইফাই সংযোগ করতে পারেনি। এছাড়াও কিয়স্ক স্ক্রিনে পুরো মেলা দেখার ডিজিটাল নির্দেশনা, মেলা অভ্যন্তরে মশা নিধন কার্যক্রম, স্ক্রিনের মাধ্যমে মেলামঞ্চের দৃশ্য মেলার অন্যপাশে দেখানোসহ অনেক কিছুই এখনো সম্পন্ন হয়নি। উদ্যান অংশে বাংলাদেশ রাইটার্স গিল্ড এবং বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ বুক সেন্টারের স্টল একেবারে ফাঁকা দেখা গেছে। এছাড়া অঙ্কুরসহ কয়েকটি স্টলের সাজসজ্জায় ব্যস্ত দেখা গেছে সেখানকার কর্মীদের। এসব অসঙ্গতির বিষয়ে মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব জালাল আহমেদ জানান, কয়েকটি স্টল এখনো কাজ শেষ করতে পারেনি। তাদেরকে মঙ্গলবারের মধ্যে কাজ শেষ করার তাগিদ দিয়েছি আমরা। কাজ শেষ করতে না পারলে বুধবার থেকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সে সঙ্গে বুধবারের মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণের মিডিয়া সেন্টার ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের শৌচাগার নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে জানান তিনি।
প্রথমবারের মতো বইমেলায় ডিআরইউ স্টল, উদ্বোধন করলেন তথ্যমন্ত্রী
তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, আঞ্চলিকতা গ্রহণযোগ্য হলেও, বাংলা ভাষার বিকৃত উচ্চারণ গ্রহণযোগ্য নয়। গণমাধ্যমে সঠিক উচ্চারণে বাংলা ভাষার ব্যবহার করা উচিত। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির- ডিআরইউ স্টলের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে সভাপতি জামাল উদ্দীন এবং সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউটের (পিআইবি) মহাপরিচালক শাহ আলমগীর, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব ওমর ফারুক, ডিআরইউর সাবেক সভাপতি শাহেদ চৌধুরী প্রমুখ। এছাড়াও ডিআরইউ বর্তমান কমিটির অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির তথ্যানুযায়ী, গতকাল মেলায় প্রকাশিত হয়েছে মাত্র ৭টি নতুন বই। মূল মঞ্চ ‘নজরুল মঞ্চে’ মোড়ক উন্মোচন করা হয় তিনটি গ্রন্থের। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- সৈয়দ শামসুল হকের ‘নির্বাচিত সেরা সাত’, অবসর ও ‘ম্যাকবেথ এবং কাব্যনাট্য সমগ্র’, চারুলিপি; হুমায়ূন আহমেদের ‘সেরা দশ গল্প’; অন্যপ্রকাশ, ইমদাদুল হক মিলনের ‘সেরা দশ গল্প’; অন্যপ্রকাশ, সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল শওকত আলীর গণপরিষদ থেকে নবম জাতীয় সংসদ, আগামী প্রকাশনী; জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের ‘স্বপ্নে সীমানা পারাপার’; অন্যপ্রকাশ, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘যখন সাংবাদিক ছিলাম’, চারুলিপি; পাভেল রহমানের ‘সাংবাদিকতায় আমার ক্যামেরা’, মাওলা ব্রাদার্স; হাবীবুল্লাহ সিরাজীর ‘যে শ্রেষ্ঠ একা’, মহাদেব সাহার কাব্যগ্রন্থ ‘মধুর মুহূর্তগুলি চলে যায়’, মাওলা ব্রাদার্স, শোভাপ্রকাশ এনেছে আবুল আহসান চৌধুরীর ‘লালন সাঁই ও বাঙালি সমাজ’, ঐতিহ্য এনেছে মো. নূরুল আনোয়ারের ‘একুশে গুলিবর্ষণ মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর কারিশমা’, কথাপ্রকাশ এনেছে তাহা ইয়াসিন সম্পাদিত ‘নজরুলের বিদ্রোহীর চেতনালোক।
মেলামঞ্চের আয়োজন
গতকাল মেলার মূল মঞ্চ ‘নজরুল মঞ্চে’ অনুষ্ঠিত হয়েছে “বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : বাংলা একাডেমিকে ফিরে দেখা” শীর্ষক আলোচনা। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শফিউল ইসলাম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ফজলে রাব্বি, আজিজুর রহমান আজিজ, বেগম আকতার কামাল এবং মোহিত কামাল। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবদুল কাইউম। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়, সুবীর নন্দী, সুজিত মোস্তফা, ইফফাত আরা নার্গিস ও আঞ্জুমান আরা শিমুল।
আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব
অমর একুশে এবং বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে আজ বুধবার অনুষ্ঠিত হবে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক কবিতা উত্সব। উত্সবের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে এবং বিকালে মেলার মূল মঞ্চে দ্বিতীয় অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এতে অংশ নেবেন স্লোভাকিয়া, মরক্কো, সুইডেন, চীন, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, ভারত ও বাংলাদেশের কবিরা।
