প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যায় করণীয়

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১০:৫৪
শৈশবের সোনালি সকাল শেষ করে তারুণ্য আর যৌবনের রোদেলা দুপুর পাড়ি দিয়ে মাঝ বয়সের ব্যস্ত বিকেলটাও যখন চলে যায় তখনই জীবন সায়াহ্নের গোধূলী বেলায় আসে বার্ধক্য।  আর এ সময় স্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। চুল পাকে, চুল পড়ে যায়, ত্বকে দেখা দেয় বলি রেখা। চোখের দৃষ্টি ক্ষীণ হয়ে আসে, শ্রবণ শক্তি কমতে থাকে। স্মৃতিশক্তি কমে যায় এবং পেশিও দুর্বল হয়ে পড়ে। খাবারের রুচি কমে যায়, এর সঙ্গে ঘুমও কমে যায়। হাড়ের ক্ষয় হয়, লিভার এবং কিডনির কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। শরীরের প্রায় সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গেই জরা বাসা বাধে।
 
বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন ছাড়াও বৃদ্ধদের শরীরে নানাবিধ রোগব্যাধিও দানা বাঁধে। শারীরিক পরিবর্তনের কারণে কিছু কিছু রোগ প্রকৃতিগতভাবে বয়স্কদের হয়ে থাকে। যেমন-তাদের রক্তনালী সরু হয়ে যায়, ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক বা মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরণ ইত্যাদি হতে পারে। প্রবীণদের মস্তিষ্ক ছোট হয়ে আসে, মেডিক্যাল সাইন্সের ভাষায় বলে ব্রেইন এট্রফি। ফলশ্রুতিতে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে কমতে থাকে। কেউ কেউ আলঝেইমারস ডিজিজ বা ডিমেনসিয়াতে আক্রান্ত হন। ফলে স্মৃতিশক্তি কমে যায়, আবেগ, অনুভূতি, বিচারবুদ্ধি, বিবেচনাশক্তি, চিন্তাশক্তি, কাজ করার ক্ষমতা ইত্যাদির পরিবর্তন ঘটে। আচার আচরণে অনেকটাই শিশুতে পরিণত হন। এক সময় খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দেন, বিছানায় মল-মূত্র ত্যাগ করেন। এছাড়াও মাথা ঘোরা, হাত পা কাপা, যাকে বলে পার্কিনসন্স ডিজিজ ইত্যাদি নানা ধরণের মস্তিষ্কের রোগও প্রবীণদের মাঝে দেখা যায়। আবার মাথা ঘুরে পরে গিয়ে অন্য নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হাড় ক্ষয়ে যায়, যাকে বলা হয় অস্টিওপরোসিস। এতে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা বোধ হয়, মাঝে মাঝে সামান্য আঘাতেই হাড় ভেঙ্গে যায়। এছাড়া অস্টিওআর্থ্রাইটিসের কারণে অস্থি সন্ধিতে ব্যথা হয় যেমন- হাঁটুতে ব্যথা, কোমড়ে ব্যথা এমনকি শরীর বেকে যায়। ফলে কার্যক্ষমতা আরো কমে যায়। হাঁটা চলায় প্রচণ্ড অসুবিধা হয়। চোখে ছানিপড়াটাও বয়স্কদের রোগ। পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রস্টেট গ্রন্থি বড় হয়ে প্রস্রাবের জটিলতা দেখা দিতে পারে। এতে মূত্র ধারণ ক্ষমতা কমে যায়। প্রস্রাব করতে বেশি সময় লাগে, চাপ দিয়ে প্রস্রাব করতে হয়। মল-মূত্র ধরে রাখার ক্ষমতাও বয়সের সঙ্গে সঙ্গে হ্রাস পায়। পানি ও লবণের পরিমাণ ব্যঘাত ঘটে, শীতে বা সামান্য ঠাণ্ডাতেই তাদের দেহ ঠাণ্ড হয়ে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তাদের বিভিন্ন ধরণের ইনফেকশনে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা থাকে, যেমন নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা, চামড়ার ইনফেকশন ইত্যাদি। বিভিন্ন ধরণের ক্যান্সারও বয়স্কদের বেশি হয়।
 
আগের চেয়ে এখন প্রবীণ রোগী অনেক বেশি দেখা যায়। এর মূল কারণ, প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি। এক সময় মানুষের গড় আয়ু কম ছিল, বৃদ্ধ হওয়াটাই ছিল এক বিরাট সাফল্য। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত জীবন যাপন পদ্ধতি অনুসরণ, স্বাস্থ্য সচেতনতা, দ্রুত রোগ নির্ণয় ও কার্যকর চিকিৎসার সহজলভ্যতা, পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি, নিরাপদ পানীয় জলের সংস্থান, নানা রকম রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সফল প্রয়োগ ইত্যাদি কারণে মানুষ আজ বেশি দিন বেঁচে থাকতে পারে। অনেক জটিল রোগ যা এক সময় মৃত্যুর নামান্তর ছিল, আজ তা অনেকাংশে নিরাময় যোগ্য। স্ট্রোক কিংবা হূদরোগে আক্রান্ত ব্যক্তিও বেঁচে যাচ্ছেন, কিডনি বা লিভারের রোগে আক্রান্ত মৃতপ্রায় ব্যক্তি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে নতুন জীবন লাভ করছেন। এসব সাফল্য আমাদের গড় আয়ু বাড়িয়ে দিয়েছে। আর সেই কারণেই প্রবীণদের সংখ্যাও বাড়ছে। সেই সঙ্গে বয়স বৃদ্ধি জনিত রোগ সমূহের প্রকোপও বেড়ে গেছে।
 
শুধু শারীরিক রোগ ব্যাধিই নয়, প্রবীণদের সমস্যাটা আসলে বহুমাত্রিক। তারা মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবেও সমস্যায় জর্জরিত। আসলে একটা মানুষ যখন বার্ধক্যে উপনীত হয়, তখন তার নিজের মধ্যেই কিছু কিছু জিনিস দানা বেঁধে উঠে। যেমন- শারীরিক অসামর্থ্য, অসহায়ত্ব, পরনির্ভরশীলতা, অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা এগুলোর কারণে মানসিক যন্ত্রণা থেকে শুরু করে নিজেকে অবাঞ্চিত, পরিবারের বা সমাজের বোঝা মনে করেন। অনেক প্রবীণই বিষণ্নতায় ভোগেন। অনেক সময় এমন অযৌক্তিক ও শিশুসুলভ আচরণ তাদের মধ্যে প্রকাশ পায়, যাকে অনেকেই দ্বিতীয় শৈশব বলে মনে করেন। বয়স্ক রোগী বৃদ্ধির কারণে পারিবারিক, স্বাস্থ্যগত, সামাজিক এমন কি রাষ্ট্রীয় সমস্যাও প্রবল আকার ধারণ করছে। পারিবারিকভাবে অনেক সময় প্রবীণরা অবহেলা অযত্নের শিকার হয়ে পরিবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন বা পরিবারই তাকে ঠেলে দিচ্ছে দূরে। তার নিকটজন এমনকি ছেলেমেয়েরাও তাকে বোঝা মনে করছে। আবার অনেক প্রবীন নিজেই কারো উপর বোঝা হয়ে থাকতে চাচ্ছেন না, বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিচ্ছেন।
 
তাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার প্রধান কারণ হল, চিকিত্সা সুবিধার অভাব। তাদের জন্য চিকিত্সার সুযোগ সুবিধা অনেক যায়গায় নাই, বা থাকলেও সীমিত, বিশেষ করে গ্রাম পর্যায়ে। তৃতীয় বিশ্বে অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ আর এর শিকার হন প্রবীনেরা, বিশেষ করে নারীরা। আবার গ্রামের প্রবীণদের আর শহরের প্রবীণদের সমস্যা অনেক সময় ভিন্ন হয়। শহরে অনেক প্রবীণ সামাজিক এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল, কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক সমস্যায় ভোগেন বেশি। নিঃসঙ্গতা বা পারিবারিক অবহেলা এ ক্ষেত্রে দায়ী। গ্রামের প্রবীণদের মধ্যে আর্থিক অস্বচ্ছলতা বেশি। ভূমিহীন অস্বচ্ছল গ্রামীণরাই আর্থিক দীনতায় আরো বেশি ভোগেন। যে কারণে পরনির্ভরশীলতার কারণে খাওয়া দাওয়া থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সমস্যাটা গ্রাম পর্যায়ে অত্যন্ত জটিল।
প্রবীণদের স্বাস্থ্য সমস্যা চিকিত্সা বিজ্ঞানের একটি বিশেষায়িত বিভাগ। কিছু কিছু রোগ আছে যা শুধু বয়স্কদেরই হয়। আবার সকল বয়সেই হয় এমন রোগের লক্ষণ, তীব্রতা ও চিকিত্সা বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রে ভিন্ন হতে পারে। বিভিন্ন ওষুধের মাত্রা বয়স্কদের জন্য কম, অনেক ওষুধ সাবধানতার সঙ্গে দেয়া প্রয়োজন হয়। এছাড়া বয়স্কদের খাবারের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সতর্কতা প্রয়োজন। তাদের সেবার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দিকে নজর দিতে হয়, যা অন্য বয়সীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন নাও হতে পারে। যেমন- নিয়মিত পায়খানা হচ্ছে কিনা, প্রস্রাবে সমস্যা হচ্ছে কিনা, তারা নিজেদের যত্ন নিতে পারছেন কিনা ইত্যাদি। অনেক সময় বৃদ্ধরা শিশুদের মতই নিজেদের সমস্যা ঠিকমত বলতে পারেন না। তাই তাদের না বলা কথা বোঝার মত যোগ্যতা সেবাদানকারীদের থাকতে হবে। এসব দিক বিবেচনায় রেখে উন্নত বিশ্বে শুধু বৃদ্ধদের জন্য আলাদা বিশেষজ্ঞ চিকিত্সা বিভাগ থাকে, যাকে বলে জেরিয়াট্রিক মেডিসিন। বৃদ্ধদের যে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা ও স্বাস্থ্য সেবার জন্য তারা বিশেষ প্রশিক্ষণ পেয়ে থাকেন। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে এখনও বৃদ্ধদের স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা সেবা অত্যন্ত সীমিত। তাই দেখা যায়, তারা বাসায় যেমন নিজেদের পরিবার কর্তৃক অবহেলিত হন, তেমনি স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও যথাযথ সুবিধা পান না। এই বয়সে অনেক রোগেই কোনা সুনির্দিষ্ট উপসর্গ থাকে না বা বয়স্করা সেগুলো ঠিক মত অনুভব করতে বা প্রকাশ করতে পারেন না। অনেক সময় দেখা যায় খুব জটিল বা মারাত্মক অসুখে বৃদ্ধরোগী সাধারণ অবসাদ, দুর্বলতা, অস্বস্তি এ ধরণের সমস্যার কথা বলছেন। এমন ক্ষেত্রে পরিবার থেকেও নজর রাখা হচ্ছেনা, এমনকি চিকিত্সকও যথার্থ মনোযোগ দেন না, হয়তো বার্ধক্যজনিত রোগ মনে করেন। এভাবে অবহেলার কারণে অনেক রোগ নিরাময় সম্ভব হয়না। এর মূল কারণ বৃদ্ধদের সমস্যা সম্পর্কে বিশেষায়িত জ্ঞানের অভাব।
 
প্রবীন ব্যক্তিরা সম্মানিত। অতীতে তার পরিবার, সমাজ, দেশ ও জাতির কল্যাণে অনেক কিছুই করে গেছেন। তাদের যেন কোনো রকম অবহেলা করা না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আমরা যারা নবীন, তারা যেন ভুলে না যাই একদিন এই অবস্থায় আমরাও উপনীত হব। আজ যদি আমরা তাদের প্রতি অবহেলা করি, তাহলে আমাদেরকেও অবহেলার শিকার হতে হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই প্রবীণরা অবহেলিত, উপেক্ষিত, সমাজে ও পরিবারে অনেকের কাছে বোঝা স্বরুপ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে আমাদের সবার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া অবশ্য কর্তব্য।