হাতে বই, চোখে খুশির ঝিলিক

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০৯:৪৫
দিনটি যেন সত্যিই শিশুদের। শুধু কি বইকেনা! সেইসাথে নাচ-গান, দৌড়াদৌড়ি-সবমিলিয়ে এক সীমাহীন আনন্দ উত্সবে মেতে ওঠে তারা। সিসিমপুরের অনুষ্ঠান সেই উত্সবের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণ। অনুষ্ঠানে সুন্দর সুন্দর সব বই পড়ার অঙ্গীকার করেছে কোমলমতি শিশুরা।
 
গতকাল শুক্রবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় শিশুদের জন্য ঘোষিত ‘শিশুপ্রহর’ যেন সত্যি সত্যিই শিশুদের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। সিসিমপুরের প্রিয় সব চরিত্র হালুম, টুকটুকি, ইকরিকে কাছে পেয়ে নেচে-গেয়ে, তাদের সঙ্গে ছবি তোলার প্রতিযোগিতায় নেমেছিল তারা। তবে শুধু নাচ-গান আর দৌড়াদৌড়ি নয়, হাতভর্তি বই কিনেছে সবাই। সবারই হাতে হাতে ছিল বই, চোখে আনন্দ। সন্তানের আব্দার মেটাতে কৃপণতা করেননি মা-বাবাও।
 
রাজধানীর শান্তিনগর থেকে দুই ছেলে সাদমান ও আদনানকে নিয়ে গতকাল মেলায় এসেছিলেন আনোয়ারুল ইসলাম। দুই ছেলেই চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। এদের মধ্যে সাদমান শারীরিক প্রতিবন্ধী। হুইলচেয়ারে করে সে মেলায় এসেছে। বাবার সাথে ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন স্টলে গিয়ে পছন্দের বই কিনছে। পছন্দের লেখক কে জিজ্ঞেস করতেই হাসিমুখে জানালো, পছন্দের কোন লেখক নেই। বই পছন্দ হলেই কিনছি।
 
তবে শিশুদের বই নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন একজন অভিভাবক। রাজধানীর আরামবাগের বাসিন্দা জেসমিন আরা বললেন, মেলায় শিশুদের জন্য যেসব বই প্রকাশ হচ্ছে তা খুব ভালো মানের নয়। এ বিষয়ে শিশু একাডেমির নজর দেয়া উচিত। তিনি বলেন, গল্পের বই ঠিক আছে, তাই বলে শিক্ষনীয় কিছু থাকবে না। আবার গল্পের মানও যাচ্ছে-তাই। তাহলে শিশুরা এসব বই থেকে কি শিখবে?
 
এদিকে গতকাল সকালে জমজমাট শিশুপ্রহরের পর বিকেলে মেলায় বইপ্রেমীদের ঢল নামে। সরকারি ছুটির দিন থাকায় সব পেশাজীবী মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়  মেলা। রীতিমতো জনসে াতের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বইপ্রেমীরা মেলায় প্রবেশ করেন। তবে আজ পহেলা ফাল্গুন হওয়ায় মেলায় ভিড় আরো বাড়বে।
 
‘শিশুদের ফুটতে দিতে হবে’: সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেছেন, শিশুদের শুধু স্কুলের পড়াশোনা করলেই হবে না, তাদের ফুটতে দিতে হবে। তারা একটি ফুল, এই ফুলের বিকাশ প্রয়োজন। এজন্য তাদের বই পড়তে হবে, খেলাধুলা করতে হবে।
 
গতকাল বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে শিশুতোষ অনুষ্ঠান সিসিমপুরের এক প্রকাশনা উত্সবে তিনি এ কথা বলেন। কয়েক শ’ শিশু-কিশোর এ অনুষ্ঠান উপভোগ করে। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট, ইউএসএআইডি’র মিশন ডিরেক্টর জানিনা জারুজিলিসকি, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান প্রমুখ।
 
মার্কিন রাষ্ট্রদূত অনুষ্ঠানে শিশুদের উচ্ছ্বাস দেখে আনন্দ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বই মানুষকে নিজ দেশের মানুষ ও সমাজের নানাবিধ বিষয় শেখানোর পাশাপাশি ভিন্নদেশের মানুষ ও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে সহায়তা করে। নতুন ধ্যান-ধারণাকে পাথেয় করে বড় হতে সহায়তা করে।
 
খুদে লেখক অলীন বাসার:এক ঝাঁক কচিকাঁচা সঙ্গে নিয়ে গতকাল বইমেলায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সিসিমপুর মঞ্চে মোড়ক উন্মোচন করা হয় সবচেয়ে ছোট লেখক অলীন বাসারের দ্বিতীয় বই ‘ভুতুড়ে’-এর। লেখক আনিসুল হক ও নাট্যকার খায়রুল বাসার বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন। বইটি প্রকাশ করেছে সাঁকোবাড়ি প্রকাশন। এতে ১৩টি গল্প আছে। অলীন আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্র।
 
২৮০ নতুন বই:গতকাল বইমেলায় ২৮০টি নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখ্যযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে: কথা প্রকাশ থেকে  সেলিনা হোসেনের ‘নিঃসঙ্গতার মুখর সময়’, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স থেকে একই লেখকের ‘রাসেলের জন্য অপেক্ষা’, জয়তী থেকে জিয়া হায়দারের ‘কবিতা সমগ্র’, আগামী প্রকাশনী থেকে রফিকুল ইসলামের ‘বাংলাদেশের সাহিত্যে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ’, প্রতিভা থেকে আলী ইমামের ‘মহাস্থানগড় রহস্য’,  পার্ল পাবলিকেশন্স থেকে আনিসুল হকের ‘পৃথিবীর সবচেয়ে রূপবতী নারী আপনার জন্য’, অন্য প্রকাশ থেকে পীর হাবিবুর রহমানের ‘লজ্জাবতী’, কাকলী প্রকাশনী থেকে রকিব হাসানের ‘কিশোর মুসা রবিন বেহালা চোর’, ঝিনুক প্রকাশনী থেকে জাহাঙ্গীর শাহরিয়ারের ‘যুদ্ধ জয়ের গল্প’, বাড পাবলিকেশন্স থেকে ফজলে আহমদের ‘ছোটদের মুক্তিযুদ্ধের গল্প’, রাতুল গ্রন্থ প্রকাশ থেকে আসলাম সানীর ‘এইতো আমার বাংলাদেশ’, মুক্তধারা থেকে ড. নুরুল আমিনের ‘নারায়ণ বঙ্গোপাধ্যায়ের শ্রেষ্ঠ গল্প’ ও বলাকা প্রকাশন থেকে শামসুল আরেফীনের ‘বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার দুর্লভ দলিল’।
 
মূলমঞ্চের অনুষ্ঠান: গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে সকালে শিশু-কিশোর সংগীত প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী পাপিয়া সারোয়ার। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান। প্রতিযোগিতায় দুই শতাধিক প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব অনুষ্ঠিত হবে।
 
এছাড়া বিকালে  মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশে নজরুল চর্চা : অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রফিকউল্লাহ খান। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহীত উল আলম, কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজ এবং কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন। সভাপতিত্ব করেন প্রখ্যাত নজরুল গবেষক ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম।
 
অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বলেন, সামপ্রতিক সময়ে নজরুলচর্চা নতুন মাত্রা লাভ করেছে। বিশেষ করে নজরুলের অমর রচনাকর্ম ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, ফারসি এমনকি স্প্যানিশ-পর্তুগিজ ভাষায়ও অনূদিত হচ্ছে, যার মধ্য দিয়ে বাংলার নজরুল পৌঁছে যাবেন সারা বিশ্বে।
 
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করে ‘সুরের আলো সংগীত একাডেমি’র শিল্পীবৃন্দ। এছাড়াও সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী খালিদ হোসেন, লিলি ইসলাম, নাশিদ কামাল, লীনা তাপসী প্রমুখ।