প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগ গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয়ভাবে টানা তৃতীয় মেয়াদে জয়লাভ করেছে। এই নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ বলে বিবেচনা করা হচ্ছে না। নির্বাচনে ভোট জালিয়াতি, বিরোধী পোলিং এজেন্ট ও ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন করাসহ অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। নির্বাচনের প্রচারণাকালে বিরোধীদের হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন, নির্বিচারে আটক এবং সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে, যে কারণে বিরোধীদলের প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা স্বাধীনভাবে সমাবেশ ও প্রচারণা চালাতে পারেনি। নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সময়মতো পরিচয়পত্র ও ভিসা প্রদান করা হয়নি। নির্বাচনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর বেসামরিক কর্তৃপক্ষের কার্যকর নিয়ন্ত্রণও বজায় ছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।
২০১৮ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে করা প্রতিবেদনটি গতকাল বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অংশে আরো উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে নিরাপত্তা বাহিনী দ্বারা বেআইনিভাবে আটক ও গুম, নির্যাতনের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তারপরও সরকার নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা নির্যাতন ও হত্যা বন্ধে এবং দায়ীদের বিচারে কার্যকর পদক্ষেপ কমই নিয়েছে। ‘প্রাইভেসিতে’ বেআইনিভাবে হস্তক্ষেপ, সেসন্সরশিপ আরোপ, ইন্টারনেটে সাইট বন্ধ, বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) কাজের স্বাধীনতা সংকুচিত করার মাধ্যমেও মানবাধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণে স্বাধীনতার অভাব, দুর্নীতি, সহিংসতা, লৈঙ্গিক বৈষম্য এখনো মানবাধিকারের বড় সমস্যা। মানবপাচার এখনো গুরুতর সমস্যা, শ্রম অধিকার সংকুচিত রাখা হয়েছে এবং শিশু শ্রমের অবস্থা খুবই করুণ।
প্রতিবেদনে গত সংসদ নির্বাচন নিয়ে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ ও তার শরিকরা ৮০ শতাংশের বেশি ভোট ও ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮ আসনে সরাসরি নির্বাচিত হয়েছে। বিরোধী জোট সেখানে মাত্র সাতটি আসন পেয়েছে। নির্বাচনের আগে বিরোধীদলের ওপর সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এনজিও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী নির্বাচনের আগে বিরোধীদের ওপর ১৩২৪টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। যেখানে আওয়ামী লীগ ও এর শরিকদের ওপর ২১১টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। গত বছরে খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেও বিরোধীদের ওপর একই ধরনের হয়রানি, আটক ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটেছে।
প্রতিবেদনে অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’র (এইচআরএসএস) বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিরাপত্তা বাহিনীর ক্রসফায়ারে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আরেক সংগঠন অধিকার জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ৪১৫ জন ক্রসফায়ারে প্রাণ হারিয়েছে। গত বছরের মে মাসে সরকার মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করে। এই অভিযানের কারণে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে। প্রায় ২৩০ জন সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন এবং ১৭ হাজারের মতো লোককে আটক করা হয়েছে। ভিকটিমদের মধ্যে অনেকে নিরীহ ছিলেন বলে মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজ উদ্বেগ প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে গত ২৬ মে টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হকের হত্যাকাণ্ডের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের গত বছরের প্রথম ১০ মাসে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে ৫৭ বন্দির মৃত্যু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে গুমের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক অপহরণ ও গুমের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এইচআরএসএস’র তথ্য মতে, জানুয়ারি থেকে সেপ্টম্বর পর্যন্ত ৫৮ জন গুমের শিকার হয়েছে। তবে নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ৮৩ বলে অধিকারের তথ্য। প্রতিবেদনে আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে আটকের পর নির্যাতন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সরকার সংবিধান স্বীকৃত বাক্-স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে অনেক সময় ব্যর্থ হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
