অগ্নিমানুষ

ইতিহাসের চক্রাবর্তে মুক্তির আলো

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৯, ১৯:২৮

মোস্তফা কামালের সদ্য প্রকাশিত উপন্যাস ‘অগ্নিমানুষ’ পড়তে ধরে নানা কথা মনের মধ্যে উঁকি দেয়। উপন্যাস নানাভাবেই লিখতে পারা যায়। আত্মজীবনের অংশ নিয়ে চারপাশ দেখেশুনে, পর্যবেক্ষণ ও স্বপ্ন-কল্পনাকে আশ্রয় করে এবং গবেষণালব্ধ তথ্যসমাহারে। এর বাইরেও থাকতে পারে কোনো পদ্ধতি। তবে এক্ষেত্রে দরকারি কথা হচ্ছে, উপন্যাসটি সুখপাঠ্য হলে ভালো। এখানে পঠনসুখের চেয়ে চিত্ততৃপ্তির ওপর জোর দিতে চাই। উপন্যাসের ভাষা, কাহিনিবিন্যাস, চরিত্রনির্মাণ এবং অনুভব ও সময়ের বিস্তারের লাবণ্য আমাদের চিত্ত তৃপ্ত করতে সহায়তা করে। মোস্তফা কামালের ‘অগ্নিমানুষ’ উপন্যাসে এসবের বিশদ ও বিস্তারিত রেখাচিত্র ধরা পড়েছে।

উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সময়পর্ব নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। সময়ের রেখা ধরে নানা ঘটনা ও গল্পের জন্ম হয়েছে এই কালপর্বে। কিন্তু সময় অতীত হয়ে গেলেও তার অভিঘাত আজো ফুরোয়নি। জন্মের পরে ছেড়ে যাওয়া মাটির স্মৃতির টান ও খোঁজে জীবনের প্রান্তে এসেও মানুষ যেভাবে পাশ ফেরে ঘুমের ভেতরে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ তেমনই আলো-অন্ধকারে মিশে যাওয়া সময়।

তিন পর্বের এ ট্রিলজির নামকরণে ঔপন্যাসিকের পরিমিতিবোধ ও দূরদর্শী শিল্পমানসের পরিচয় পাওয়া যায়। প্রথম পর্ব ‘অগ্নিকন্যা’, দ্বিতীয় পর্ব ‘অগ্নিপুরুষ’; তৃতীয় এবং শেষ পর্ব ‘অগ্নিমানুষ’। শেষপর্বে এসে উপন্যাসটি পূর্ণতা পেয়েছে, আলোচ্য সময়পর্বও ধারণ করেছে। ‘অগ্নিমানুষ’ উপন্যাসটি পাঠক কেন পড়বেন? এ প্রশ্ন আমার মনে হয়েছে শুরুতে। কারণ এর সমস্ত ঘটনা ও তথ্য ইতিহাসবিষয়ক নানা বইপত্র ও পত্রিকাসূত্র থেকে ইচ্ছে করলেই জানতে পারা যায়। পরে, উপন্যাসের পৃষ্ঠা পড়ে যেতে যেতে উত্তরটি পেয়ে যাই। ইতিহাস বইয়ে হয়তো সব তথ্যই মিলবে, কিন্তু বাস্তবে কীভাবে ঘটনাগুলো ঘটেছিল, সময় ও চরিত্র কীভাবে দেশভাগ-ভাষা আন্দোলন-ছয় দফা ও মুক্তিযুদ্ধের বিচিত্র মুহূর্তগুলো গল্প করে তুলেছিল, তা ইতিহাসের বইতে নেই। ঔপন্যাসিক গল্পের ক্যানভাসে বাস্তবের সত্য, ইতিহাস এবং কল্পনার সৌরভ ও কলমের দ্যুতিতে এমনভাবে তুলে আনেন, যা পাঠক পড়তে পড়তে ইতিহাসের সময়ের সেই সন্ধিক্ষণে ঢুকে যান। গম্ভীর ও ভারাক্রান্ত তথ্য আর ইতিহাসই তখন হয়ে ওঠে রক্তমাংসের জীবন্ত চলচ্ছবি। ‘অগ্নিমানুষ’-এ ঔপন্যাসিক মোস্তফা কামাল সময় ও চরিত্রের মানসলোকে অবগাহন করে ঘটনা ও ইতিহাসের নির্যাসটুকু এমন আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে উপন্যাসের কাঠামোতে তুলে এনেছেন, তিনি যেন সময়ের সাক্ষী হয়ে বিবেচিত হয়ে ওঠেন।

উপন্যাসে চরিত্রনির্মাণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, ভাষার ব্যবহারও তেমনি মুগ্ধতা তৈরি করে। ভাষার গুণেই পাঠকের পাঠতৃষ্ণা বেড়ে যায়। এখানে আমরা খেয়াল করি, আগের দু পর্বের চেয়ে ‘অগ্নিমানুষ’-এ তিনি বেশ সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত। চেনাজানা শব্দের বাইরে থেকেও তিনি শব্দচয়ন করেছেন, চরিত্র ধরে ধরে। উপন্যাসের শরীরে সংলাপ বুনেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে।

নিজেকে অতিক্রম করার যে গুরুকথাটি শোনা যায় শিল্পসাহিত্যে, এখানে তার পরিচয় ধরা পড়েছে দারুণভাবে। এতে লেখকের প্রয়াস ও কোশেসটুকু আলাদাভাবে অনুভব করা যায়। মূল গল্পকে তুলে আনতে তিনি কখনো পার্শ্বগল্প ও সরল চরিত্র তৈরি করেছেন। কিন্তু ’৬৯ থেকে কীভাবে আন্দোলন দানা বেঁধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি সংগঠিত হলো, মুক্তিযুদ্ধ কখন অনিবার্য হয়ে উঠল এবং বাঙালি সাফল্য ছিনিয়ে আনল—‘অগ্নিমানুষ’ তারই প্রামাণ্য উপাখ্যান। কত রক্ত ও প্রাণের হলো ক্ষয়, জান মাল তুচ্ছ করে কত মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে স্বাধীনতার লাল-সবুজের পতাকার জন্য। কী বিপুল ধ্বংসযজ্ঞ করেছে পাকিস্তান—তা নিয়েই আলাদা বই হবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষেরই জয় হয়—মানুষের শুভবোধ ও স্বাধিকারের লড়াই যখন সম্মিলিতভাবে সুর তোলে, আরাধ্য হয়ে ওঠে, ভুল শক্তির পরাজয় তখন অনিবার্য হয়ে ওঠে। ‘অগ্নিমানুষ’ উপন্যাসে সেই সুন্দর ও সফল গল্পের বিভা ও দলিল খুঁজে পাই। আমরা বইটির বহুল পাঠ ও প্রচার প্রত্যাশা করি।

 

 

অগ্নিমানুষ

মোস্তফা কামাল

প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ

প্রকাশক :পার্ল পাবলিকেশন্স

দাম : ৫০০ টাকা