সরকারি নির্মাণকাজে প্রায়শই নানা ধরনের অনিয়মের খবর প্রকাশিত হয়। এমনকী প্রায়শই ঘটিয়া থাকে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। সম্প্রতি এমনই একটি দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে টাঙ্গাইলের মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। গত মঙ্গলবার সেইখানে নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ ধসিয়া আহত হইয়াছেন ১৮ জন শ্রমিক। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ১০তলা মাল্টিপারপাস ভবনের নির্মাণকাজ চলিতেছে। গত মঙ্গলবার রাতে ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার ছাদ ঢালাইয়ের কাজ চলিতেছিল। মধ্যরাতে হঠাত্ ছাদের পশ্চিম প্রান্তের উত্তর অংশ ধসিয়া পড়ে। ধ্বংসস্তূপের নিচ হইতে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আহতদের উদ্ধার করিয়া হাসপাতালে পাঠাইয়াছেন। ইহার মধ্যে গুরুতর আহত একজনকে উন্নত চিকিত্সার জন্য ঢাকায় পঙ্গু হাসপাতালে পাঠানো হইয়াছে।
বড় বড় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে আধুনিক নির্মাণব্যবস্থা এখন বাংলাদেশে রহিয়াছে। নিরাপত্তাকে সবচাইতে বেশি প্রাধান্য দিয়া বেসরকারি উদ্যোগে অসংখ্য বহুতল ভবন নির্মাণ হইয়াছে এবং এখনো হইতেছে। সুতরাং বড় ধরনের গাফিলতি ছাড়া নির্মাণাধীন ছাদ ধসিয়া পড়িবার প্রশ্নই ওঠে না। মওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হইয়াছে, নাকি নির্মাণ-প্রতিষ্ঠানের বিশেষ কোনো গাফিলতি বা অবহেলা রহিয়াছে—তাহা তদন্ত করিয়া দেখিতে হইবে। তবে সরকারি বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের ঘটনা নূতন কিছু নহে। কিছুদিন পূর্বে ধসিয়া পড়িয়াছিল নির্মাণাধীন কুষ্টিয়া মেডিক্যালের ছাদ। তাহাতে নিহত হইয়াছিলেন এক শ্রমিক। গত বত্সর ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে জেলা পরিষদের অর্থায়নে নির্মাণাধীন অডিটরিয়ামের ছাদ ধসিয়া পড়িয়া একজন নির্মাণ শ্রমিক নিহতসহ আহত হইয়াছিলেন অন্তত ১৫ জন। পরবর্তীসময়ে জানা যায় যে, মরিচা-ধরা নিম্নমানের রড ব্যবহারসহ নানাবিধ দুর্বলতার কারণে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। ইসপাতের রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের প্রথম ঘটনাটি উন্মোচিত হয় চুয়াডাঙ্গা জেলায়। ইহার পর গাইবান্ধায় মেঘডুমুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগার নির্মাণকাজেও ইসপাতের রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের খবর আসে গণমাধ্যমে। পাবনার সুজানগর উপজেলার দুলাই ইউনিয়নের বিন্যাডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবনের দুইটি কক্ষের দরজার ওপরের ঢালাই ভাঙিয়া বাঁশের লাঠি বাহির হইয়া আসে। এইসকল খবরে সেইসময় শোরগোল তুলিয়াছিল। সরকারি বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেই সাধারণত এই ধরনের ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এই কারণেই সরকারি বিভিন্ন ভবন, ব্রিজ-কালভার্ট, রাস্তাঘাট ইত্যাদি নির্মাণাধীন অবস্থায় কিংবা উদ্বোধনের অল্প কিছুদিন পর তাহা ধসিয়া পড়িবার অসংখ্য নজির রহিয়াছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা ক্ষমতাসীন দলের একশ্রেণির নেতার আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ায় এবং তাহাদের সহিত সংশিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশ থাকায় এই ধরনের পুকুর চুরির ঘটনা ঘটিবার সুযোগ পায়। সকল সরকারের আমলেই কমবেশি এই ধরনের দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হইয়াছে।
গত এক দশকে সরকার ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করিয়াছে, যাহা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতেছে। আমরা মনে করি, এই ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ টেকসই করিতে নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের প্রতি নজরদারি বৃদ্ধি ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।
