চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ছে। বিশ্বের অনেকগুলো দেশ ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। যদিও তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এগিয়ে চলেছে দূর্বার গতিতে, বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হলে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য আমাদের দ্রুত প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সমপ্রতি এ বিষয়ে কথা হয় বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস) এর সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীরের সঙ্গে।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ। বাংলাদেশর এ বিষয়ে প্রস্তুতি প্রয়োজন। এ বিষয়ে বেসিস সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর বলেন, ‘আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব এর কার্যক্রম শুরু হয়ে যাবে। এ বিষয়ে যথাযথ প্রস্তুতি গ্রহণ করা না হলে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের দক্ষ লোকবলকে কাজে লাগানো সম্ভব হবে না। কারণ, লোকবলের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে প্রযুক্তি। যেমন ধরুন- সারাবিশ্বে তৈরি পোশাক খাতে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। এই অবস্থানে থাকার অন্যতম কারণ হলো- আমাদের জনসংখ্যা বেশি এবং কম পারিশ্রমিকে এখানে শ্রমিক পাওয়া যায়। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব শুরু হলে বিভিন্ন শিল্প কারখানায় যে কাজগুলো শ্রমিকরা করে, তা তখন রোবট করবে। অর্থাত্ বেশ কয়েকজন প্রমিকের কাজ একটি মাত্র রোবট দিয়ে করানো সম্ভব হবে।’
তিনি আরো বলেন,‘ দেশের গার্মেন্টস শিল্পে ৫০ লক্ষ শ্রমিক কাজ করে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে এই শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বে। কারণ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে রোবটিক মেশিন-এর ব্যবহার বাড়বে। দেশের পোশাক খাতের শ্রমিকরা দুইটি কারণে চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এক. আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের মালিকরা রোবটিক মেশিন কিনে স্থাপন করবেন। দুই. যেসব ক্রেতারা আমাদের দেশে পোশাক তৈরির জন্য অর্ডার দেন, তারা নিজেরাই রোবটিক মেশিন কিনে স্থাপন করবেন এবং পোশাক তৈরির কাজ শুরু করে দিবেন। এই দুইটি প্রক্রিয়ার যেকোনো একটি হলেও আমাদের দেশের দক্ষ জনশক্তি বেকারে পরিণত হতে পারে।’
বাংলাদেশ সস্তা লেবারের দেশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী যে ব্র্যান্ডিং রয়েছে সেটিকে রূপান্তর করে আমাদের দেশের শ্রমিকদের দক্ষ শ্রমিকে পরিনত করতে হবে। শস্তা লেবারের দেশ থেকে দক্ষ লেবারের দেশে পরিনত হতে হবে। রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্র্যান্ডিং-এর ক্ষেত্রে দক্ষ লোকবলের বিষয়টি বেশি প্রাধান্য দিতে হবে বলেও জানান আলমাস কবীর।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য আমাদের প্রস্তুতির প্রসঙ্গে বেসিস সভাপতি বলেন,‘সময় নষ্ট না করে এখন থেকেই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। বিভিন্ন শিল্প কারখানায় যে রোবটগুলো ব্যবহার করা হবে ওগুলোকে প্রোগ্রাম করে দিতে হবে। যেহেতু আমাদের লোববল চাকরির ঝুঁকিতে পড়তে পারার আশঙ্কা রয়েছে তাই বিকল্প চিন্তা করার সময় এখনই। এজন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কীভাবে রোবট বানাতে হয়, কীভাবে রোবটে প্রোগ্রাম করতে হয়, কীভাবে রোবটের যান্ত্রিক ত্রুটি দূর করতে হয়, তা জানতে হবে আমাদের দেশের দক্ষ জনশক্তিকে। ’
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের অন্যতম হাতিয়ার রোবটিকস। এখন থেকে এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিতে শুরু করলে আগামীতে এই খাতে চাকরির বাজারে ঝুঁকি থাকবে না। এ বিষয়ে আলমাস কবীর বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের বিষয়টি গুরুত্ব পেলে আগামী চার বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দেশে প্রচুর দক্ষ লোকবল তৈরি হবে। বতর্মানে আমরা তৈরি পোশাক রপ্তানি করি, আমাদের প্রস্তুতি ঠিকঠাক থাকলে আগামীতে আমরা পোশাক তৈরির রোবট এবং রোবটিক্স সফটওয়্যার রপ্তানি করবো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।’
‘চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে রোবটিক মেশিনের ব্যবহার বাড়লে যেমন সস্তার শ্রমিকরা যেমন কর্মসংস্থান হারাবে ঠিক তেমনি বাড়বে ক্রিয়েটিভ থিংকিং এর চাহিদা। বর্তমানে আমরা বিদেশিদের চাহিদা অনুযায়ী তাদের দেয়া অর্ডারে পোশাক তৈরি করে দিচ্ছি। এগুলোর ডিজাইন থেকে শুরু করে সব কিছুই তারা আমাদের দেয়, আমরা শুধু তৈরির কাজটি করে থাকি। আমরা যদি ডিজাইন ক্রিয়েট করতে পারতাম বা নতুন নতুন পণ্য তাদের কাছে দিতে পারতাম তাহলে এই খাতের অবস্থান আরো উচুঁতে অবস্থান করতো। ক্রিয়েটিভ থিংকিং এর কাজ রোবট দিয়ে হবে না। এই কাজ মানুষকেই করতে হবে।’ বলছিলেন আলমাস কবীর।
তিনি শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল বিষয়গুলোকে অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়ে জোর দিয়ে বলেন,‘আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় সৃজনশীল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। যেভাবেই হোক, আমাদের ইনোভেটিভ জাতিতে পরিনত হতে হবে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যে স্রোত তা মোকাবিলা করতে হলে এর বিকল্প নেই।’
সাক্ষাত্কারটি নিয়েছেন মাহবুব শরীফ
