গ্যাসের দাম বৃদ্ধি কতটা যৌক্তিক?

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৯, ২১:৫৮

সমপ্রতি গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলি আবারও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করিয়াছে। নূতন এই প্রস্তাবে সব শ্রেণির গ্যাসের দাম গড়ে ১০২ শতাংশ বাড়ানোর দাবি উত্থাপিত হইয়াছে। ইহার মধ্যে সবচাইতে বেশি মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব করা হইয়াছে সার  ও বিদ্যুত্ খাতে। বিদ্যুত্ খাতে ২০৮ শতাংশ বাড়াইয়া প্রতি ঘনমিটার ৩ টাকা ১৬ পয়সা হইতে ৯ টাকা ৭৪ পয়সা ও সারের ক্ষেত্রে ২১১ শতাংশ বাড়াইয়া প্রতি ঘনমিটার ২ টাকা ৭১ পয়সা হইতে ৮ টাকা ৪৪ পয়সা করিবার প্রস্তাব করা হইয়াছে। ইহাছাড়া ক্যাপটিভ পাওয়ারের ক্ষেত্রে ৯৬, শিল্পখাতে ১৩২ ও বাণিজ্যিক খাতে ৪১ শতাংশ দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হইয়াছে। যদিও ইহা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নহে, তথাপি ইহা লইয়া ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় উঠিয়াছে। তাহারা ঘন ঘন দাম বৃদ্ধি (১০ বত্সরে ৬ বার), গ্যাসে ১৫ হাজার কোটি টাকার করছাড় দেওয়ার পরও দাম বৃদ্ধি ইত্যাদিকে অযৌক্তিক হিসাবে বিবেচনা করিতেছেন। আবার কেহ কেহ বলিতেছেন, গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলি সব সময় প্রয়োজনের চাহিতে বেশি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করে। ইহাতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।

এদিকে গণশুনানি চলাকালে ভোক্তা প্রতিনিধিরা যেসব অভিযোগ করিয়াছেন তাহা কোনো অংশে কম গুরুতর নহে। তাহাদের  অভিযোগ হইল— গ্যাস বিতরণ কোম্পানিগুলি প্রায় সবাই লাভ করিতেছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বত্সরে কয়েক দফা বোনাস নিতেছে। ডিভিডেন্ড দিতেছে কোম্পানিগুলি। আন্তর্জাতিক বাজারও অস্থিতিশীল নহে। তাহার পরও গ্যাসের দাম বাড়িবে কেন? এইক্ষেত্রে নানা অনিয়ম তো বন্ধ হইতেছে না। এভাবে দাম বাড়ানো হইলে শিল্পখাত নূতন করিয়া চাপে পড়িবে। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়া তাহার মূল্য দিতে হইবে সাধারণ মানুষকে। সবচাইতে বড় যে প্রশ্ন দেখা দিয়াছে তাহা হইল, মানসম্মত গ্যাসের সরবরাহ না পাইলে ভোক্তারা কেন বাড়তি দাম দিবেন? দাম বৃদ্ধির পরও যদি নিয়মিত গ্যাস না দেওয়া হয় বা গ্যাসের প্রেসার কম থাকে, তাহলে তাহাতে ব্যবসা-বাণিজ্যর অপূরণীয় ক্ষতি হয়। আমাদের কারখানাগুলিতে বিভিন্ন শিফটে শ্রমিকরা কাজ করিয়া থাকেন। গ্যাসের চাপের স্বল্পতা বা গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকিলে তাহাদের একটি শিফট পুরাপুরি বন্ধ থাকে। ইহাতে উত্পাদন বিঘ্নিত হইবার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টার অপচয় হয়। অথচ তাহাদের বেতনভাতা ঠিকই দিতে হয়। তাহাছাড়া এইরূপ পরিস্থিতিতে অনেক সময় কারখানার মূল্যবান যন্ত্রপাতিও নষ্ট হয়। ব্যবসায়ীদের সার্বিকভাবে লোকসানের মুখে পড়িতে হয়। উদ্যোক্তারা বাজারমূল্যের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া গ্যাসের মূল্য পরিশোধ করিতে চান বটে, কিন্তু নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না করিয়া তাহাদের নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা অনুচিত। এই ক্ষতি অবশ্যই পোষাইয়া দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। আবাসিক খাতে মিটারযুক্ত গ্রাহকরা প্রতি মাসে বিল দিতেছেন ৩০০-৪০০ টাকা। অথচ মিটারবিহীন গ্রাহকরা দিতেছেন ৭০০ হইতে ৮০০ টাকা। এই অবিচার কেন? কেন সকল গ্রাহককে মিটারের আওতায় আনা হইতেছে না? এলএনজি আমদানির  পরিপ্রেক্ষিতে  সমন্বয়ের  জন্য গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কথা বলা হইতেছে। তবে এই দাম বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করিয়া যাহারা অযৌক্তিকভাবে জনমনে হতাশা ও ক্ষোভ উসকাইয়া দিতে চাহে, তাহাদের ব্যাপারে সরকারকে অবশ্যই সচেতন হইতে হইবে।