ইস্টার্ন রিফাইনারির (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে আর্থিক সহায়তাসহ নির্মাতা হিসাবে কাজ করতে চায় চীনের উহুয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি। ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকার এ প্রকল্পে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাণিজ্য ঋণ হিসাবে আর্থিক সহায়তা দিতে দেশটির সরকারের অনুমতিও পেয়েছে তারা। তবে ঠিকাদার হিসাবে প্রাথমিকভাবে মনোনীত ফ্রান্সের টেকনিপের মাধ্যমে একটি বহুজাতিক ব্যাংক ও তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই প্রকল্পটিতে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে চাইছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
জ্বালানি বিভাগ ও বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ইস্টার্ন রিফাইনারি দ্বিতীয় ইউনিটটি স্থাপনের জন্য গত বছরের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠান টেকনিপ জিওপ্রডাকশনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। ডিসেম্বরে কারিগরি ও আর্থিক প্রস্তাবনা জমা দেয় টেকনিপ। প্রাথমিকভাবে তারা প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ৬০ কোটি ডলার (প্রায় ৪ হাজার ৭১০ কোটি টাকা) বাংলাদেশকে ঋণ হিসাবে দিতে সম্মত হয়। একই সঙ্গে বিভিন্ন আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে বাকি টাকা সংগ্রহে সহযোগিতা করার নিশ্চয়তা দেয়। কিন্তু গত মার্চের শুরুর দিকে তারা এ প্রস্তাব থেকে সরে আসে। ইপিসি (প্রকৌশল, আহরণ ও নির্মাণ) ঠিকাদার হিসাবে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করে টেকনিপ।
এ অবস্থায় গত ১৫ মার্চ দেশের দ্বিতীয় তেল শোধনাগার ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) চিঠি দেয় জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।
চিঠিতে বলা হয়, খসড়া ডিপিপি অনুযায়ী প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য বিশ্বব্যাংক, ইউরোপিয়ান ব্যাংক কিংবা অন্য কোনো ইসিএ’র (এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সি) সঙ্গে যোগাযোগ করে অর্থায়নের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করা হলো। পরিপ্রেক্ষিতে গত ৫ এপ্রিল ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পে ইপিসি ভিত্তিতে অর্থায়নের প্রস্তাব দেয় চীনা প্রতিষ্ঠান উহুয়ান ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি।
ইআরডি’র জ্যেষ্ঠ সচিবের কাছে লেখা চিঠিতে উহুয়ান ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহ-প্রধান অর্থনীতিবিদ লিউ জিয়ামিং বলেন, চীন সরকার আমাদেরকে ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিটে আর্থিক সহায়তা দেয়ার অনুমতি দিয়েছে। এ ব্যাপারে আপনারা আগ্রহী হলে বিষয়টি চূড়ান্তকরণের লক্ষ্যে আলোচনার জন্য আমাদের প্রতিনিধি পাঠাব। ইআরডি সূত্র জানায়, তারা চীনা কোম্পানির প্রস্তাবটি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে এবং বিপিসিতে পাঠিয়েছে।
তবে বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কেউ চীনা প্রস্তাবটি পেয়েছেন বলে স্বীকার করেননি। করপোরেশনের শীর্ষ স্থানীয় এক কর্মকর্তা বলেন, ইআরডিতে চিঠি দেয়ার পাশাপাশি টেকনিপের মাধ্যমে অর্থায়নকারী বা তহবিল সংগ্রহকারী খুঁজছিল বিপিসি। এরই মধ্যে টেকনিপের মধ্যস্থতায় এইচএসবিসি ব্যাংক এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সাথে আলোচনা চলছিল। সর্বশেষ গত বুধবার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সব মিলিয়ে ইআরএল-২ নির্মাণে টেকনিপের সাথে ইপিসি চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তাদের মাধ্যমে অর্থায়নকারীও পাওয়া যাচ্ছে। তাই এ মুহূর্তে চীনের প্রস্তাব বা অন্য কোনো বিষয়কে আর বিবেচনা করা হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে বিপিসির পরিচালক (পরিচালন ও পরিকল্পনা) মোসলেহ উদ্দিন বলেন, সম্প্রতি অর্থায়নের ব্যাপারে চীনের কোনো কোম্পানির প্রস্তাব পাইনি। ইসিএ ভিত্তিতে অর্থ সহায়তা নিতে দুটি বহুজাতিক ব্যাংকের সাথে আলোচনা চলছে। তাদের শর্তগুলো আমরা যাচাই করছি। শিগগিরই যে কোনো একটিকে বেছে নেয়া হবে।
এদিকে ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণ প্রকল্পের জন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডকে (ইআইএল) পরামর্শক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। এ জন্য ১১০ কোটি ৬১ লাখ টাকা পাবে ইআইএল। দরপত্র ছাড়া অযাচিত লেনদেনের মাধ্যমে এ নিয়োগ দিচ্ছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আগামী সোমবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে এ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হবে। মঙ্গলবার চট্টগ্রামে বিপিসির কার্যালয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে। ভারতের তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস প্রতিমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং বাংলাদেশের বিদ্যুত্, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর এমওইউ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিটটি নির্মিত হলে দেশে তেল পরিশোধনের ক্ষমতা তিন গুণ বেড়ে বার্ষিক ৪৫ লাখ টনে দাঁড়াবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিবছর দেড় হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করতে পারবে বাংলাদেশ। ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের পর বিপিসি বছরে মাত্র ১০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করবে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার টন পরিশোধিত ও ক্রুড তেল আমদানি করে। এতে খরচ হয় ২৬ হাজার ৯৪০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
