ভোট কেন্দ্র দখল, ভোট জালিয়াতি ও নির্বাচন বর্জনের মধ্য দিয়ে শনিবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জের সদর উপজেলার ৬টি ইউনিয়নে। এবার ইউপি নির্বাচনে দেখা গেছে ভোট জালিয়াতির নতুন পন্থা। ভোটকেন্দ্রের বাইরে লোক দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, যারা সাংবাদিক বা ম্যাজিস্ট্রেট আসলে দ্রুত ভেতরে গিয়ে খবর জানিয়ে দেয়। এতে সাংবাদিকরা কেন্দ্রে ঢোকার আগেই দুষ্কর্ম সেরে বীরদর্পে বের হয়ে যায় জাল ভোট প্রদানকারীরা। এছাড়া এবার নির্বাচনে ‘পর্যবেক্ষক’ লেখা গাড়িতে করে এসে ভোট কেন্দ্র দখলের ঘটনাও ঘটেছে। তবে বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও সদর উপজেলার ১৩৬টি কেন্দ্রের কোনোটিতেই ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়নি।
এবার নির্বাচনে ফতুল্লা থানার এনায়েতনগর ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি ভোট জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। এ ইউনিয়নের একাধিক ভোটকেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, কেন্দ্রগুলোতে আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো দলের পোলিং এজেন্ট নেই। ভোটারও তেমন নেই। গতকাল সকাল এগারোটার আগে এনায়েতনগর ইউনিয়নের হরিহর পাড়া স্কুল কেন্দ্রে হঠাত্ করে চ-১৩-৬৭২৯ নম্বরের একটি নোয়া গাড়ি এসে থামে। গাড়িতে ‘পর্যবেক্ষক’ লেখা স্টিকার ছিল। গাড়ি থেকে ৬/৭জন অপরিচিত যুবক কেন্দ্রে প্রবেশ করে নৌকা মার্কার সিল মারে। পরে তারা পঞ্চবটি মোড়ে মুজাফফর এন্ড সন্সে গিয়ে টেলিফোনে অপর প্রান্তের কাউকে ‘বস্ কাম শেষ’ বলে আশ্বাস দিতে থাকে। বেলা সোয়া একটার দিকে ফের এ কেন্দ্রে চলে ভোট জালিয়াতি। এ সময় ভোট কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো ভোটার নেই। এ প্রতিবেদক কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকতেই দুই/তিন জন দৌড়ে গিয়ে কেন্দ্র দখলদারদের সতর্ক করে দেয়। এতে তারা দ্রুত সিল মারা শেষ করে বের হয়ে যায়। যেতে যেতে সদর্পে বলতে থাকে ‘কাম শেষ’ । হরিহর পাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের (দুই কেন্দ্র) একজন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ভয় দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার নেয়া হয়েছে। এ কেন্দ্রে বেশিরভাগই জালভোট হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে ভোট কেন্দ্র দখল করে জাল ভোট দেয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বিক্ষুব্ধ বিএনপি সমর্থকরা শ্লোগান দিতে থাকলে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও পুলিশ তাদেরকে ধাওয়া দিয়ে কেন্দ্রের কাছ থেকে সরিয়ে দেয়। এসময় বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে র্যাব এসে পরিস্থিতি শান্ত করে। ঘটনার পর এনায়েতনগর ইউনিয়নের বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী এডভোকেট এস এম মাহমুদুল ইসলাম আলমগীর ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, নিজের ভোটই আমি দিতে পারলাম না। আমার ভোট নৌকা মার্কায় দেয়া হয়ে গেছে। পুরো ভোট কেন্দ্রই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দখল করে ভোট দিচ্ছে। তাই নির্বাচন বর্জন করলাম। এ প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলার মেজিস্ট্র্যাট নাহিদা বারিক জানান, এই কেন্দ্রে ভোট জালিয়াতির অভিযোগ পেয়ে ভোটের পরিবেশ তৈরি করতে যারা ভোটার নয় তাদেরকে ভোটকেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিয়েছি। এ ঘটনায় খোকন নামে একজনকে আটক করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। ঘটনার পর ভোটকেন্দ্রে আর ভোটারদেরকে আসতে দেখা যায়নি। এসময় নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি শাফায়াত আলম সানী এবং সেক্রেটারি মিজানুর রহমান সুজনের নেতৃত্বে ভোটকেন্দ্রে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মহড়া দিতে দেখা যায়। আর মহানগর ছাত্রলীগের আহবায়ক হাবিবুর রহমান রিয়াদকে কেন্দ্রের ভেতরে বিভিন্ন কক্ষে ঢুকে ভোট তদারকি করতে দেখা যায়। এসময় ভোটার নয় এমন কয়েকজন বারবার ভোটকক্ষে প্রবেশ করায় ম্যাজিস্ট্রেট তাদেরকে ভর্ত্সনা করেন।
বেলা আড়াইটার দিকে এনায়েতনগরের মাসদাইর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ভেতরে ঢুকতেই দেখা যায়, আওয়ামী লীগ প্রার্থীর দুইজন কার্ডধারী লোক ‘কাম শেষ’ বলতে বলতে সহাস্যে বের হচ্ছেন। আর ভোটকেন্দ্রের বাইরে অনেকেই ভোট দিতে পারেননি এমন অভিযোগ করছেন। এ ভোট কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার সৈয়দ মাজহারুল হক বলেন, এ কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টদের নিজেদের মধ্যে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। বিষয়টি সমাধান করা হয়েছে। এখন শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে।
সদর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে যে ৬টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে বিএনপির প্রার্থী ছিল একটি ইউনিয়নেই (এনায়েতনগর)। অন্য ইউনিয়নগুলোর মধ্যে কুতুবপুর ইউনিয়নের মামুদপুর সরকারি প্রাইমারি উচ্চ বিদ্যালয়, হাজী পান্দে আলী উচ্চ বিদ্যালয়, হাজী মিছির আলী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভুইঘর দারুচ্ছুন্নাহ ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসায় শান্তিপূর্ণভাবেই ভোট গ্রহণ চলতে দেখা গেছে। এছাড়া গোগনগর ও বক্তাবলী ইউনিয়নের একাধিক ভোটকেন্দ্রে ঘুরে দেখা গেছে, ভোটারদের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে কম। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন নারী ভোটার। আর বক্তাবলী ইউনিয়নে দুই মেম্বার পদপ্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
