মাদক, অস্ত্র উদ্ধার, জঙ্গি দমন অভিযান আরো গতিশীল করতে পুলিশের বরাদ্দকৃত সোর্সমানি (অপারেশনের বরাদ্দকৃত) খরচ জবাবদিহিতার মধ্যে আনা হচ্ছে। এর আগে বরাদ্দকৃত সোর্সমানি দেওয়া হতো জেলা পুলিশ সুপারদের (এসপি) বা ডিসির (উপ-কমিশনার) নামে। এসপি বা ডিসির মাধ্যমেই এ টাকা বন্টন হতো। চলতি মাস থেকে এ টাকা বরাদ্দ দেওয়া শুরু হয়েছে ইউনিট প্রধান, থানা, ফাঁড়ির দায়িত্বরত কর্মকর্তার নামে। বিষয়টি নিশ্চত করেছেন পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (অপারেশন) আনোয়ার হোসেন। তবে সোর্সমানি বলতে নারাজ পুলিশের এ কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, এটা অপারেশন (অভিযান) মানি।
সূত্র জানায়, ছোট জেলার জন্য সোর্সমানি বরাদ্দ ৮ লাখ থেকে ১০ টাকা। বড় জেলার জন্য ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা। সোর্সমানি বন্টনের এ নতুন নিয়ম নিয়ে পরস্পর বিরোধী অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে পুলিশ সুপাররা কিছুটা নাখোশ হলেও মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তারা বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছে।
পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, সোর্সমানি বরাদ্দ নিয়ে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে একটা চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছিল। কারণ অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো জেলার পুলিশ সুপার বরাদ্দকৃত সোর্সমানির টাকা নিজের মতো করেই খরচ করতেন অথবা গোটাটাই পকেটে পুরতেন।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও এ নিয়ে আলোচনা হয়। দাবি তোলা হয় অপারেশনের সঙ্গে জড়িত তাদের নামেই সোর্সমানি বরাদ্দ হোক। এ দাবির প্রেক্ষিতেই মহাপুলিশ পরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী অপারেশনের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের নামেই সোর্সমানি বরাদ্দের নির্দেশ প্রদান করেন। আইজিপির নির্দেশের পরই চলতি মাস থেকে নতুন নিয়মে বরাদ্দ শুরু হয়েছে।
সোর্স কারা ? এ ব্যাপারে ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক ডিসিডিবি (উপ-কমিশনার) সৈয়দ বজলুল করিম বলেন, ছিঁচকে ছিঁচকে চোর থেকে যৌনকর্মী বা রাজনৈতিক দলের সাধারণ কর্মী, ছোটখাট অপরাধ করে ধরা পড়া দুষ্কৃতকারী, জেল থেকে বের হওয়া দাগী অপরাধী এমন লোককেই পুলিশ সোর্স হিসেবে ব্যবহার করে। আর সোর্সরা তো বিনাপয়সায় তথ্য প্রদান করে না। তাদেরকে নিয়মিত মাসোয়ারা দিতে হয়। আর এই মাসোহারাটাই সোর্সমানি হিসেবে পরিচিত। তবে পুলিশ সদর দফতর থেকে সোর্সের জন্য যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়, সেখানে অপারেশন মানি হিসেবে উল্লেখ থাকে। পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা আরও বলেন, টাকার বিনিময়ে সোর্সের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি স্বীকৃত পন্থা। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধীদের গ্রেফতারে এই পদ্ধতি প্রচলিত আছে।
অপর দিকে মাঠ পর্যায়ের একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আগে পুলিশের সোর্সমানি সরাসরি বরাদ্দ দেওয়া হতো পুলিশ সুপারের নামে। কিন্তু অনেক পুলিশ সুপার তার ইচ্ছামাফিক এটি খরচ করতেন। আবার অনেক সময় সামান্য কিছু খরচ করে বাকিটা নিজের পকেটে পুরতেন। কিন্তু অপারেশনের সঙ্গে সরাসরি জড়িতরা পেতেন না। বর্তমানে সোর্সমানি বন্টনের নীতিমালা হওয়ার কারণে অপরাধী গ্রেফতার বা আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে গতি বাড়বে। এ কর্মকর্তা পুলিশ সদর দফতরের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।
তবে পুলিশের সোর্সমানি বন্টনের এ নতুন নিয়মের ব্যাপারে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন পুলিশ সুপার। তারা বলেছেন, ফাঁড়ির যিনি প্রধান তিনি সরাসরি সোর্সমানির বরাদ্দ পাবেন। কিন্তু বর্তমানে অনেক থানায় রয়েছে চারজন করে পুলিশ পরিদর্শক। তাদের মধ্যে বরাদ্দ পাচ্ছেন যিনি থানার ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে দায়িত্বে আছেন। ফলে সোর্সমানি বরাদ্দ নিয়ে বাকি তিনজনের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে।
সোর্সমানি বন্টনের ব্যাপারে পুলিশ সদর দফতরের ডিআইজি (অপারেশন) আনোয়ার হোসেন বলেন, আগে পুলিশ সুপারের নামে অপারেশনের জন্য (সোর্সমানি) বরাদ্দ টাকা প্রদান করা হতো। চলতি মাস থেকে ভাগ ভাগ করে এ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, থানার ওসি, ফাঁড়ি বা পুলিশ বক্সের প্রধানের নামে। তিনি বলেন, যার নামে এ অপারেশনের টাকা বরাদ্দ হবে তিনি এর খরচ হিসেব প্রদান করবেন। এক প্রশ্নের জবাবে পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, অপারেশন মানি খরচ জবাবদিহিতার মধ্যে আনার ফলে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ আরো গতিশীল হবে। তিনি আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
