মাছের প্রজননকাল চৈত্র-বৈশাখ মাসে পুকুর-জলাশয় সেচ করে ডিমওয়ালা মাছসহ সকল মাছ শিকারের মহোত্সব চলছে দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে। এর ফলে দিনে দিনে মাছের দেশ হিসাবে পরিচিত বরিশালে দেশি মাছের সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। পানিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও জলাশায়-পুকুর ভরাট করার কারণে একের পর এক মাছের বংশ বিলুপ্ত হচ্ছে। দেশি প্রজাতির মাছ রক্ষায় ১৯৫০ সালে মত্স্য সম্পদ রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন করা হলেও এখন পর্যন্ত এর কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন আঞ্চলিক মত্স্য দপ্তর ও পরিবেশ দপ্তরের কর্মকর্তারা। ফলে হারাতে বসেছে দেশি প্রজাতির মাছ। প্রতিবছরের মতো এবারও দক্ষিণাঞ্চলের সর্বত্র শুকনো মৌসুম থাকায় একাধিক খাল, বিল, পুকুর, ডোবা-নালা সেচ করে ডিমওয়ালা মাছসহ বিভিন্ন প্রকারের মাছ শিকার চলছে। নগরীর যে সব পুকুর সেচ করে মাছ শিকার করা হয় সেগুলো আর অস্তিত্ব থাকে না। প্রভাবশালীরা পুকুর সেচ করে রাতারাতি তা ভরাট করে সেখানে তৈরি করেন মার্কেটসহ বাড়িঘর। হাউজিং কোম্পানির রমরমা ব্যবসায় এখন পুকুর ছাড়িয়ে কীর্তনখোলা নদী পর্যন্ত দখল হয়ে যাচ্ছে।
বিএম কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোঃ মতিয়ার রহমান ‘ইত্তেফাক’কে জানান, এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী ১০ বছর পর আর দেশি মাছ খুঁজে পাওয়া যাবে না। ভয়াল ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলায় দেশীয় ৬০ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এরপর লবণাক্ততা গ্রাস করছে দেশি প্রজাতির মাছকে। মত্স্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী এ বিভাগে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে দিঘি, পুকুর ও ডোবা রয়েছে ৮৬ হাজার ২শ। এর আয়তন সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর। ৯শ হেক্টরে লেক রয়েছে ৫টি। এ ছাড়া সাড়ে ১৫ হাজার হেক্টর জলাশয়ে দেশি ও ছোট প্রজাতির মাছ বিচরণ করে। ২০০৪-০৫ অর্থবছরে এসব জলাশয় থেকে ১৩ হাজার টন ছোট জাতের মাছ উত্পাদিত হয়েছে। ২০০৭-০৮ সালে উত্পাদন এসে দাঁড়ায় ৮ হাজার টনে। হঠাত্ করে দেশি জাতের মাছের উত্পাদন অর্ধেকে নেমে আসার ব্যাপারে মত্স্য বিশেজ্ঞরা জানান, সুপার সাইক্লোন সিডর ধ্বংস করে দিয়ে গেছে উপকূলের দেশি প্রজাতির মাছ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে পুকুর-খাল ভরাট করে যেভাবে বাড়ি-ঘর-ভবন নির্মাণ হচ্ছে তাতে দেশি মাছ নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। প্রাণিবিদরা জানান, ২৬০ প্রজাতির মিঠাপানির মাছের মধ্যে ৫৪ প্রজাতির অস্তিত্ব বিপন্ন। মত্স্য কর্মকর্তারা জানান, দেশি মত্স্যসম্পদকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে কয়েকটি জেলার পুকুরে বিজ্ঞানভিত্তিক মাছচাষের প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এতে করে বদ্ধ জলাশয়ে দেশি প্রজাতির ছোট মাছ বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। তবে চৈত্র-বৈশাখ মাসে পূর্ণবয়স্ক ডিমওয়ালা মাছ নিধন বন্ধ রাখতে হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের গ্রাম-গঞ্জের বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও দক্ষিণের নদ-নদী, খাল-বিল ও ডোবা-নালায় প্রচুর পরিমাণে দেশি প্রজাতির যেসব মাছ পাওয়া যেত তা এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। শুকনো মৌসুমে এ অঞ্চলের নদী-নালায় তেমন মাছ ধরা পড়ে না। ইলিশের দেখাই মেলে না। এ মৌসুমে জেলেরা বেকার হয়ে পড়েন। তখন পানি কম থাকায় খাল-বিল ও ডোবা-নালা থেকে প্রচুর পরিমাণে মাছ ধরে এ অঞ্চলের মানুষের চাহিদা পূরণ করা হতো। পুকুর, ডোবা ও জলাশয়ে পাওয়া যেত বিপুল পরিমাণ পুঁটি, টেংরা, মলা, মিহি, শিং, মাগুর, চাঁদা, ধুতরা, বাগদা চিংড়ি, বোয়াল, শোল, খাঁটি পুঁটি, পাবদা, আইড়, কালবাউশ, চিতল, কই, চেলা, কাজলী, সরপুঁটি, মলা, ইচা, খইলশা, চেউয়া মাছ। এখন তা ইতিহাস হয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে। খাল-বিল, ডোবা-নালা থেকে যেসব সুস্বাদু মাছ ধরা পড়ত তার এখন কোনো অস্তিত্ব নেই। ভেদা মাছ বিলুপ্ত হয়েছে প্রায় দু যুগ আগে। দেশি পুঁটির এখন দেখা পাওয়া যায় না। বড় সাইজের সেই শোল-গজার নেই বললেই চলে।
এক সময় যে দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ ট্রাক ভর্তি করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হতো এখন সেখানে মাছের চাহিদা পূরণ করতে প্রতিদিন ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মাছভর্তি ট্রাক আসছে। প্রতিদিন সকালে বরিশাল, ভূরঘাটা, মোস্তফাপুর-মাদারীপুর, গৌরনদী, টরকীসহ মহাসড়কের পাশে থামছে মাছভর্তি ট্রাক। সেখান থেকে পাইকারিভাবে চলে যাচ্ছে গ্রামগঞ্জের হাট-বাজারে।

