গরমে সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মি আপনার ত্বককে বিবর্ণ করে দিতে পারে। সেইসাথে এই রশ্মির প্রভাবে ত্বকের কোষগুলো মরে গিয়ে ত্বক হারিয়ে ফেলতে পারে তার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা। অনেকের ধারণা ত্বকের যত্ন শুধু শীতকালেই নিতে হয়। কিন্তু গরমেও আপনাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে ত্বকের যত্ন নেওয়া উচিত। তবেই আপনার ত্বক বার মাসই থাকবে সজীব। মিউনী’স ব্রাইডালের রূপ বিশেষজ্ঞ তানজিমা শারমিন মিউনীর সাথে কথা বলে গরমে ত্বকের যত্ন নিয়ে লিখেছেন নওশীন শর্মিলী
ত্বককে সজীব ও ন্যাচারাল রাখতে আজকাল ত্বকের ধরন, কারণ, আবহাওয়া, সময় পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবহারের উপযোগী অনেক ধরনের ময়েশ্চার বের হয়েছে। আধুনিক রূপচর্চায় ত্বকের ধরন, বয়স, প্রহর, মৌসুম, এমনকি উত্সবকে মাথায় রেখে কসমেটিকসের উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। এখন থেকে দুই যুগ আগেও যা কল্পনা করা যেত না। অতীতে মুখে লাগানোর জন্য দুই ধরনের ক্রিম বা লোশনের প্রচলন ছিল। একটি কোল্ডক্রিম অন্যটি স্নো বা ভ্যানিশিং ক্রিম। সকলেরই মনেপ্রাণে গাঁথা ছিল শীতকালে কোল্ডক্রিম ও গ্রীষ্মকাল বা গরমে ভ্যানিশিং ক্রিম বা স্নো। রূপ বিশেষজ্ঞ তানজিমা শারমিন মিউনীর মতে, ঋতুর গুরুত্বের চেয়ে ত্বকের প্রয়োজনীয়তাই বেশি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কেবলমাত্র শীতে ত্বকে শুষ্কতা অনুভব হবে, অন্য ঋতুতে স্বাভাবিক। তা কিন্তু নয়। ত্বককে সজীব ও উজ্জ্বল রাখতে কোল্ডক্রিম বা স্নো ছাড়াও রয়েছে—নারিশিং ক্রিম, ক্লিনজিং ক্রিম, অ্যাসট্রিনজেন্ট লোশন, ক্যালামাইন লোশন, ফাউন্ডেশন ক্রিম, ফেয়ারনেস ক্রিম, ডে-ক্রিম, নাইট ক্রিম, অ্যান্টি রিংকেল ক্রিম, সানব্লক ক্রিম ইত্যাদি। এছাড়া যাদের ত্বক স্পর্শকাতর তারা ব্যবহার করতে পারেন ভ্যাসলিন বা নরমাল লোশন। মোটকথা ত্বক কেবল নরম বা সফট রাখা প্রয়োজন। না হলে সহজেই আপনার ত্বকে এসে যেতে পারে রিংকেল বা বলিরেখা। বছরের সব ঋতুতেই ত্বকের সৌন্দর্য ও সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় ময়েশ্চারের ব্যবহার করতে হবে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন, গরমকালেও আপনি যখন ভালোভাবে ত্বক পরিষ্কার করছেন, তখন কি ত্বকে শুষ্কতা অনুভব করছেন না। গরমের সময় অনেককেই দীর্ঘক্ষণ এয়ারকন্ডিশনিং বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে থাকতে হয়। এ অবস্থায় আমার মনে হয় ত্বকে ময়েশ্চারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। রাতে যখন আমরা ঘুমাই, তখন ত্বক রিলাক্স থাকে এবং ত্বকে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক থাকে। ওই সময় ত্বকে ময়েশ্চার থাকলে তা ত্বক সহজেই শোষণ করতে পারে। মনে রাখতে হবে, ত্বকে ময়েশ্চারের ব্যালেন্স ঠিক থাকলে আপনার ত্বকে সহজে রিংকেল আসতে পারবে না।
ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারের ব্যবহার
IMG0
স্বাভাবিক ও শুষ্ক ত্বক
ময়েশ্চার-সমৃদ্ধ ক্রিম, লোশন বা ভ্যাসলিন দিয়ে ম্যাসাজ করুন ত্বক। রাতে ভ্যাসলিন বা লোশন দিয়ে আপওয়ার্ড ও আউটওয়ার্ড স্ট্রোকে ম্যাসাজ করতে পারেন। চোখের তলায় অনামিকা দিয়ে ম্যাসাজ করুন। তারপর ভেজা তুলা দিয়ে মুছে ফেলুন। ত্বক শুষ্ক প্রকৃতির হলে ক্রিম লাগানোর পর হালকা ময়েশ্চারাইজিং লোশন এ গরমেও লাগতে পারেন। আবহাওয়া প্রয়োজন নয়, গুরুত্ব দিন আপনার ত্বকের প্রয়োজনকে। তবে রিংকেল এড়াতে চোখের ওপরে বা চারপাশের ত্বকে বেশি করে ক্রিম লাগিয়ে শুয়ে পড়বেন না যেন। এতে চোখের কোল ফুলে যাবে। কেননা চোখের চারপাশের ত্বক অনেক সফট।
তৈলাক্ত ও মিশ্র প্রকৃতির ত্বক
তৈলাক্ত ও মিশ্র ত্বকে নারিশিং ক্রিম ব্যবহার না করে রাতে ঘুমানোর আগে ভালোভাবে ত্বক পরিষ্কার করে ভ্যাসলিন লাগাতে পারেন। দিনের অন্য সময় যদি প্রয়োজন পড়ে তাহলে হালকা লোশন ব্যবহার করতে পারেন আপনার ত্বকে। এ গরমে মিশ্র প্রকৃতির ত্বকের শুষ্ক অংশে হালকা লোশন লাগিয়ে নিন।
হাত-পা ও ঠোঁটের যত্নে
রাতে শুতে যাওয়ার আগে নখের ওপর হালকা ভ্যাসলিন ম্যাসাজ করুন। এতে আপনার নখ মসৃণ থাকবে। নখের কিউটিকল ড্যামেজ হলে আমন্ড অয়েলের সাথে ভ্যাসলিন মিশিয়ে ম্যাসাজ করুন। হাতের তালু বা পায়ের পাতা রুক্ষ হলে পেট্রোলিয়াম জেলি, ভ্যাসলিন বা কোকেয়া বাটার দিয়ে ম্যাসাজ করবেন। নরম ভেজা কাপড় দিয়ে ঠোঁট পরিষ্কার করে ঘষুন। তারপর পেট্রোলিয়াম জেলি, ভ্যাসলিন বা চ্যাপিস্টিক লাগান।
IMG1
রূপ বিশেষজ্ঞ তানজিমা শারমিন মিউনী বলেন, শুষ্ক প্রকৃতির ত্বকে সহজেই বয়সের ছাপ পড়ে। বয়সের ছাপ রুখতে ক্রিম ও ময়েশ্চার ব্যবহার জরুরি। তাই অন্তত রাতে ঘুমানোর আগে ত্বক পরিষ্কার করে নাইট ক্রিম বা ভ্যাসলিন লাগিয়ে নিন। ভ্যাসলিন ক্রিমের ইনস্টিটিউট ধরে রাখে এবং ত্বকের স্বাভাবিক কার্যকলাপে সাহায্য করে। ভিটামিন ‘ই’ বা রেটিনাল সমৃদ্ধ নাইট ক্রিমও লাগতে পারেন। তার মতে, ঋতু বৈচিত্র্যের কারণে আবহাওয়ার আর্দ্রতার বৈষম্য ঘটে। কিন্তু ত্বকের জন্য প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত আর্দ্রতা। ভ্যানিশিং ক্রিমের কাজ হলো ত্বকের আর্দ্রতার ভারসাম্য ধরে রাখা। যাদের মুখমণ্ডল অতিদ্রুত তৈলাক্ত হয়ে ওঠে তারা সাধাণত এই স্নো ব্যবহার করুন। এর উপাদানগুলো হলো—টেফরিক অ্যাসিড, পটাশিয়াম, হাইড্রোঅক্সাইড, গ্লিসারিন, ডি-গ্লাইকোল স্টেয়ারেট ও মিনারেল ওয়াটার। লোশন বা ক্রিমে যে উপাদানগুলো থাকে, তা হলো—আমন্ড অয়েল, কেরাকস্ পাউডার, রোজ ওয়াটার ও সুগন্ধি। তানজিমা শারমিন মিউনী আরও বলেন, ভ্যাসলিন বা লোশন ত্বকের চাহিদা অনুযায়ী এ গরমেও ব্যবহার করতে পারেন প্রয়োজন ও পরিমাপ ঠিক রেখে। রাতে ভ্যাসলিনের ব্যবহার আপনার ত্বকের যাবতীয় সমস্যার সমাধান করতে পারে। আর বাচ্চাদের জন্য ব্র্যান্ডেড লোশনই ভালো। আর বাইরে বেরোনোর সময় মনে করে ব্যাগে ওয়েট টিস্যু, সানস্ক্রিন লোশন ও ক্লিনজার নিন। আর বাড়ির সদর দরজা থেকে বের হয়ে মাথার ওপর মেলে ধরুন রঙিন ছাতা। একটু কষ্ট হলেও কী আর করা, সুন্দর থাকার জন্য এটুকু কষ্ট তো করতেই হবে।
