তিনটি বিষয় সামনে রেখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ.এফ.এম. রেজাউল করিম সিদ্দিকী মুকুল হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করছে পুলিশ। এগুলো হল: রেজাউল করিমের সংস্কৃতিমনা মানসিকতায় কেউ ক্ষুব্ধ ছিলেন কিনা, শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় ধর্ম নিয়ে কোনো বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাকে হত্যা করা হয়েছে কিনা এবং কারো সঙ্গে তার শত্রুতা ছিল কিনা। এরমধ্যে প্রথম দু’টিকেই আপাতত বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। যদিও এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো তথ্য-প্রমাণাদি সংগ্রহ করতে পারেনি পুলিশ।
এদিকে, গতকাল বুধবার মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. শামসুদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, হত্যাকাণ্ডে তিন জন অংশ নেয়। এরা একটি মোটরসাইকেলে করে এসেছিল। অন্যদিকে, প্রখর রোদ উপেক্ষা করে শিক্ষক হত্যার বিচার দাবিতে শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলন চলছেই। উত্তাল হয়ে উঠেছে ক্যাম্পাস। গতকাল বেলা পৌনে ১১টার দিকে ফের ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করেছে বিক্ষুব্ধ কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। আধাঘণ্টা তারা ওই সড়কে অবস্থান নিলে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী একজনের বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার বলেন, তিনজন একটি মোটরসাইকেলযোগে এসে অধ্যাপক রেজাউলকে কুপিয়ে হত্যা করে। এর মধ্যে দু’জন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। অপরজন মোটরসাইকেলেই ছিল। নিজ বাসা এবং মহাসড়ক থেকে আনুমানিক ২০ গজ দূরেই গলিপথের মধ্যে খুন করা হয় অধ্যাপক রেজাউলকে। হত্যার পরে খুনিরা দ্রুত মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়।
তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার ভোরে বাগমারা থেকে আটক গোপালপুর মাদরাসার শিক্ষক মুনসুর রহমানকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। তবে অধ্যাপকের নিজ গ্রাম দরগামাড়িয়া গ্রামের দক্ষিণপাড়া মধ্যপাড়া হাফেজিয়া ফোরকানিয়া মাদরাসার শিক্ষক ও মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা রায়হানকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে বলেও জানান পুলিশ কমিশনার।
মহানগর পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, বাগমারায় এক সময় জেএমবি ক্যাডারদের অবাধ বিচরণ ছিল। ২০০৪ সালে বাগমারায় জেএমবি ক্যাডারদের উত্থান হলে ওই এলাকাটির অনেকেই তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরপর বাংলা ভাই বাহিনীসহ জেএমবির পতন হলে কোণঠাঁসা হয়ে পড়ে বাগমারার জেএমবি ক্যাডাররা।
তবে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, এখন পর্যন্ত ঘটনার গভীরে প্রবেশের মতো কোনো তথ্যই খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে তিনটি বিষয়কে মাথায় রেখেই তদন্তকাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে।
এদিকে, টুকিটাকি চত্বর থেকে সকালে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধন ফটকে গিয়ে মহাসড়ক অবরোধ করে তারা। এসময় ওই মিছিলে যোগ দেয় বিভিন্ন বিভাগের কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। আজ বৃহস্পতিবার আবারো বিক্ষোভ মিছিল ও অবরোধ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেয় শিক্ষার্থীরা।
এর আগে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনদিন ক্লাস বর্জন কর্মসূচি পালনের পর মঙ্গলবার থেকে সবাইকে ক্লাসে ফেরার আহ্বান জানিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। কিন্তু শিক্ষকদের সেই আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ক্লাস বর্জন করে আবারো রাস্তায় নেমে আসে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী।
সৈয়দ ইসমাঈল হোসেন সিরাজী ভবনের সামনে মানববন্ধন করে ফোকলোর বিভাগের শিক্ষক শিক্ষার্থীরা। বিক্ষোভ মিছিল করে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগ, মার্কেটিং বিভাগ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মাগুরা জেলা সমিতি।
অন্যদিকে শিক্ষক হত্যার দিন তাত্ক্ষণিক রাবি শাখা ছাত্রলীগ নামেমাত্র একটি মিছিল করে নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চরম সমালোচনার সম্মুখীন হয় ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। এক রকম বাধ্য হয়েই মাত্র দেড় শতাধিক নেতাকর্মীর সাথে নিয়ে দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে ছাত্রলীগ।
চারুকলার ব্যতিক্রমী প্রতিবাদ
হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা ব্যতিক্রমী কর্মসূচি গ্রহণ করে। হামলাকারীরা শিক্ষক রেজাউল করিমকে মেরে যেভাবে ফেলে রাখে সেভাবে তারা সড়কে শুয়ে প্রতিবাদ জানান।
শিক্ষক ফেডারেশনের তিনদিনের কর্মসূচি
রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার বিচার দাবিতে তিনদিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ফেডারেশন। গত মঙ্গলবার ঢাকায় বিকাল ৫টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ফেডারেশনের কার্যকরী সভায় এ কর্মসূচির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এসময় ফেডারেশনের সভাপতি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘অধ্যাপক রেজাউল করিম হত্যার বিচার দাবিতে আগামী ২ থেকে ৪ মে পর্যন্ত তিনদিনের কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে। ২ মে সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১ পর্যন্ত বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট অনুষ্ঠিত হবে। পরদিন রাবিতে প্রতিবাদী সমাবেশের আয়োজন করা হবে। সর্বশেষ ৪ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাত্ করে স্মারকলিপি প্রদান করবে ফেডারেশন।
বরিশাল অফিস জানায়, রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার প্রতিবাদে গতকাল বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির উদ্যোগে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শাবি প্রতিনিধি জানান, অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে নৃশংসভাবে হত্যার প্রতিবাদে মানববন্ধন ও মৌন মিছিল করেছে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
