আজ ১৯ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের ৪৮তম বার্ষিকী। ১৯৭১ সালের এই দিনে জয়দেবপুরে (গাজীপুর) ভাওয়াল রাজবাড়িতে তত্কালীন সেনানিবাসে দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিরস্ত্র করার উদ্দেশ্যে ব্রিগেড কমান্ডার জাহানজেবের নেতৃত্বে পাঞ্জাব রেজিমেন্টের একদল সৈন্য জয়দেবপুর সেনানিবাসে আগমন করবে এ খবর পেয়ে জয়দেবপুরের সর্বস্তরের জনসাধারণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তারা রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড গড়ে তোলে। ঐ সময় জয়দেবপুর সেনানিবাসের অধিনায়ক ছিলেন লে. কর্নেল মাসুদ ও সহ-অধিনায়ক ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ। এ সময় গাজীপুরের বিশিষ্ট রাজনৈতিক নেতা (সাবেক মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত) মরহুম শামসুল হক পাকহানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতাকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম হাবিব উল্লাহর নেতৃত্বে তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি হাইকমান্ড এবং বর্তমান মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপিকে আহ্বায়ক করে ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি অ্যাকশন কমিটি গঠন করা হয়। নেতৃবৃন্দের পরামর্শে ছাত্র-শ্রমিক-জনতা পাকহানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ কল্পে চান্দনা চৌরাস্তা থেকে জয়দেবপুর পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার রাস্তায় বহুসংখ্যক ব্যারিকেড তৈরি করে। দুপুরের দিকে পাকহানাদার বাহিনী চান্দনা চৌরাস্তায় উপস্থিত লোকজনকে অস্ত্রের মুখে ব্যারিকেড সরাতে বাধ্য করে সেনানিবাসে প্রবেশ করলে বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা পুনরায় রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। ছাত্র-জনতা জয়দেবপুর রেলওয়ে লেভেল ক্রসিংএ মালগাড়ির ওয়াগন ফেলে বন্দুক ও বাঁশের লাঠি নিয়ে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেনানিবাস থেকে ফেরার পথে জয়দেবপুর লেভেল ক্রসিংএ পাকহানাদার বাহিনী উপস্থিত হতেই স্থানীয় সাহসী বীরদের বন্দুক গর্জে ওঠে। পাকহানাদার বাহিনীর প্রতি মরহুম কাজী আজিম উদ্দিন আহমেদ (মাস্টার) প্রথম গুলিবর্ষণ করেন। ওই সময় হানাদার বাহিনী পাল্টা গুলিবর্ষণ করলে নিয়ামত, মনু খলিফা শহীদ হন এবং ডা. ইউসুফ আলী সরকার, শাহজাহান, সন্তুষসহ বহু লোক আহত হন। জয়দেবপুর থেকে চৌরাস্তা পর্যন্ত রাস্তার বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড থাকায় হানাদার বাহিনী পায়ে হেঁটে চান্দনা চৌরাস্তায় উপস্থিত হলে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার মিয়ার নেতৃত্বে স্থানীয় ছাত্র-জনতার সশস্ত্র প্রতিরোধের মুখে তারা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করে। গুলিতে হুরমত আলী শহীদ হন এবং কানু মিয়াসহ অনেকে আহত হন। চিকিত্সাধীন অবস্থায় পরে কানু মিয়া মারা যান।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে আমাদের চূড়ান্ত স্বাধীনতা যুদ্ধ হলেও এর পূর্বেই ১৯ মার্চ গাজীপুরে তথা জয়দেবপুরের মাটিতেই সূচিত হয়েছিল দখলদার বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতাকামী বীর বাঙালির পক্ষ থেকে প্রথম সশস্ত্র গণপ্রতিরোধ।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এই দিবস স্মরণীয় করে রাখার জন্য তত্কালীন ১৬ বেঙ্গল রেজিমেন্টের উদ্যোগে ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-গাজীপুর সড়কের মিলনস্থল চান্দনা চৌরাস্তায় মুক্তিযোদ্ধার প্রতীক (এক হাতে রাইফেল অপর হাতে গ্রেনেড) মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য ‘‘জাগ্রত চৌরঙ্গী’’ নির্মাণ করা হয়। দিবসটি উদযাপন উপলক্ষে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসমূহ ও শহীদ হুরমত স্মৃতি সংসদ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক শহীদদের কবর জিয়ারত শেষে বিকালে রাজবাড়ি মাঠে আজ এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
