ভ্রমণ

নির্মল বায়ুর শহরে একদিন

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৮, ২০:৩০

কুষ্টিয়ার মজমপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছি রাজশাহীর বোলনপুর মিশন গার্লস হাইস্কুলের উদ্দেশে। কারণ, সেখানেই পড়েছে আমার কাকুর চাকরির পরীক্ষা। যথারীতি আমি এবং আমার কাকু তৈরি হলাম যাওয়ার জন্য। আমাদের বাস ছিল এগারোটায়। গাড়ি ছাড়ল। কুষ্টিয়া থেকে পাবনা ও নাটোর হয়ে পৌঁছালাম রাজশাহী। পৌঁছাতেই কেমন যেন একটা পরিবর্তনের আভাস পেলাম। আর এ পরিবর্তন সৃষ্টি হলো স্বচ্ছতা এবং সুন্দরের মেলবন্ধনে। চারদিকে অপার সবুজ, রাস্তাগুলো প্রশস্ত, ফুটপাতেও আছে পর্যাপ্ত জায়গা। কোথাও নেই কোনো ধুলাবালি। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। রাস্তার মাঝবরাবর অবস্থিত রোড ডিভাইডারেও রয়েছে নিপুণ শিল্পের ছোঁয়া আর সুন্দর সুন্দর গাছের সমারোহ। এগুলো দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছে গেলাম আমাদের থাকার জায়গা লক্ষ্মীপুরে। সেখানে বেছে নিলাম একটি আবাসিক হোটেল। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে আমরা বেরিয়ে পড়লাম শহর দেখতে। প্রথমেই মন ছুটে গেল পদ্মাপাড়ে। আমি ছোট থেকে বড় হয়েছি যশোর শহরে। এ কারণে তেমন বড় কোনো নদীর সাথে পরিচয় ঘটেনি। হাঠাত্ই রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে বলল, এটাই পদ্মাপাড়। ভাড়া মিটিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠতেই বিশাল নদীর খোলা বাতাসে জুড়িয়ে গেল প্রাণ। ওখানে শুধু আমি নই, আমার মতো আরো অনেক দর্শনার্থী ভিড় জমিয়েছে নদীমাতৃক বাংলাদেশের পদ্মা নদী দেখতে। আমরা অনেকক্ষণ নদীর ধারের উঁচু রাস্তা দিয়ে হাঁটাহাঁটি করলাম। মন যেন আর ফিরতেই চাইছিল না, তবুও ফিরতেই হবে। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। রিকশায় চড়ে আমরা গেলাম নিউমার্কেটে। শহর দেখে আমরা আটটা নাগাদ ফিরলাম হোটেলে। কাকু বলল, এখানেই রাস্তার ধারে কাছে নাকি একপ্রকারের রুটি পাওয়া যায় যা তৈরি হয় কলাইয়ের ডাল দিয়ে। খুব আগ্রহ নিয়ে ছুটলাম সেখানে। আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে সবটা জুড়েই শুধু হাসপাতাল, ক্লিনিক, থাকার হোটেল আর খাবার হোটেল। এ কারণে এ জায়গাটায় লোক সমাগম একটু বেশি। তো কিছুদূর হাঁটতেই আমরা দেখা পেলাম সেই রুটির দোকানের। বিক্রেতা একজন মহিলা। আগ্রহ নিয়ে চাইলাম দুজনের জন্য দুটি রুটি। তিনি রুটি বানালেন আর সাথে একটা কী যেন দিলেন। হাতে নিতেই দেখি ভর্তার মতন। পরে খেতে গিয়ে টের পেলাম সেখানে ছিল মরিচ, পিঁয়াজ এবং সরিষামিশ্রিত একটা বস্তু। রুটির সাথে খেলাম ওটা। স্বাদটা বেশ ভালোই ছিল। দাম পরিশোধ করে আমরা ফিরে গেলাম হোটেলে। ঠিক রাত দশটায় বের হব রাতের খাবার গ্রহণ করতে। পরদিন খুব সকালেই আমাদের উঠতে হলো, কারণ কাকুর পরীক্ষা শুরু হবে নয়টা নাগাদ। হাত-মুখ ধুয়ে সকালের নাশতা খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম পরীক্ষাকেন্দ্রে। পরীক্ষা শেষ হতে বাজবে এগারোটা। আর এ দু ঘণ্টা আমাকে একা আশপাশে কোথাও অপেক্ষা করতে হবে। তাই ভাবলাম, আশপাশের পরিবেশটা একটু ঘুরে দেখি। হঠাত্ চোখে পড়ল বেশকিছু মিষ্টির দোকান যারা রাস্তার ধারে ছাতা টানিয়ে বিশাল হাঁড়ি নিয়ে বসে আছে। শুনেছি রাজশাহীর মিষ্টি নাকি খুব বিখ্যাত এবং সুস্বাদু। তাই দেরি না করে কিছু মিষ্টি কিনলাম। মুখে দিতেই দারুণ এক অনুভূতি! প্রতিটি মিষ্টিই চমত্কার। এভাবেই কেমন করে কেটে গেল দু ঘণ্টা। কাকু বের হলো। এবার আমাদের যাওয়ার কথা অন্য একটি জায়গায়—যেটি না দেখলে রাজশাহীতে আসাটা বৃথা হয়ে যাবে আর সেটি হলো বরেন্দ্র জাদুঘর। এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে এদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনেক নিদর্শন। জাদুঘর পরিদর্শন করে একরাশ আনন্দ নিয়ে বেরিয়ে এলাম। ধরলাম ফেরার বাস। বিদায় জানালাম নির্মল বায়ুর শহরকে। এ আনন্দ-স্মৃতি আমার মনে গেঁথে থাকবে অনেক অনেক দিন।