হামিদুজ্জামানের আলো-আঁধারি ৫২ ফুট

আপডেট : ২২ নভেম্বর ২০১৮, ২০:৪২

হামিদুজ্জামান খান অদম্য এক শিল্পী ও ভাস্কর। জলরঙ, তেলরঙ ও অ্যাক্রেলিকে যেমন এঁকে চলেছেন—একই তালে গড়ছেন ভাস্কর্য। চারুকলায় শিক্ষার্থী থাকার সময় যেমন নিয়মিত আউটডোরে গিয়ে স্টাডি করতেন, সে ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন শিক্ষকতা করার সময়েও। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেয়ার পর ঘরে বসে আঁকেন, পথে বসে আঁকেন। যেখানে সময় পান সেখানেই আঁকেন। ভাস্কর্য গড়ার ফাঁকে আঁকেন। বিদেশে বেড়াতে গিয়েও আঁকেন। বিশাল এই কজের পাহাড় থেকে ভাস্কর্য ও পেইন্টিং মিলিয়ে অনেকগুলো একক প্রদর্শনী করেছেন। দলীয় প্রদর্শনীতে আছেন নিয়মিত। ১৭ নভেম্বর হামিদুজ্জামান খানের ৩৭তম একক প্রদর্শনী শুরু হয়েছে রাজধানীর অবন্তী আর্ট গ্যালরিতে। এবারের প্রদর্শনীর কাজগুলো আগের কাজের চাইতে অনেকটাই ভিন্ন এবং প্রায় সবগুলো কাজই সাম্প্রতিক কালের করা। প্রদর্শনীর বড় ভিন্নতা—এই প্রদর্শনীতে একটি পেইন্টিং রয়েছে ৫২ ফুট লম্বা। কাজটি উচ্চতায় ৬ ফুট। ৫টি ক্যানভাসে আঁকা এই ছবিটির নাম ‘আলো-আঁধারির খেলা’। এই ছবি দেখে সহজেই অনুমান করা যায় বাঙালির উন্নয়ন হয়েছে। মানুষের উন্নয়ন হলে তার ইমারতের দিকে নজর দেয়। মোগল আমল থেকে আজ পর্যন্ত দেখা যায় যার বেশি অর্থ আছে, বড় এবং সুন্দর ভবনটি তার। এখন একটিতে সীমাবদ্ধ নেই। অনেক অনেক সুন্দর ভবন তৈরি হয়েছে দেশে। হয়েছে সুন্দর দেয়াল। গ্যালারির বড় দেয়ালের কথাও আসে এখানে। দেশের উন্নয়নের কথা জানান দেয়ার জন্যই হামিদুজ্জামানের এত বড় কাজ। নতুন এই গ্যালারির একটি দেয়ালে পুরো কাজটি টানানোর পর আর দুই পাশের দুইটি দেয়ালের কিছু অংশ দখল করেছে। গ্যালারিতে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে বিশাল এই কাজ। নীল-কালো মেশানো জমিনের ওপর পোড়ামাটির রঙে কিছু এলিমেন্টস। কোথাও মুখ, কোথাও উল্টো করে রাখা পানপাত্র এবং নানারকম উপকরণ দিয়ে ভরেছেন ক্যানভাস। কাজটির সামনে গিয়ে দর্শককে অনেক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই হবে। তখনই চোখে ধরা পড়বে ক্যানভাসের ডিটেইল কাজগুলো।

গ্যালারির দুই পাশের দেয়ালে টানানো আছে ৪০টি করে ৮০টি পেইন্টিং। এক ফুট বাই এক ফুট কাজের ৪০টি ফ্রেম একসাথে লাগিয়ে টানানো। দূর থেকে দেখে মনে হয় বিশাল একটি কাজ। এর সবগুলো কাজই জলরঙের আঁকিবুঁকি। কোথাও মানুষের মুখ, কোনোটা ফিগার, কোনোটা আবার শুধুই রঙের খেলা। ছবিগুলো দেখে অবশ্যই ভালো লাগবে। গ্যালারির মধ্যিখানে রয়েছে ডিম্বাকার একটি পাত্রভাস্কর্য। মেটালে পিটিয়ে তৈরি এই পাত্রে কালো পানিতে জ্বলছে মোমের আলো। তার দুই পাশে আছে বসার দুই টেবিল। মেটালের এই ভাস্কর্য টেবিল দুইটিতে বসে বসে বড় পেইন্টিং উপভোগ করার জন্য। আরো কয়েকটি ভাস্কর্য আছে গ্যালারির কয়েকটি কোণে। ভাস্কর্যগুলো গ্যালারির কোণে বসে আছে শান্ত বিড়ালের মতো। একটু খেয়াল না করলে এগুলো চোখে পড়ে না। ক্যানভাসে আরো কয়েকটি ছবি, কয়েকটি ভাস্কর্য নিয়ে সাজানো হয় বিশাল গ্যালারি। সব মিলিয়ে ১০০টির বেশি কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে এই প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনী চলবে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এখানে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রদর্শনী হলেও হামিদুজ্জামানের কাজ সারাদেশে প্রদর্শিত হয় বারো মাস। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সংশপ্তক’, বঙ্গভবনে ‘পাখি পরিবার’, পটুয়াখালি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জয়বাংলা’সহ অগণিত ভাস্কর্য রয়েছে খোলা জায়গায়। হামিদুজ্জামান গণমানুষের শিল্পী ও ভাস্কর। তাঁর কাজের মাধ্যমে নিজেকে পৌঁছে দিয়েছেন দেশের সাধারণ মানুষের কাছেও। নগরীর অনেক বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সামনে আছে তাঁর ভাস্কর্য। গাজীপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক অসাধারণ কাজ। এই কাজ দুইটিও আমাদের শিল্পকলার ইতিহাসে অমর হয় থাকবে। শিল্পী ও ভাস্কর হামিদুজ্জামান ২০০৬ সাল একুশে পদকে ভূষিত হন।